ঢাকা, বুধবার ২৮ জুলাই ২০২১, ১৩ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সবুজ গালিচায় মোড়ানো টিএসসি, ফাঁকফোকর খুঁজে নিয়ে গল্প আডডা

প্রকাশিত : 09:34 AM, 3 September 2020 Thursday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

আয় আর একটিবার আয় রে সখা, প্রাণের মাঝে আয়।/মোরা সুখের দুখের কথা কব, প্রাণ জুড়াবে তায়…। প্রাণ জুড়ানো এমন গল্প আড্ডায় যোগ দেয়ার আহ্বান, আহা, কতদিন আসে না! সব ধরনের সুহৃদ সমাবেশ বন্ধ রয়েছে। পাশে থাকার সামাজিক প্রথা এখন চ্যালেঞ্জর মুখে। দূরত্ব বাড়ানোর নতুন নির্দেশনা মেনে চলছে সবাই। টিএসসিও এর বাইরে ছিল না। প্রিয় প্রাঙ্গণ বহুদিন জনশূন্য ছিল। মেঝেতে গোল হয়ে বসে আড্ডা, রং চায়ে লম্বা চুমুক, হঠাৎ গিটার বাজিয়ে গান, রাজনীতি অর্থনীতি সমাজনীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক, শিল্প সংস্কৃতির আলোচনা সবই একরকম হারিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? হয়তো তাই নিয়ম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে সেখানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যথারীতি বন্ধ। একই কারণে ছাত্র শিক্ষককেন্দ্রে তালা। তবু ফাঁকফোকড় খুঁজে নিয়ে অনেকে গল্প আড্ডা জমাচ্ছেন। নির্জন টিএসসি একটু একটু করে যেন বন্ধুদের হয়ে উঠছে।

বাঙালীর গল্প আড্ডার ঐহিত্য বহু বছরের পুরনো। এই যেমন এখন বর্ষার জলে ফসলের জমি তলিয়ে গেছে। গ্রামের কৃষকের হাতে তেমন কাজ নেই। এই উঠোনে ওই উঠোনে গল্প করে কাটাচ্ছেন তারা। আষাঢ় বিদায় নিয়েছে বটে। হাট বাজারে চায়ের দোকানে চলছে আষাঢ়ে গল্পই। বলা যায়, আড্ডাপ্রিয় বাঙালীর এ ঐতিহ্যই ধরে রেখেছে টিএসসি। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয় এখানে। বয়স পেশা নারী পরুষ বা জাত ধর্মের পার্থক্য ভুলে গল্প আড্ডায় মাতেন। যে কোন উপলক্ষে গোটা শহরের তারুণ্য এখানে এসে সমবেত হয়। এত হাসিরাশি আনন্দ ঢাকার আর কোথাও খুঁজে পাওয়া মুশকিল। কিন্তু গত মার্চ মাসে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। সবার আগে ১৮ মার্চ বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। এখন পর্যন্ত খোলার নাম নেই। শ্রেণীকক্ষে তালা। ক্লাস বন্ধ। তা না হয় মানা গেল। বন্ধুর সঙ্গে দেখা, প্রাণ খুলে কথা বলা কতদিন আর বন্ধ রাখা যায়? তাই বন্ধুরা মিলে নতুন করে গল্প আড্ডা জমানোর উদ্যোগ নিচ্ছেন।

বুধবার টিএসসি এলাকায় গিয়ে দেখা গেল এমন বেশ কিছু দৃশ্য। করোনাকালে গোটা এলাকা পুরোপুরি অবরুদ্ধ ছিল। কেউ সেদিকে পা বাড়াতে পারেননি। এ সুযোগে হরদম পায়ে মাড়ানো উদোম ভূমিতে নতুন ঘাস জন্মেছে। মূল ভবনে প্রবেশের আগে যে খোলা প্রান্তর, সেখানে ঘাস! দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। সীমানা প্রাচীর ঘিরে চায়ের দোকান। চেনা দোকানিরা আবারও চুলো জ্বালিয়েছে। দোকান ঘিরে চলছে বন্ধুদের আড্ডা। ছোট ছোট জমায়েত।

এখানে চায়ের কাপ হাতে গল্প করছিলেন শাহেদ, মিনার ও রীতা। তিন বন্ধুকে দেখে মনেই হচ্ছিল না করোনা বলতে কিছু এখনও আছে! প্রায় স্বাভাবিক সময়ের মতোই প্রাণবন্ত দেখাচ্ছিল তাদের। ঘটনা ব্যাখ্যা করে শাহেদ বললেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক শিক্ষার্থী। তাই ক্যাম্পাস কবে খুলবে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। দীর্ঘ সময় ঘরে বসে থেকে বোর হচ্ছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছি। দেখা না হওয়ার দুঃখটা বাড়ছিল। তাই আজ দেখা করতে এখানে এসেছি। রীতাকে আরও বড় আড্ডাবাজ মনে হলো। তিনি বলছিলেন, আমিই ওদের এখানে আসতে বাধ্য করেছি। আসলে ক্যাম্পাস ছেড়ে গেছি বলে প্রেমটা মনে হয় বেড়ে গেছে।

টিএসসির মূল ভবনে ঢোকার লোহার গেটটিতে একাধিক তালা। অথচ বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা গেল, ভেতের ছোটখাটো আড্ডা চলছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, পাশের বিকল্প গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেছেন তারা। সে গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই চোখ ছানাভরা! মূল মিলনায়তনের সামনের খোলা চত্বরে সবুজ ঘাস, ঘাস নয়, যেন সবুজের গালিচা! লম্বা ঘাস সুন্দর করে কেটে এই গালিচার চেহারা দেয়া হয়েছে।

লনে গোল হয়ে বসে গল্প আড্ডা চলছিল। বিচ্ছিন্ন গল্প আড্ডা। একটিতে অংশগ্রহণকারী সকলেই ছিলেন নারী। এত কড়াকড়ির মাঝে টিএসসিত সমবেত হলেন কী করে? কেন? জানতে চাইলে রেশমা নামের এক তরুণীর উত্তর : করোনার নিয়ম কানুন তো ছেলেরা মানেইনি। আমরা বরং ঘরে বসে ছিলাম এতদিন। এখন সব খুলে দিয়েছে বলেই নিশ্বাস নিতে বের হয়েছি। সবরাই প্রিয় জায়গা টিএসসি। তাই এখানে আসা।

কী করে প্রবেশ করলেন? জানতে চাইলে আরেক আড্ডার মধ্যমণি অনিন্দ্য’র জবাব : সব কিছুই তো চলছে এখন। খোলা। তাহলে আর টিএসসির আড্ডাটা বন্ধ থাকবে কেন? এ কারণেই আজ সবাই মিলে চলে এসেছি। মামাকে (দারোয়ান) অনুরোধ করে প্রবেশে সুযোগ পেয়েছেন বলে জানান তিনি।

ফিরে আসার সময় কথা হলো এক চায়ের দোকানির সঙ্গে। শাহাবুদ্দীন নাম। সে জানালো, এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দোকান শুরু করেছে তারা। কাস্টমারও কিছু পাওয়া যাচ্ছে। তবে সে অপেক্ষা করে আছে করোনাকালের আগের টিএসসির জন্য। আগের টিএসসি বলতে? দোকানির জবাব : ‘মানে, ধরেন, ভরা টিএচছি। চা বেচা কম হইলেও ক্ষতি নাই। লুক আহউক। নাইলে খালি খালি লাগে!’

তবে বেশি দিন আর খালি খালি লাগবে না। লাগবে না যে তা বোঝা গেল সুবহা নামের এক তরুণীর গানে। ডাচবাংলা এটিএম বুথ সংলগ্ন ফুটপাথে বসে তিনি গাইছিলেন : তোমাদের মাঝে কি কেউ আছে বন্ধু আমার?/তোমাদের মাঝে কি কেউ আছে পথ ভোলা?/তবে বন্ধু নৌকা ভেড়াও…। অনেকেই এখন নৌকো ভেড়াচ্ছেন টিএসসিতে।

এ প্রসঙ্গে টিএসসির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সৈয়দ আলী আকবর বলেন, টিএসসি এত লম্বা সময় বন্ধ থাকে না। আগে দেখিনি। এবার করোনার কারণে বন্ধ রাখতে হয়েছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়া হলে টিএসসিও খুলে দেয়া হবে। সে পর্যন্ত সবাইকে একটু ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন তিনি।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT