ঢাকা, বুধবার ২৮ জুলাই ২০২১, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সীমাহীন দুর্ভোগ ॥ শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি, পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট

প্রকাশিত : 10:30 AM, 7 September 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

পদে পদে অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মের জেরে দেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের কাছে বিভীষিকার নাম হয়ে উঠেছে শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি (মাওয়াঘাট), পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এসব জেলার বাসিন্দা। রাজধানীর সঙ্গে সংযোগের প্রধান পথে পদ্মা পেরুতে বছরের অধিকাংশ সময় নাজেহাল হতে হচ্ছে ঢাকা বিভাগের একাংশ ছাড়াও খুলনা এবং বরিশাল বিভাগের সব জেলার মানুষকে। বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই সঙ্কট সমাধানে সরকারের দুই প্রতিষ্ঠান অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিটিএ) এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি অবহেলা আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও দায়ী। অন্যদিকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সবক্ষেত্রেই থেকে যাচ্ছে নীরব দর্শকের ভূমিকায়। এতে শুধু মানুষই নয় পারাপার জটিলতায় অনেক কাঁচা পণ্যও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার বাণিজ্যে মাঝেমধ্যেই এই দুর্যোগ নেমে আসে।

প্রতিদিন মাওয়া এবং পাটুরিয়াঘাট দিয়ে সাড়ে আট হাজার গাড়ি পারাপার হয়। এর মধ্যে ৬০০ থেকে ৭০০ ট্রাক পারাপার হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুই ঈদের সময় গাড়ির চাপ বাড়লে ফেরি পার হতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষায় নাব্য সঙ্কট আর শীতে কুয়াশা প্রকৃতির হেঁয়ালিপনার কাছে বিআইডব্লিউটিএ এবং বিআইডব্লিউটিসি নিজেদের সঁপে দিয়েছে। যেন কিছুই করার নেই তাদের। তবে এর বাইরে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সঙ্গে ঘাটে পদে পদে দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনাও দায়ী।

বিআইডব্লিউটিসির মাওয়াঘাটের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম জনকণ্ঠকে জানান, প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার গাড়ি এই ঘাট পারাপার হয়। এরমধ্যে ২০০ এর অধিক পণ্যবাহী ট্রাক। ট্রাকগুলো ঢাকা থেকে যেমন পণ্য নিয়ে যায় আবার সেভাবে ঢাকায় পণ্য নিয়ে আসে। এখন ঘাটে পারাপার বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ আবারও চলাচল শুরু হবে জানতে চাইলে বলেন, বিআইডব্লিউটিএ চ্যানেল চালু করলেই আমরা ফেরি পারাপার শুরু করতে পারব। আশা করছি, আগামী বৃহস্পতিবার আবার চলাচল শুরু হতে পারে। পারাপার বন্ধ হওয়ার আগে ১৩টি ফেরির মধ্যে ছয়টি চলাচল করছিল বলে জানান তিনি।

সম্প্রতি ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে গাড়ি নিয়ে নড়াইলে গ্রামেরবাড়ি পরিবার -পরিজন নিয়ে যাচ্ছিলেন আনিসুর রহমান। সকাল ছটায় ঢাকার বাসা থেকে গাড়ি ছেড়ে মাওয়া পৌঁছান সাড়ে সাতটায়। সকাল সকাল চলে আসায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। এই তো পার হলেই বাড়ি আর ঘণ্টা দু’য়েকের পথ। এভাবে এক ঘণ্টা যায় দু’ঘণ্টা যায় কিন্তু ফেরির লাইন আর আগায় না। সোজা এসে কিছু গাড়ি আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশের সঙ্গে কিসব বলাবলি করে সোজা ফেরিতে উঠে যাচ্ছেন। কিন্তু আনিসুর রহমানের গাড়ির আগে যেমন কয়েকশ’ পেছনেও কয়েকশ’ গাড়ি। সময় যত এগুচ্ছে আনিসুর রহমান ততই চারপাশের খবর নিচ্ছেন। কেউ বলছেন গতকাল সন্ধ্যারাতে এসেছেন। কেউ বলছেন গতকাল দুপুরে এসেছেন। এখানে একটা গোটা দিন কাটিয়ে রাত পার করে পরিবার-পরিজন নিয়ে অপেক্ষা করছেন ফেরির জন্য। এভাবে দুপুর গড়িয়ে বিকেল খানিকটা বাদেই সন্ধ্যা নামবে। কেউ কেউ বলাবলি করছেন আজ আর ফেরি ছাড়বে না। টনক নড়ল আনিসুর রহমানের। ঘাটে বিআইডব্লিউটিসির অফিসে গিয়ে স্থানীয় কর্মকর্তাকে ফোন করে জানতে পারলেন ফেরি আর চলবে না। তীব্র স্রোতের কারণে ফেরি চলাচল সম্ভব নয়। কেন এখনও ঘোষণা দিচ্ছেন না জানতে চাইলে বলেন- কি যে বলেন ভাই! আমি কি এটি দিতে পারি। আমরা এটি বিআইডব্লিউটিসির জিএম সাহেবকে জানিয়েছি। তিনি বিষয়টি চেয়ারম্যানকে জানাবেন। এর পর বিষয়টি নিয়ে বৈঠক হবে। তারপর টেলিভিশনে স্ক্রল যাবে। ঘাটের লোকের কাছে তো টেলিভিশন নেই। এখানে হাজার হাজার মানুষ দু’দিন ধরে অপেক্ষা করছে। তাদের জানানোর ব্যবস্থা কি জানতে চাইলে তিনি কথা ঘুরিয়ে আবার সেই চেয়ারম্যান সাহেবে নিয়ে ঠেকান। একটি সাধারণ তথ্য-ফেরি চলবে কি চলবে না, তা জানার বাস্তবচিত্র। ফেরি যদি না চলে তাহলে কেউ দু’তিন দিন অপেক্ষা না করে ফিরে আসতে পারে। কিন্তু বিআইডব্লিউটিসি এই সাধারণ খবর জানাতেই টালবাহানা করে। অপেক্ষারত ক্লান্ত মানুষ তাদের ঘাটের ওপর অফিসে গেলে বলতে থাকেন অপেক্ষা করেন।

এ তো গেল ফেরি না চললে সমস্যার কথা। ফেরি যখন চলে তখন কি হয়? ঘাট সংশ্লিষ্ট মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেরিঘাটের নিয়ন্ত্রণ দুই জায়গা থেকে হয়ে থাকে। মূলত ঘাটটি বিআইডব্লিউটিএ-এর নিয়ন্ত্রণে। একই সঙ্গে নৌরুট খননও তারাই করে থাকে। প্রত্যেক ঘাটে বিআইডব্লিউটিএ’র শ্রমিক সংগঠন (সিবিএ) রয়েছে। এরা গাড়ির সিরিয়াল আগে-পরে করে দেয়ার জন্য সরকার নির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে বাড়তি টাকা নেয়। বিআইডব্লিউটিসির লোকবল কিছুটা কম থাকায় তারা এসব কাজে প্রতিবাদ করে না। উল্টো এক সঙ্গে মিলেমিশে ভাগবাঁটোয়ারা করে। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশও মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। ফলে টাকার ভাগাভাগি ঠিক রাখতে গিয়ে পার হতে চাওয়া সকল গাড়ির সঙ্গেই দেনদরবার করে।

ধরে নেয়া যাক- একটি ফেরি ২০টি গাড়ি পারাপার করে। এখন প্রতিগাড়ির চালকের সঙ্গে দুই মিনিট করেও এই দেনদরবার করলে ফেরিতে গাড়ি ওঠার আগেই ৪০ মিনিট অপচয় হয়। আর সিরিয়াল ভেঙ্গে পেছনের গাড়িকে এগিয়ে আনতে গিয়ে প্রায়ই ঝামেলা সৃষ্টি হয়। এভাবে হট্টোগোলে আরও সময় ব্যয় হয়। ফলে এসব ঘাট দখলদার আর চাঁদাবাজদের জন্য একটি ফেরি সারা দিনে যে ক’বার পারাপার করতে পারে তার অর্ধেক কাজ করে। বাকি অর্ধেক সময় অপচয় হয়। ফেরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ এর প্রতিবাদ করে না। কারণ এই টাকার ভাগ তাদের পকেট পর্যন্ত চলে যায়। আর কর্তৃপক্ষ কেন যে সব কিছু দেখেও না দেখার ভান কওে, সেটা বলা মুশকিল। ফেরিতে গাড়ি উঠলে শুরু হয় আরেক বিপত্তি। ফেরির কর্মচারীরা এবার বকশিশের নামে আরও এক দফা তোলা তুলতে শুরু করে। দিনের পর দিন চলতে থাকায় এটি রেয়াজ হয়ে গেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারী চাকরি করে প্রতিমাসে বেতন পাওয়ার কথা সেখানে এভাবে চাঁদা তোলার প্রথা কেন চালু হলো। এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও জবাব নেই।

শিমুলিয়া-কাঁঠালবাড়ি নৌরুটের তিনটি চ্যানেল দিয়ে ফেরি পারাপার করলেও নাব্য সঙ্কটে এখন দুটি চ্যানেলে আগে থেকেই চলাচল বন্ধ রয়েছে। যে একটি চ্যানেল চালু ছিল সেটি নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে গেছে। যাতে সেতুর কোন সমস্যা না হয় এজন্য রাতেরবেলা এই পথে ফেরি পারাপার বন্ধ রাখা হতো। এখন সেটিও বন্ধ করে রাখা হয়েছে। ফলে রাতে যেসব ট্রাক আসে তাদের ঘাটেই অপেক্ষা করতে হতো। এভাবে দিনে যেসব সাধারণ মানুষ আসে তারাও একই সারিতে যোগ হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন পদ্মার এই অংশে স্রোতের গতিবেগ ঘণ্টায় নয় নটিক্যাল মাইলের কাছাকাছি। স্রোতের গতিবেগ ঘণ্টায় সাত নটিক্যাল মাইল হলেই বিপজ্জনক মনে করা হয়। সেখানে নয় নটিক্যাল মাইল তার থেকে বেশি। স্রোতের এই গতিবেগে খননযন্ত্র বা ড্রেজার ব্যবহার করে কাজ করা খুব কঠিন। একই সঙ্গে বর্ষায় উজান থেকে বয়ে আসা পলি পড়ে চ্যানেল বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে বিপাকে পড়তে হয়।

জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিএর প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) আব্দুল মতিন জনকণ্ঠকে বলেন, একটি বিকল্প নৌরুট আমরা তৈরি করে দিয়েছিলাম কিন্তু সেটায় পদ্মা পাড়ি দিতে সাড়ে তিন ঘণ্টা সময় লাগায় বিআইডব্লিউটিসি ব্যবহার করতে চায় না। অন্যদিকে অন্য একটি চ্যানেলের নাব্য ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের অংশের কাজ আমরা শেষ করেছি। কিন্তু পদ্মা সেতুর ২৫ এবং ২৬ নম্বর পিলারের কাছে সেতুর দুই পাশে ২৫০ মিটার করে খনন করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। সেতুর নিরাপত্তা যাতে কোনভাবে বিঘ্নিত না হয় এজন্য অন্য কাউকে এই খনন করতে দেয়া হয় না। তিনি বলেন, তারা দু’দিন চেষ্টা করে আজ রবিবার ড্রেজার প্লেস করেছে। দুপুর ১টা ৪০ মিনিট থেকে খনন শুরু হয়েছে। ফলে তারা যত দ্রুত এই ৫০০ মিটার খনন করে দেবেন তত দ্রুতই চ্যানেলটি চালু হয়ে যাবে।

অন্যদিকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ঘাটে নাব্য সঙ্কট না থাকলেও বন্যার পানির তোড়ে কয়েকদিন সমস্যা হয়েছে। এখন এই ঘাটে ১৯টি ফেরি চলাচল করছে। এপার-ওপার চারটি ঘাট দিয়ে এই ফেরি চলাচল করছে।

জানতে চাইলে পাটুরিয়াঘাটের বিআইডব্লিউটিসির ডিজিএম জিল্লুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, তার এই ঘাট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ছয় হাজার গাড়ি পারাপার করে। শনিবার ছয় হাজার ৭০০ গাড়ি পার হয়েছে। তিনি বলেন, আপাতত কোন সমস্যা হচ্ছে না।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT