ঢাকা, মঙ্গলবার ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

হাল ধরতে হবে ক্ষুদ্র ও মধ্যম উদ্যোক্তাদেরই

প্রকাশিত : 06:59 PM, 5 December 2020 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

দেশের শিল্প খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশই অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের। এটা সব দেশেই। কিছু কম আর বেশি। যে দেশে প্রযুক্তি যতটা সহজলভ্য ও সস্তা সে দেশে শ্রমঘনত্ব কমে যায়; যে দেশে প্রযুক্তি ক্ষমতা কম সে দেশে কায়িক শ্রমের ওপর স্বাভাবিকভাবেই নির্ভরতা বেশি। বাংলাদেশের MSME খাত এই শেষোক্ত গ্রুপে পড়ে। তবে এ খাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও অবদান বিবেচনায়, বিশেষ করে এ খাতের সামাজিক ভূমিকা এবং জেন্ডারভিত্তিক গুরুত্ব মোতাবেক প্রায় সবখানেই MSME নানা ধরনের অগ্রাধিকার, রেয়াত ও প্রণোদনা পেয়ে থাকে। সামাজিক গুরুত্ব এ কারণেই যে, এ খাতে উদ্যোক্তার সংখ্যা বেশি; স্বল্প পুঁজিজনিত সীমাবদ্ধতাও বেশুমার। বড় শিল্প হাতে গোনা। কিন্তু MSME খাতের উদ্যোক্তা নারী-পুরুষ মিলিয়ে অসংখ্য। অথচ তাদের প্রতি যেখানে অগ্রধিকার দেয়া উচিত, সেখানে অবহেলা, অবজ্ঞা, বঞ্চনা এবং পাশ কাটানোর মানসিকতা এখনও কোনো না কোনো আঙ্গিকে বহাল রয়েছে।

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগের সামাজিক গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতার কথা বলে শেষ করা যায় না। সাধারণ মানুষ তাদের সীমিত মূলধন, সীমিত যন্ত্রপাতি ও অসীম স্বপ্ন নিয়ে এ খাতেই আসেন। তাদের নিকটাত্মীয়-পোষ্য-পরিজনদের বিদেশ থেকে পাঠানো ‘রেমিটেন্সের’ অর্থ বেশিরভাগই ব্যয় হয় MSME খাতে বিনিয়োগে। কেননা তাদের সীমিত পুঁজিতে সঞ্চয়ও তেমন জমে না, বড় উদ্যোগের শেয়ার কেনার পথেও বাদ সেধেছে শেয়ারবাজারের অনিশ্চয়তা। বহু মানুষ বহু বড় প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কিনে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তাদের জন্য এখন হয় মাটির কলসে টাকা রাখা নয়তো নিজের পরিবারের বা ভাই-বোনদের সঙ্গে ছোট ছোট ব্যবসা উদ্যোগে শরিক হওয়া ছাড়া বিকল্পই বা কী?

করোনা মহামারী MSME খাতে নতুন করে ভাবনাচিন্তার তাগিদ সামনে নিয়ে এসেছে। এর অনেক কারণও আছে। শ্রমঘন খাত হিসেবে মানুষের রোগ-ব্যাধির অভিঘাত এ খাতেই বর্তেছে বেশি। মানুষের রুটি রুজি কমেছে। কমেছে প্রবাসের ‘রেমিটেন্স’। অনেকটাই কমে গেছে মধ্যবিত্তের নিয়মানুগ সঞ্চয় প্রবণতা। হাতে টাকা-পয়সা না থাকার কারণে শৌখিন জিনিসপত্র দূরে থাক, নিত্যব্যবহার্য পণ্য ক্রয়েই হিমশিম খাচ্ছে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষ। ফলে আগের প্যাকেটজাত খাদ্য, লজেন্স-চকলেট, মনিহারিসামগ্রীর চাহিদা কমেছে। মূল উৎপাদন কমে যাওয়ায় উৎপাদনের সহযোগী উপকরণ ও অ্যাক্সেসরিজের চাহিদাও কমেছে। সাধারণত MSME উদ্যোক্তারা এগুলোই বানায়। বগুড়ার মিহি সেমাইয়ের কদর সারা দেশে। করোনাকালীন দু-দুটি ঈদে বগুড়ার সেমাইয়ের চাহিদা অর্ধেকেরও নিচে নেমে গিয়েছিল।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে (লকডাউন, সামাজিক দূরত্ব, কোয়ারেন্টিন), এগুলোর কারণে বিশ্বজুড়ে এক নজিরবিহীন মন্দা ও কর্ম-শৈথিল্য সৃষ্টি হয়েছে। কোনো দেশ, অঞ্চল, মহাদেশ এ বৈশ্বিক ব্যাধির মরণ ছোবল থেকে মুক্ত নয়।

অর্থনীতিবিদ, গবেষক-পণ্ডিত, ব্যাংকার ও চিন্তাশীল মানুষ তাই অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মধ্যম পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের ওপর বেশি ভরসা করছেন। বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই পারবেন এ মন্দা, বাজার সংকোচন, উৎপাদনহানি, কাঠামোগত বেকারত্ব এবং প্রচলিত উৎপাদন উপকরণের বাইরে গিয়ে পরিবেশবান্ধব, নারীবান্ধব, জ্বালানি সাশ্রয়ী, শ্রমঘন, সমবায়ী বা সম্মিলিত উদ্যোগ কাঠামো এবং উদ্ভাবনীমূলক প্রযুক্তির মাধ্যম প্রচলিত মুনাফাসর্বস্ব উৎপাদনের পরিবর্তে বহুপাক্ষিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সামাজিক ব্যবসায়ী-উদ্যোগের দিকে ঝুঁকতে।

এ ধরনের সম্মিলিত উদ্যোগে উৎপাদনে সামাজিক যৌথ অংশগ্রহণ এবং লাভ-লোকসান ও দায়দায়িত্বের সমবণ্টিত হিস্যার সুফল নিশ্চিতভাবে লাভ করা সম্ভব। মূল লক্ষ্য হবে করোনা-বিপর্যয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো এবং টিকে থাকার অগ্রাধিকার বিবেচনা। করোনাকালে যে হারে উপার্জনশীল মানুষ বেকার হয়ে গেছে এবং বড়-মাঝারি-ছোট নির্বিশেষে উৎপাদনী উদ্যোগ মুখথুবড়ে পড়েছে, তাতে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নতুন ধরনের মূল্য-সোপান (Value chain) গড়ে তোলা দরকার।

এখন থেকেই করোনাকালের এবং করোনা-পরবর্তী সংকটের জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে। টিকে থাকার মতো যে উদ্যোগই গৃহীত হোক, লাভের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে সামাজিক দায়িত্ব, পরিবেশ রক্ষার ব্যবস্থা এবং মুনাফার সামাজিক সুবিচার বা যোক্তিক বণ্টন নীতিকে; শ্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে মেধাকে এবং শিল্প কাঁচামালের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে অব্যাহত গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে এবং রক্ষণশীলতা বাদ দিয়ে জেন্ডার সাম্য নীতিকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সময় যতই এগোবে, ততই নারীর অবদান এবং উৎপাদনে রমণীয় হিস্যার প্রাসঙ্গিকতা বাড়তে থাকবে। তেমনি তথ্য-প্রযুক্তিসহ যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে যে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে, করোনা ও করোনা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ও সর্বাত্মক সদ্ব্যবহার করতে হবে।

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মধ্যম শ্রেণির উদ্যোক্তাদের এখন থেকেই টিকে থাকার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে কৌশলগত প্রস্তুতি, গবেষণা এবং আজকের পর্যালোচনা থেকে আগামীকালের উপায় অন্বেষণ করা। কোভিড-১৯-এর জন্য কেউ আগাম কিছু জানত না বা প্রস্তুত ছিল না। এর অর্থ এই নয় যে, করোনাকালে দেখা দিতে পারে বা করোনা-পরবর্তী সময়ে হানা দিতে পারে এমন সব বিপদ মোকাবেলার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ‘জবংরষরবহপব’-এর ব্যবস্থা রাখার প্রয়োজন নেই। টিকে থাকার উপায়-কৌশল শুধু করোনাকালের মন্দা মোকাবেলার জন্যই নয়, ভবিষ্যতে এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া কিংবা এ ধরনের আরও কোনো বিপদ মোকাবেলার জন্যও দরকার।

অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মধ্যম শ্রেণির উদ্যোক্তাদের উপায়-কৌশলের ব্যবস্থা রাখতে হবে নেতৃত্বকে নতুন আঙ্গিকে সাজাতে, রাজস্ব জোগানে, ব্যবসায়ী উদ্যোগের কাঠামো পুনর্বিন্যাসে, আর্থিক ব্যবস্থাপনায়, পরিচালনাগত কৌশলে এবং অবশ্যই মূল্যসোপান ও সরবরাহ সোপানকে অক্ষত রাখার প্রয়োজনে। এ সোপানগুলো ভেঙে গেলে বা অসংলগ্ন হয়ে গেলে শ্রমিক-কর্মী, কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও প্যাকেজিং-সব উপকরণ মজুদ থাকলেও উৎপাদন ব্যাহত হবে। ছোট উদ্যোক্তাদের উচিত হবে উৎপাদন ব্যবস্থাপনার চলমান মডেলগুলোর পরিবর্তে ‘টেকসই’ মডেল উদ্ভাবন করা এবং তা অনুসরণ করা। করোনাকালে মানুষের স্বাস্থ্যহানি ও শারীরিক-মানসিক বিপর্যয় রোধে পুষ্টিকর, বিশুদ্ধ ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের নতুন নতুন মডেল গড়ে তোলার সুযোগ আছে এবং অপরিহার্যতাও আছে। ক্রেতা বা গ্রাহকের প্রতি মমতা বা সহানুভূতি নতুন ব্যবসায়ী মডেলের অন্যতম ভিত্তি হতে পারে; যেমন হতে পারে পরিবেশবান্ধব ব্যবহার্যসামগ্রীর উদ্যোগ বা জৈবসার, পরিবেশ অনুকূল প্যাকেজিং ব্যবস্থা ইত্যাদি। গবেষকরা এটাকে বলছেন উদ্যোক্তার পরিবেশ-সচেতনতা।

আশার কথা এই যে, SME বা SME কেউই আজ আর একা নয়। তারা এখন বিশ্বের দিকে দিকে সমিতিভুক্ত ও জোটবদ্ধ। তাদের রয়েছে নানা বিশ্ব সংগঠন। এ ছাড়া দেশ বা এলাকা এবং জেন্ডারভিত্তিক বহু ক্ষুদ্র ও মধ্যম উদ্যোক্তার সংঘ, সমিতি বা অ্যালায়েন্স আছে, যাদের সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সম্পর্ক গড়ে তুললে সব দিক থেকে লাভবান হবেন। তাছাড়া এ ধরনের অ্যালায়েন্সগুলোর বেশ কয়েকটি জাতিসংঘের সঙ্গেও সৌহার্দ বন্ধনে আবদ্ধ। জাতিসংঘ নিজেও এ দুর্দিনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ বলেছে, বিশ্বের মোট কর্মসংস্থানের ৭০ শতাংশ, মোট বৈশ্বিক জিডিপির ৯০ ভাগই এসএমই/এমএসএমই খাতভুক্ত।

উৎপাদনের ফরোয়ার্ড ও ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের মধ্যে সমন্বয় ঘটানো এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি ও প্রাসঙ্গিক। সরকারও দাতব্য সংগঠনগুলো আপৎকালীন প্রণোদনার মতো অনেক ধরনের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে। এগুলোর খোঁজখবর রাখতে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে উদ্যোক্তাদেরই। সুযোগের একটা বাসও যেন কোনো কারণে ‘মিস’ না হয়, সেটা উদ্যোক্তাদেরই দেখতে হবে। এখন ‘পার্টনারশিপের’ ধারণা অনেকটা বদলে গেছে। কত উদ্যোগের কত স্টেকহোল্ডার কতজনের সঙ্গে যে কতভাবে অংশীদার হতে পারে এবং হচ্ছেও, ভাবতেও অবাক লাগে। অনেক দেশে এ ধরনের একটি সামাজিক উদ্যোগের ক্ষেত্রে লাখ লাখ তরুণ উদ্যোক্তা ‘ক্লাস্টার’ বা ‘গ্রুপ’ গঠন করে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করেছেন। এদের অলস হাত আজ কর্মীর হাতে পরিণত হয়েছে। এ পরিবর্তনটি আমাদের অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও মধ্যম শ্রেণির উদ্যোক্তাদের জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে।

খন্দকার হাসনাত করিম : সাংবাদিক ও চিত্রপরিচালক

hasnatkarimpintu@gmail.com

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT