ঢাকা, রবিবার ১৩ জুন ২০২১, ৩০শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

সতেরো শতকের ঐতিহ্য এখন টিকে থাকার লড়াইয়ে

প্রকাশিত : 11:50 AM, 15 October 2020 Thursday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

শঙ্খ শিল্পের ইতিহাস অনেক পুরনো। বাংলার খুব প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। কালের স্রোতে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। তবে শঙ্খ শিল্প আছে টিকে থাকার লড়াইয়ে।

জেমস ওয়াইজের মতে, বল্লাল সেনের সঙ্গে পূর্ববঙ্গে এসেছিলেন শাঁখারীরা। প্রথমে তারা বসতি গড়েন বিক্রমপুরে। পরে ১৭ শতকে মুঘলরা ঢাকায় এলে তাদেরও এ শহরে নিয়ে আসা হয়। ঠিক কেন নিয়ে আসা হয় বা কেন তারা আসেন এ ব্যাপারে খোঁজাখুঁজি করেও পরিষ্কার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে দ্রুতই শাঁখারীবাজারে নতুন করে পেশা ও জীবন-যাপন শুরু করেন তারা।

উনিশ শতকের শেষ ভাগে শিল্পটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে হৃদয়নাথ মজুমদার জানিয়েছেন, শাঁখা বা শঙ্খের বড় উৎস ছিল সমুদ্র। সমুদ্রের যে অংশে শাঁখা পাওয়া যেত, সে সে অংশ সরকারের কাছ থেকে লিজ নিতেন ব্যবসায়ীরা। জেলেদের সাহায্যে শাঁখা সংগ্রহ করে মহাজনদের কাছে বিক্রি করতেন। এই মহাজনদের কাছ থেকে শাঁখা চলে আসত শাঁখারীবাজারে। শাঁখারীদের কেউ কেউ আবার সিংহল থেকে শাঁখা শঙ্খ ক্রয় করতেন। তার পর শঙ্খ কেটে হাতের বিশেষ এক ধরনের বালা, কানের দুল, আংটি ইত্যাদি তৈরি করা হতো। বলা হয়ে থাকে, শঙ্খ অসুর নামে এক দানবকে অগস্তা মুনি হত্যা করেছিলেন। হত্যায় তিনি যে করাত ব্যবহার করেছিলেন সে ধরনের করাত দিয়েই প্রথমে শাঁখা কাটা হতো। প্রাচীন এ পদ্ধতির ব্যবহার এখন খুব সামান্যই চোখে পড়ে।

শাঁখারীবাজারে শঙ্খ শিল্প কারিগর সমিতির একটি রয়েছে। অফিসের সামনের অংশে বসে আপন মনে কাজ করেন এক শাঁখারী। নাম স্বপন। এটি তার বাবা ঠাকুরদার পেশা। তারা বিশেষ করাত দিয়ে শাঁখা কাটতেন। নিজের মতো করে গড়ে নিতেন। পুরনো দিনের ঐতিহ্য সচেতনভাবে ধরে রেখেছেন স্বপন।

অবশ্য বাকিদের প্রায় সবাই এখন কাজ করেন মেশিনে। সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহৎ উৎসব উপলক্ষে নতুন করে সরব হয়েছে গোটা এলাকা। দিন-রাত চলছে মেশিন। নতুন নতুন ডিজাইনের শাঁখা ও শঙ্খ গড়ছেন কারিগররা। এগুলোই চলে আসছে দোকানে।

সরু ছোট্ট গলির দুই ধারে অনেক দোকান। শাঁখা ও শঙ্খ শিল্পের নিদর্শন আছে প্রায় সবকটিতেই। পূজায় নারীরা হাতে শাঁখা পরেন। পুরনো জোড়া খুলে রেখে এ সময় নতুন করে গড়িয়ে নিতে দেখা যায় তাদের। এবার করোনার কাল। ক্রেতা কিছুটা কম। তাই বলে থেমে নেই।

মা মনসা শঙ্খ শিল্পালয় নামের একটি দোকানে ঢুকে দেখা গেল, নানা ডিজাইনের শাঁখা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ছোট পরিসর দোকান। তাই অত চোখে পড়ে না। তবে ক্রেতা চাইলে চোখের সামনে সব নামিয়ে দেখানো হয়।

দোকানি সদানন্দ নাগ ৬০ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। পেছনের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের দিনে অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। একসময় বিবাহিত নারীরা পবিত্র জ্ঞান করে হাতে শাঁখা পরতেন। এখন শাঁখা চুড়ি কিছুই তেমন পরে না। এর পরও যারা পরেন তাদের জন্য শাঁখা তৈরি করছি আমরা। এভাবে মূলত ঐতিহ্যটা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

লক্ষ্মী ভা-ার নামের দোকানটি আরও পুরনো। ৬০ থেকে ৭০ বছর ধরে শাঁখা ও শঙ্খ গড়ার কাজ করছেন তারা। দোকানের মালিক মূলত অমিয় কুমার সুর। তবে শাঁখা ও শঙ্ক তৈরির কাজ করছেন নিয়োগ দেয়া কারিগররা। শাঁখার পাশাপাশি শঙ্কও তৈরি করছেন তারা। দোকানি জানান, সারা বছর কম বেশি বিক্রি হলেও, পূজায় চাহিদা বেশি থাকে। এবার কেমন হবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা আশাবাদী।

শাঁখা হাতে পরা হলেও, শঙ্খ পূজার জরুরী অনুষঙ্গ। পূজায় আর কিছু বাজুক বা না বাজুক শঙ্খ বাজা চাই। শঙ্খের গা খুঁড়ে শিল্পকর্ম করা হয়। কোন কোন শঙ্খের সৌন্দর্যের কাছে নামকরা শিল্পীদের রিলিফ ওয়ার্কও যেন হার মানে। পৌরাণিক উপাখ্যানে শঙ্খের যে উল্লেখ পাওয়া যায় তাও যারপরনাই কৌতূহল উদ্দীপক। শাঁখারী বাজারের অধিকাংশ দোকানে পাওয়া যায় শঙ্খ।

প্রবীণ কারিগর অনুপ নাগের সংগ্রহে রয়েছে বিচিত্র আকার প্রকারের শঙ্খ। কোনটির শরীর কেটে মহাভারত বা রামায়ণের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, কোনটিতে দেবী দুর্গার প্রতিমা। কাজ বেশি হলে দামও বেশি। তার কাছে ৪৫ হাজার টাকা দামের শঙ্খ আছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে, নাম শাঁখারীবাজার হলেও এখানে এখন বাহারি পণ্যের পসরা। প্রতিমার শাড়ি, মুকুট, ঘুড়ি, বাদ্যযন্ত্র, পূজার সামগ্রী ইত্যাদি বিক্রি করা হয়।

সাজ ঘর নামের একটি দোকানে জরি মতি চুমকি বিক্রি করা হয়। দোকানি কৌশিক জানান, শঙ্খও বিক্রি করেন তারা। তবে অন্য আইটেমই বেশি বিক্রি হয়।

অন্য অনেক দোকানের বেলায়ও এ কথা সত্য। ফলে শাঁখা ও শঙ্খ শিল্প নিয়ে আগ্রহ হারাচ্ছেন দোকানিরা। একদিকে বদলে যাওয়া সময়, অন্যদিকে ঐতিহ্য ধরে রাখার লড়াই। কোনটা জয়ী হবে?

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT