ঢাকা, মঙ্গলবার ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণ

প্রকাশিত : 11:39 AM, 27 September 2020 Sunday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে তরুণী গণধর্ষণের ঘটনায় নিন্দা প্রতিবাদ বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে নগরী। এই ঘটনায় ৬ জনের নামে মামলা করা হয়েছে। একই মামলায় আরও দুই-তিন জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে। স্বামীকে নিয়ে ঘুরতে শুক্রবার সন্ধ্যায় এমসি কলেজে গিয়েছিলেন ধর্ষণের শিকার হওয়া ওই গৃহবধূ। এ সময় কলেজ ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রলীগের ৫/৬ নেতাকর্মী তাদের জোরপূর্বক কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। সেখানে একটি কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে ওই গৃহবধূকে গণধর্ষণ করে। পরে পুলিশ খবর পেয়ে এসে তাদের উদ্ধার করে। কলেজ ছাত্রাবাসে তরুণী ধর্ষণের ঘটনা প্রচার হওয়ার পর নগরীতে বিভিন্ন সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল, সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায়। শুক্রবার মধ্যরাতে সিলেট মহানগর পুলিশের শাহপরাণ থানায় এই ঘটনায় মামলা দায়ের করেন ওই গৃহবধূর স্বামী। শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কাইয়ুম বলেন, মামলায় ৬ জনকে সরাসরি জড়িত বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অন্য ৩ জনের বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার আসামিরা হচ্ছে, এমসি কলেজ ছাত্রলীগের নেতা ইংরেজী বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী শাহ মোঃ মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), কলেজ ছাত্রলীগ নেতা এম সাইফুর রহমান (২৮), ছাত্রলীগ নেতা তারেক (২৮), অর্জুন লস্কর (২৫), রবিউল ইসলাম (২৫) ও মাহফুজুর রহমান মাছুম (২৫)। তাদের মধ্যে সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি বালাগঞ্জে, রবিউলের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায়, মাহফুজুর রহমান মাছুমের বাড়ি সিলেট সদর উপজেলায়, অর্জুনের বাড়ি সিলেটের জকিগঞ্জে, রনির বাড়ি হবিগঞ্জে এবং তারেক সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাসিন্দা।

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনার অন্যতম হোতা ছাত্রলীগ ক্যাডার এম সাইফুর রহমানের রুম থেকে দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাত ২টার দিকে শাহপরাণ থানা পুলিশ এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে অভিযান চালায়। এ সময় সাইফুরের রুম থেকে ১টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৪টি রামদা, ১টি ছোরা ও জিআই পাইপ উদ্ধার করা হয়। করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ ও ছাত্রাবাস বন্ধ থাকলেও সাইফুর অবৈধভাবে ছাত্রাবাসে অবস্থান করত। তার সহকর্মীদের নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাস, টিলাগড় ও বালুচর এলাকায় ছিনতাই, অপহরণ ও মাদক ব্যবসা করত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাতে বন্ধ ছাত্রাবাসে নিয়মিত জুয়া ও মাদকের আসর বসাতো এমন অভিযোগও রয়েছে সাইফুরের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

অভিযোগে জানা যায় সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে বহিরাগতসহ অন্যদের থাকার সুযোগ করে দিত কলেজ কর্তৃপক্ষ। তা আবার সরকারী নির্দেশনা অমান্য করেই। করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছিল সরকার। সরকারের নির্দেশনা থাকার পরেও এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে প্রভাব খাটিয়ে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে থাকত ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। সবকিছু জানার পরেই মুখ বন্ধ করে থাকতে হতো কলেজ কর্তৃপক্ষের। বহিরাগত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি কলেজের বিভিন্ন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ছাত্রাবাসে বসবাস করে আসছিল। বিষয়টি কলেজ কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোন পদক্ষেপ নেয়নি। এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সালেহ উদ্দিন বলেন, করোনা পরিস্থিতি সরকারী নির্দেশনা পাওয়ার পর পরই কলেজ ও ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়া হয় নোটিস দিয়ে। তবে অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন কলেজে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি ও টিউশনি করেন। সেইসব শিক্ষার্থীরা ছাত্রাবাসে থাকার জন্য হোস্টেল সুপারের মাধ্যমে আমাকে বিষয়টি জানিয়েছিল। তখন আমি হোস্টেল সুপারকে বলেছি যারা বৈধ তাদের কয়েকজনকে ছাত্রাবাসে থাকার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। তবে ছাত্রাবাসে থাকলেও তারা ছাত্রাবাসের ডাইনিং ও গ্যাস ব্যবহার করতে পারবেনা। সেজন্য ছাত্রাবাসের ডাইনিং বন্ধ রাখার পাশাপাশি গ্যাস সংযোগও বন্ধ করে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ছাত্রাবাসের ৬টি ব্লক ও পূর্ব দিকে একটি ৪তলা ভবন রয়েছে। সেখানে প্রায় ৩শত শিক্ষার্থী থাকত। কলেজ ও ছাত্রাবাস বন্ধ হওয়ার পর মানবিক দিক বিবেচনা করে ছাত্রাবাসে প্রায় ২০-৩০ জনকে থাকাতে মৌখিকভাবে বলা হয়। বহিরাগত কেউ থাকছে কিনা বা কলেজের শিক্ষার্থীরা নির্দেশনা মানছে কিনা সে বিষয় দেখতেন হোস্টেল সুপার। শুক্রবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে ছাত্রাবাসের কয়েকটি কক্ষ তল্লাশি করে বন্ধ করা হয়। হোস্টেল সুপার বিষয়টি দেখার পরেও কিভাবে ছাত্রাবাসের কক্ষে অস্ত্র নিয়ে অবস্থান করার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টি আমাদের কাছে রহস্যজনক মনে হচ্ছে। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। যদি কারও গাফিলতির সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে তার বিরুদ্ধে কলেজের পক্ষ থেকে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মিছিল, অবরোধ ॥ এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের প্রতিবাদে সিলেটে মিছিল ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ। শনিবার বেলা ১টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে সাধারণ ছাত্রদের মিছিল শুরু হয়ে নগরের বন্দরবাজার ঘুরে চৌহাট্টা পয়েন্টে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে পথসভা করেন ছাত্ররা। ছাত্র অধিকার পরিষদ সিলেট বিভাগীয় কমিটির সহ-সমন্বয়ক আব্দুল্লাহ আল সুজনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এমসি কলেজসহ সারাদেশে ছাত্রলীগ সন্ত্রাসী কার্যক্রম করছে। অতীতে এই সন্ত্রাসীরা এমসি কলেজের ছাত্রাবাস পুড়িয়েছিল। নিজের দলীয় কর্মীদের খুন করেছিল তারা। পুরো সিলেটের ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হত্যা, চাঁদাবাজি ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত। ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা সিলেট শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে ছাত্র অধিকার পরিষদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। ছাত্রলীগের অপকর্মে সবসময় সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ নীরব ভূমিকা পালন করেছে।

এমসি কলেজে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত নিজ দলীয় নেতাদের দ্রুত গ্রেফতার ও তাদের শাস্তি দাবিতে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। শনিবার সকালে সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের টিলাগড় এলাকায় অবস্থিত এমসি কলেজের মূল ফটকের সামনে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের একাংশকে এ বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা গেছে। এ সময় আন্দোলনরত নেতা-কর্মীরা এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িতের দ্রুত গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।

গণধর্ষণের ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে অন্যতম ছাত্রলীগ নেতা রবিউল ইসলামকে গ্রেফতার করতে তার গ্রামে অভিযান চালিয়েছে দিরাই থানা পুলিশ। অভিযুক্ত রবিউল গ্রামের বাড়িতে এসেছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার দুপুরে রবিউলের গ্রামের বাড়ি দিরাই থানার জগদল ইউনিয়নের বড় নগদীপুর গ্রামে একটি সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। এদিকে অভিযুক্ত রবিউলের এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা শোনার পরেই তার এলাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। উঠেছে নিন্দার ঝড়। জগদল ইউনিয়নের লোকজন রীতিমতো ফুসে উঠেছেন। এলাকাবাসী বলেন, আজকের ঘটনাটি ছাড়াও রবিউলের বিরুদ্ধে আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে। তার দ্বারা বিভিন্ন সময়েই এলাকার মানুষ নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এই অপরাধীর জন্য এলাকাবাসী লজ্জিত। এ সময় তারা রবিউলকে এলাকায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার দাবি জানান।

সিলেটের এমসি কলেজে ছাত্রাবাসে ধর্ষণের ঘটনায় আন্দোলনে নেমেছেন শিক্ষার্থীরা। শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এমসি সরকারী কলেজের প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী কলেজের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কলেজ ও ছাত্রাবাসে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর অভিযোগ করেন, করোনা পরিস্থিতিতে কলেজ বন্ধ থাকার পরেও ছাত্রাবাস কিভাকে খোলা রাখে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এসব অপরাধ কর্মকা-ের বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের অবগত থাকার পরেও কেন ছাত্রাবাস বন্ধ করে দেয়া হল না। আজ আমাদের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠে কলঙ্কের দাগ লেগেছে। এসময় শিক্ষার্থীরা ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানান। অনথ্যায় তারা আরও কঠোর কর্মসূচী ঘোষণা করবেন বলে জানান।

এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনায় ছাত্রাবাস ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। শনিবার দুপুর ১২টার মধ্যে ছাত্রাবাস ছাড়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হোস্টেল সুপার জামাল উদ্দিন।

তদন্ত কমিটি গঠন ॥ গণধর্ষণের ঘটনায় কলেজের গণিত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন চৌধুরীকে প্রধান করে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ঘটনায় কলেজের ছাত্রাবাসের একজন নিরাপত্তারক্ষী ও প্রধান ফটকের একজন নিরাপত্তারক্ষীকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এমসি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক সালেহ আহমদ বলেন, তদন্ত কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। এদিকে, ধর্ষণের শিকার তরুণীর ডিএনএ টেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন শাহপরাণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী। অভিযোগকারীকে আদালতে হাজির করে জবানবন্দী নেয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT