ঢাকা, রবিবার ১৩ জুন ২০২১, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সামশু-শারুনের শাস্তি দাবিতে ফুঁসে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধা-জনতা

প্রকাশিত : 08:51 PM, 10 June 2021 Thursday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

‘বাপ করে মেশিন চুরি, পোলা মদের গেলাসে—পটিয়াবাসীর শত দুঃখ, বাপ-বেটা হাসে’, ‘বাপ করেছে মেশিন চুরি, পোলা সুদখোর, সংসদটা পবিত্র করো—আনো নতুন ভোর’। এভাবেই মুহুর্মুহু স্লোগানে, ফেস্টুনে পটিয়ার সংসদ সদস্য হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তাঁর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাল চট্টগ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানসহ সাধারণ জনতা। হুইপ ও তাঁর ছেলে শারুনের বিচার দাবিতে রীতিমতো ফুঁসে উঠেছে চট্টগ্রাম। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে গতকাল বুধবার নগরে মুক্তিযোদ্ধা ও জনতার মানববন্ধন-প্রতিবাদ সভায় মানুষের ঢল নামে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুদ্দিন আহমেদসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে নির্যাতন ও লাঞ্ছনার প্রতিবাদে আয়োজিত সমাবেশে বক্তারা সামশুল হক চৌধুরী ওরফে বিচ্ছু সামশুকে হুইপ পদ থেকে অপসারণের দাবি জানান। এ ছাড়া তাঁর বেপরোয়া ছেলে শারুনের বিরুদ্ধে গুরুতর নানা অপরাধের চিত্র তুলে ধরে সরকারের প্রতি অবিলম্বে তাঁদের গ্রেপ্তারের দাবি তোলা হয়।

ফুটপাতের হকার থেকে বিএনপি, জাতীয় পার্টি হয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়া নব্য আওয়ামী লীগার সামশুকে সরকারি দল থেকে বহিষ্কারেরও জোর দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানরা। মানববন্ধনে বিক্ষুব্ধ জনতা সামশু ও শারুনের নাম ধরে নানা প্রতিবাদী স্লোগান তুলে জুতা প্রদর্শন করে। সামশু ও শারুনের নাম ধরে তারা স্লোগান তোলে—‘হৈহৈ রৈরৈ বিচ্ছু-শারুন গেল কই’, ‘মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘সামশু-শারুনের নয়—এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ’, ‘লুটেরা সামশুর কাছে জাতীয় পতাকা নিরাপদ নয়’।

গতকাল বিকেল ৩টায় পূর্বনির্ধারিত নগরের জামালখানে অবস্থিত চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সামনে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সংরক্ষণ পরিষদ’ আয়োজিত মুক্তিযোদ্ধা-জনতার প্রতিবাদ সমাবেশ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে সামশুল হক চৌধুরী ও তাঁর ছেলে শারুনের ভাড়া করা কিছু লোক সমাবেশস্থলে আসে। এরপর কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ নেজাম উদ্দিন বলেন, শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নর আশঙ্কা থাকায় সেখানে কাউকে সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। আয়োজকরা সেখান থেকে চেরাগী পাহাড় হয়ে ডিসি হিলের সামনে এসেও সমাবেশ করতে পারেননি। বাধ্য হয়ে তাঁরা প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে লাভ লেন, কাজীর দেউড়ি, চট্টেশ্বরীর মোড়, পল্টন রোড হয়ে ওয়াসার মোড় এলাকায় আসেন। এরপর পুলিশ লাইনের বিপরীত পাশে নগরের প্রধান সড়কের সামনে মানববন্ধন ও সমাবেশ হয়। এর আগে চেরাগীর মোড়েও সংক্ষিপ্ত সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

চেরাগীর মোড় : চেরাগীর মোড়ের সমাবেশে বীর মুক্তিযোদ্ধা সামসুদ্দিন আহমদ বলেন, ‘সামশুল হক চৌধুরী পটিয়াকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়েছে।’ বেশ কয়েকবার হুইপ পরিবারের রোষানলের শিকার হওয়া এই মুক্তিযোদ্ধা আরো বলেন, ‘হুইপ সামশু ও তাঁর ভাই নবাব এবং ছেলে শারুন পটিয়ায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। পটিয়ার যত বড় বড় প্রকল্প ছিল সেখান থেকে ২০ শতাংশ কমিশন নিয়েছে সামশু। কেউ সেখানে মাথা তুলে কথা বলতে পারে না। একসময় জাতীয় পার্টি করা সামশু পদ না থাকলেও এখন আওয়ামী লীগের বড় নেতা। কথায় কথায় মুক্তিযোদ্ধাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, অপমান করে। আমি হুইপ সামশুর সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ দাবি করছি।’

বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আবু তৈয়ব বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত হু্ইপের কাছ থেকে পতাকা কেড়ে নেওয়া না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধারা আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে যাবেন। সরকারের প্রতি আবেদন—পটিয়ার মানুষের প্রতি যে জুলুম চলছে সেখান থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করুন।’

তিনি আরো বলেন, ‘সামশুর বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত করছে। তার বাড়িতে আগে টিনশেড ঘর ছিল, এখন সেখানে হয়েছে বিলাসবহুল বাংলো। সে যদি দুর্নীতি না করে তাহলে এত টাকা এলো কোথা থেকে? শুধু তা-ই নয়, খোঁজ নিলে জানা যাবে, দেশের বাইরেও তার বাড়ি রয়েছে।’ ছাত্রলীগের সাবেক এই নেতা আরো বলেন, ‘পটিয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প দিয়েছেন। প্রতিটি প্রকল্প থেকে ২০ শতাংশ করে কমিশন নিয়েছে সামশু। আমরা চাই তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। তার কাছ থেকে জাতীয় পতাকা ছিনিয়ে নেওয়া হোক। যে মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই জাতীয় পতাকা সেই পতাকা এই হীন ব্যক্তির কাছে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হচ্ছে।’

পুলিশ লাইনস এলাকায় সমাবেশ : বিকেল সোয়া ৩টার দিকে পুলিশ লাইনসের বিপরীতে প্রধান সড়কে মানববন্ধন ও সমাবেশ শুরু হয়। এতে চট্টগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক মরহুম জহুর আহমদ চৌধুরীর ছেলে বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সংরক্ষণ পরিষদের মহাসচিব জসিমউদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘বিচ্ছু সামশু মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নির্যাতন লাঞ্ছনা করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছেন। আমরা এই সমাবেশ থেকে বিচ্ছু সামশুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করছি।’

সাবেক ছাত্রনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের কো-চেয়ারম্যান নওশাদ মাহমুদ চৌধুরী রানা বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের আদর্শ, আমাদের শেষ ভরসাস্থল জননেত্রী শেখ হাসিনা। হাইব্রিড আওয়ামী লীগাররা দলের ত্যাগী পরীক্ষিত নেতাকর্মী ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্নভাবে নাজেহাল করছে। তার জ্বলন্ত সাক্ষী সামশু ও তার ছেলে শারুন। আমরা তাদের হাত থেকে আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতে জাতির জনকের কন্যার প্রতি অনুরোধ করছি।’

শহীদ পরিবারের সন্তান চৈতী বসু বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা মানে বাংলাদেশকে অপমান করা। আমরা মুক্তিযুদ্ধের সন্তানরা বিচ্ছু সামশু ও শারুনের বিচার চাই।’

মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের আজকে দেখতে হচ্ছে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যের (বিচ্ছু) কারণে আজকে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীকে হারাতে হয়েছে। সামশু ও তার পরিবার থেকে পটিয়াবাসীকে রক্ষা করুন।’

এ সময় আবার স্লোগান ওঠে, ‘বিচ্ছু ও শারুনকে চট্টগ্রামবাসী চাই না’, ‘মুক্তিযোদ্ধা দিদারুল আলম চৌধুরীকে হুমকি দেওয়া জাতীয় বেয়াদব শারুন চৌধুরীর বিচার চাই’ ইত্যাদি।

এ ছাড়া ডিজিটাল ব্যানার ও ফেস্টুনে তুলে ধরা হয়, ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান স্বাধীনতাযুদ্ধকালীন গ্রুপ কমান্ডার ত্যাগী আওয়ামী লীগ নেতা সামশুদ্দীন আহমদকে লুঙ্গি খুলে পেটানোর হুমকি প্রদানকারী বিচ্ছু সামশু জাতীয় বেয়াদব নবাব ও শারুনসহ সব অপরাধীর গ্রেপ্তার ও শাস্তি দেওয়া হোক।’

কর্মসূচিতে আরো উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধার সম্মান সংরক্ষণ পরিষদের মহাসচিব ও মরহুম জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র জসিমউদ্দিন চৌধুরী, বীর মুক্তিযোদ্ধা চৌধুরী মাহবুবুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ আলম, বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান, বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ আজিজের সন্তান ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সদস্য সাইফুদ্দীন খালেদ বাহার, সাবেক ছাত্রনেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নওশাদ মাহমুদ চৌধুরী রানা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ সংগঠনের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান, ব্যারিস্টার শওগত আনোয়ার খান, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গের মহাসচিব উত্তম কুমার বড়ুয়া, ভাইস চেয়ারম্যান সৈয়দ আলম, অর্থ সম্পাদক সওকত মাসুম, দপ্তর সম্পাদক মো. মনজু, মো. নাসির খান, উজ্জ্বল চৌধুরী, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি নওশাদ সেলিম, সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ চট্টগ্রাম মহানগরের সহসভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধার মেয়ে চৈতী বসু, চট্টগ্রাম মহানগর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও প্রজন্ম সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি, বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান গোলাম রসুল নিশান ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেলাল উদ্দিন, মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নূর হোসেন দুলাল, ছয় দফা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে একাত্তরে শহীদ ছাত্রলীগ নেতা দানেশ চন্দ্র দেবনাথের ছোট ভাই বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ চট্টগ্রাম মহানগরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পরেশ চন্দ্র দেবনাথ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার প্রধান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ফয়সাল ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ চট্টগ্রাম মহানগর ও থানা কমিটির নেতৃবৃন্দ যথাক্রমে মো. ওসমান গণি, গাজী শোহেন, বাবলু মিয়া, মো. আব্বাস, আমিনুল, মো. গোলাম নবী, মো. হাবিবুর রহমান, পিমলু, নাঈম উদ্দীন, আবু তাহের রিপন, জয়নাল আবেদীন, মো. বাহার, জমির উদ্দিন, জসীম উদ্দীন চৌধুরী, মো. ইসমাইল, মো. নাছির উদ্দিন, সমীরণ খাস্তগীর, বি এম জসীম উদ্দিন প্রমুখ।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT