সোমবার ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সবুজ রঙের দেশী মাল্টা উৎপাদনে নীরব বিপ্লব

প্রকাশিত : 11:33 AM, 13 October 2020 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

এক সময় মানুষের বদ্ধমূল ধারণা ছিল- এ দেশের মাটিতে কখনই বিদেশী ফলের চাষ সম্ভব নয়। কিন্তু দিন বদলেছে। এখন মরু অঞ্চলের খেজুরও এখন চাষ হচ্ছে বাংলাদেশে। স্বপ্ন ও সম্ভাবনার পথ দেখাচ্ছে বিদেশী ফল মাল্টাও। সাইট্রাস পরিবারভুক্ত এই রসালো ফল চাষাবাদে দিন দিন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কেউ কেউ ভাগ্যের পরিবর্তন এনেছেন এই মাল্টা চাষে। দেশে সবুজ রঙের মাল্টার চাষাবাদে বাজারে মাল্টার দামও কম। আবার ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফলটিতে রয়েছে নানা পুষ্টিগুণ। পুষ্টিগুণ ভরা মাল্টা চাষে কৃষকদের আগ্রহী করতে সরকারীভাবে নানা পদক্ষেপও নেয়া হচ্ছে। কৃষিবিদরা মনে করছেন, যে হারে মানুষ আকৃষ্ট হচ্ছে আর ফলন দেখা যাচ্ছে তাতে সামনের দিনগুলোতে মাল্টা আমদানি নয় বরং দেশ থেকে বিদেশে রফতানি করা যাবে।

দেশের মাল্টা চাষে সফলতা এক দিনে আসেনি। গত অর্ধযুগে অনেকটাই নীরব বিপ্লব হয়ে গেছে মাল্টা চাষে। ২০১২ থেকে ২০১৮ সালের হিসেবে ছয় বছরে মাল্টা চাষ বেড়েছে প্রায় ৬ গুণ। আর একই সময়ে উৎপাদন বেড়েছে আট গুণের বেশি।

বেশিরভাগ গবেষকের কথা অনুযায়ী, মাল্টা ফলটির আদি নিবাস হলো হিমালয়ের আশপাশের এলাকায়। এখন এই ফল সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় উত্তর-পূর্ব ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও চীনের ইউনান প্রদেশে। পুষ্টিবিদদের মতে, কমলা আর বাতাবি লেবুর সঙ্করায়ণের সৃষ্ট ফল মাল্টা। ইংরেজী নাম সুইট অরেঞ্জ। বর্তমানে দেশেও মাল্টার ভাল চাষ হচ্ছে। সেই সঙ্গে ফলনও ভাল। ইতোমধ্যেই তা প্রমাণ করে দিয়েছেন চাষীরা। দেশের কয়েকটি জেলায় এখন মাল্টার সফল চাষ হচ্ছে। ‘লেবুজাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় এসব চাষাচাদ ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ১২৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয় করে সরকার লেবুজাতীয় ফসল ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশের ১২৩টি উপজেলায়। পাশাপাশি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় ৩০ শতাংশ নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি অন্যতম লক্ষ্য। সাম্প্রতিক সময়ে কম খরচে স্থানীয় পর্যায়ে পতিত জমিগুলোর ব্যবহারও বেড়েছে। বিভিন্ন ব্লক কর্মকর্তারা উৎসাহিত করায় এবং প্রকল্প থেকে বিনে পয়সায় বিভিন্ন লেবুজাতীয় ফসলের চারা ফ্রি পাওয়াতে অনেক এলাকায় পতিত জমিতে আবাদ হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী ড. মোঃ আব্দুর রাজ্জাক জনকণ্ঠকে জানান, মানুষ এই ধরনের ফল-ফসলের দিকে এখন আকৃষ্ট হচ্ছে এবং বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে মাল্টা চাষেও এক বিরাট সম্ভাবনা দেখেছি। বিভিন্ন ফলের দোকানে এখন দেখা যায় সবুজ মাল্টাগুলো। সরকার এসব বিষয়ে কাজ করছে। কৃষকদের উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগও রয়েছে। মানুষ এক সময় মনে করত অনেক কিছুই হয়ত হবে না এখন হচ্ছে। দেশে কফি হচ্ছে, ড্রাগন হচ্ছে। শুধু মাল্টাই নয়; কাজু বাদাম, ড্রাগনসহ অপ্রচলিত সব ফল চাষের জন্য সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কৃষকদের স্বার্থে কাজ করছে।

জানা গেছে, দেশের পাহাড়ী এলাকা খ্যাত চট্টগ্রাম, বান্দরবান রাঙ্গামাটিসহ রাজশাহী জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, নরসিংদী ও পিরোজপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলে ফলটি চাষের বিপুল সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। দেশে এখন সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে বারিমাল্টা-১ ও বারিমাল্টা-২। এ ছাড়াও থাইল্যান্ডের বেড়িকাটা ও ভারতীয় প্রচলিত জাতের মাল্টাও আশার আলো দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যেই বারিমাল্টা চাষাবাদে অনেক চাষী সফলতার মুখ দেখেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশে মাল্টা চাষের সঙ্গে জড়িত কৃষকের সংখ্যা আনুমানিক দুই হাজার। ২০১২ সালে যেখানে মাল্টা হতো ৪৩৯ হেক্টর জমিতে আর সে সময় উৎপাদন ছিল দুই হাজার ৮৩ মেট্টিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮-১৯ মৌসুমে ২ হাজার ৪৩৩ হেক্টর জমিতে ১৭ হাজার ৩ মেট্রিক টন মাল্টা উৎপাদন হয়েছে, যা দেশের মোট চাহিদার ৫ থেকে ১০ শতাংশের মতো। বিগত ২০১৮-১৯ মৌসুমে ২ হাজার ৪৩৩ হেক্টর জমিতে ১৭ হাজার ৩ মেট্রিক টন মাল্টা উৎপাদন হয়েছে, যা দেশের মোট চাহিদার ৫ থেকে ১০ শতাংশের মতো।

‘লেবুজাতীয় ফসলের সম্প্রসারণ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি’ প্রকল্পের পরিচালক কৃষিবিদ ফারুক আহমদ জনকণ্ঠকে বলেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে লেবু জাতীয় ফসলগুলোকে আমরা ছড়িয়ে দেব। এর মাধ্যমে আমরা ৫৪ হাজার ১০০টি মাল্টা বাগান করব এবং ৫ হাজার পুরাতন বাগান পরিচর্যা করব। ২০১২ সাল থেকে দেশে মাল্টার বাগান করা শুরু হয়। এখানে ছোট বড় মিলিয়ে ১০ হাজার ২টি বাগান রয়েছে। এ বছর আমরা ছোট বড় মিলিয়ে দেড় হাজার বাগান করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। অন্যদিকে আমাদের এই প্রকল্পের বাইরেও কৃষি সম্প্রসারণের আরও কিছু প্রকল্পে মাল্টা বাগান করা হচ্ছে। এছাড়া কৃষকও নিজেদের উদ্যোগে মাল্টা বাগান করছে। আমরা কৃষকদের আগ্রহ দেখে সত্যি অভিভূত। কৃষকরা এ ধরনের ফল চাষে অনেক আন্তরিক। সেই সঙ্গে আমরা দেখেছি ফলনও বেশ ভাল। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় দেখা গেছে, মাল্টার বাম্পার ফলনের রাজত্ব। গাছে গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে সবুজ মাল্টা। অনেকেই কিনতে সরাসরি আসেন বাগানেও। ফটিকছড়ির কৃষি কর্মকর্তা লিটন দেবনাথ বলেন, বর্তমানে উপজেলায় ১২০ হেক্টর জমিতে মাল্টা হচ্ছে। যেখানে বাগান আছে পাঁচ শতাধিকের ওপরে। মাল্টা চাষী মোঃ সেলিম বলেন, এ বছর এখন পর্যন্ত ৮০ টাকা কেজি ধরে আড়াই লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছেন। ইউনুস এগ্রো ফার্মের মালিক মোঃ ইউনুস জানান, ২০১৩ সাল থেকে ৪০০ চারা দিয়ে মাল্টা চাষ শুরু করেন বর্তমানে দুই হাজারের বেশি গাছ রয়েছে। প্রতি গাছে দুই শ’ কেজির বেশি মাল্টা আসে। বছরে মাল্টা বিক্রি করেন প্রায় ৫০ লাখ টাকা এবং চারা বিক্রি করেন আরও ৫০ লাখ টাকার। এছাড়াও সুবলছড়ির শাহ আলম, আব্দুল মান্নান নামের চাষীরাও মাল্টা চাষে ঝুকেছেন। তবে উৎপাদিত মাল্টার দাম নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন একাধিক কৃষক। তারা অভিযোগ করে বলেন, বিদেশী হলুদ রঙের মাল্টা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে দুই শ’ আর সেখানে দেশের মাল্টা পাইকারি ৭০-৮০ খুচরায় ১০০-১২০ টাকা। উৎপাদিত মাল্টার ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলেও জানান তারা।

জানা যায়, ২০০৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল ‘বারি-১’ জাতের মাল্টাই এখন বেশি চাষ করা হচ্ছে। এই জাতের মাল্টা পাকলেও দেখতে সবুজ, শাঁস হলুদ ভাব, রসালো, খেতে মিষ্টি ও সুস্বাদু। প্রতিটি মাল্টা গাছে ৩শ’ বেশি ফল ধরে। হেক্টরপ্রতি ফলন আসে প্রায় ২০ মেট্রিক টন। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে একাধিক মাল্টার বাগন সরেজমিনে দেখা গেছে গাছে গাছে সবুজ মাল্টার সমাহার। গাছের আগা থেকে গোরা পর্যন্ত ফলে ভরপুর। সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে গোলাকার মাল্টা উঁকি দিচ্ছে।

জানা গেছে, বছরে দেশে মাল্টার চাহিদা রয়েছে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টন। গতবছরও আমদানি করা হয় আড়াই লাখ টন। সব মিলিয়ে ২ লাখ ৭০ হাজার মেট্রিক টন মাল্টার জোগান রয়েছে। প্রতিবছর মাল্টা আমদানিতে ব্যয় করতে হয় সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো ব্যয় হয় জানিয়ে বাংলাদেশ ফল আমদানিকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, বাংলাদেশে প্রতিবছর মিসর থেকে মাল্টা আমদানি করা হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার মেট্রিক টন। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে করা হয় ১০ থেকে ১১ হাজার টনের মতো। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে বাকি মাল্টা আসে। দেশে সারাবছরই মাল্টার চাহিদা রয়েছে বলেও জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে আমরা দেশী মাল্টা কয়েক মাস পেলেও অধিকাংশ সময় আমদানির ওপরই নির্ভর করতে হয়। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশী মাল্টা থেকে দেশে উৎপাদিত মাল্টার প্রতি ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে দেশী ফল নিয়ে আমাদের আরও বেশি বেশি জনসচেতনতামূলক কাজ করতে হবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT