ঢাকা, সোমবার ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ১২ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

শীতের শুরুতেই অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর দুর্গাসাগর

প্রকাশিত : 01:28 PM, 8 December 2020 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

২৪০ বছরের ঐতিহ্য। বরাবর একই রকম। মধ্যিখানে একটি পজ। প্রায় বারো বছর। সময়ের হিসেবে একযুগ। মাঝখানের এই নষ্ট সময়টুকু স্মৃতির পাতা থেকে মুছে ফেললে সবই ঠিকঠাক। সেই অতীতের মতোই এবারও শীতের শুরুতেই অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘি। প্রায় একযুগ পর আবার অতিথি পাখির অবাধ বিচরণ প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করছে সবুজে ঘেরা দুর্গাসাগর দিঘি দেখতে আসা দর্শনার্থীদের। তারা এই দিঘিকে আরও বেশি পাখিবান্ধব করার দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে সম্ভবত এ বছরই প্রথম এক বিরল ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে উত্তরাঞ্চলের লালমনিরহাট জেলা এবং সংলগ্ন এলাকার মানুষ। এখানেও এবার দক্ষিণাঞ্চলের মতো অসংখ্য অতিথি পাখির সমাগম ঘটেছে। অন্যান্য নানা বর্ণের পাখির সঙ্গে সম্পূর্ণ মুক্ত পরিবেশে উড়ে বেড়াচ্ছে পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম চঞ্চল পাখি ‘হামিং বার্ড’। এই পাখি আসে সাধারণত উত্তর আমেরিকা থেকে। এই পাখি অনেকের কাছে সৌভাগ্যের পাখি হিসেবেও পরিচিত।

দুর্গাসাগর দিঘি ॥ বরিশাল জেলা শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশায় অবস্থিত দুর্গাসাগর দিঘির কারণে ওই এলাকাটি জনসাধারণের কাছে অতিপরিচিত। আর দুর্গাসাগরের অতীত ঐতিহ্য শীতকালীন অতিথি পাখি। প্রতিবছর শীত মৌসুমের শুরুতে শীতপ্রধান বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পাখি আসত এই দিঘিতে বিচরণের জন্য। কিন্তু স্থানীয়দের নানা উৎপাত আর সাগর তীরের গাছপালা নিধনসহ নানাভাবে পরিবেশ বিনষ্টের কারণে হুমকিতে পড়ে অতিথি পাখির বিচরণ। ২০০৭ সালে সিডর পরবর্তী উদ্ধার এবং ত্রাণ তৎপরতার জন্য দিনরাত দেশী-বিদেশী বিমান আর হেলিকপ্টারের ওঠানামার শব্দ দূষণে হারিয়ে যায় অতিথি পাখি। এরপর থেকে একযুগেও দুর্গাসাগরে শীতকালীন পাখির দেখা মেলেনি বললেই চলে। তাই এই সময়টাকে পাখির জন্য ব্যাড টাইম বলেই অভিহিত করেন পাখি বিশারদগণ।

সম্প্রতি জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমানের উদ্যোগে দুর্গাসাগর তীরের গাছ-গাছালিতে পাখিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিসহ দিঘির দক্ষিণপাশে পদ্ম আর শাপলা সৃজন করায় ১২ বছর পর এবার আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে অতিথি পাখি। পদ্ম আর শাপলার মধ্যে বসে চোখের আড়াল হয়ে যায় পাখিগুলো। দিনরাত অতিথি পাখির কিচিরমিচির আর কলকাকলিতে দিঘি এলাকায় ১২ বছর পর আবার সৃষ্টি হয়েছে এক ছন্দময় পরিবেশ। এতে মুগ্ধ ও বিমোহিত দর্শনার্থী। তারা দুর্গাসাগরকে আরও পাখিবান্ধব করার দাবি জানিয়েছেন।

বরিশাল বিএম কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান প্রফেসর রফিকুল ইসলাম বলেন, পাখিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির কারণে দীর্ঘ একযুগ পর এবার শীত মৌসুমের শুরুতেই আবার অতিথি পাখি আসতে শুরু করেছে দুর্গাসাগরে। শীতের প্রকোপ বাড়লে অতিথি পাখির বিচরণ আরও বাড়বে বলেও তিনি আশা করেন।

জেলা প্রশাসক এসএম অজিয়র রহমান বলেন, একযুগ পর ফিরে আসা অতিথি পাখির অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অতিথি পাখি ছাড়াও দুর্গাসাগরকে দেশী প্রজাতীর পাখির অভয়াশ্রম করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। শীতের পাখিসহ দুর্গাসাগরের নৈসর্গিক পরিবেশ উপভোগের জন্য তিনি দর্শনার্থীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

সূত্রমতে, ১৭৮০ সালে চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ণ তার স্ত্রী দুর্গাদেবির নামকরণে জনগণের পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সাড়ে ৪৫ একর জমির ওপর দুর্গাসাগর দিঘিটি খনন করেন। ১৯৪ বছর পর ১৯৭৪ সালে তৎকালীন মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের উদ্যোগে মৃতপ্রায় দুর্গাসাগর দিঘি পুনরায় খনন করা হয়।

দুর্গাসাগরে ঘুরতে আসা গৃহিণী সুলতানা পারভীন হাফিজ জানান, দুর্গাসাগর বরিশালের একটি ঐতিহ্যের প্রতীক। কয়েক বছর পূর্বেও এখানে ঘুরতে এসে নানা কারণে বিভিন্নজনকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন পরিবেশ অনেক সুন্দর হয়েছে। সিসি ক্যামেরা দিঘির পরিবেশকে নিরাপদ করেছে। একই সঙ্গে গোটা দিঘির পাড়কে ঘিরে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দিঘির মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর জন্য বোট, তীরে ছাতা, টয়লেট, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে দুর্গাসাগরকে পর্যটকবান্ধব করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান অবস্থা ধরে রাখতে পারলে পর্যটকরা আগের মতো দুর্গাসাগরের প্রতি আকৃষ্ট হবেন। এতে করে পর্যটন বিকাশের মধ্যদিয়ে কৃষি নির্ভর এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের নতুন উন্নয়ন ঘটবে।

লালমনিরহাট ॥ জেলার আদিতমারী উপজেলার থানা চত্বরের মূল ফটকের পাশে বাগানে সম্প্রতি কোন এক গোধূলি লগ্নে থোকায় থোকায় হাসনাহেনা ফুল ফোটে। ফুলের মনোমুগ্ধকর গন্ধে থানা ক্যাম্পাস ম ম করে ওঠে। সেখানে একজোড়া ছোট্ট পাখিকে উড়ে এসে ফুলের থোকায় ঠোঁট ঢুকিয়ে মধু আহরণ করতে দেখা যায়। এ সময় তারা খুব দ্রুত নড়চড়া করতে থাকে। একটু লক্ষ্য করে দেখা যায় , এই পাখি বাংলাদেশের পাখি নয়। এটি সুদূর উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার শীতের দেশের হামিং বার্ড। পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম ও বিরল পাখি। এবারে শীত একটু বেশি ও করোনা পরিস্থিতিতে পরিবেশের দূষণ হ্রাস পাওয়ার ফলে এই পরিযায়ী পাখি হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে। ঘটনাটি জেলায় ও আদিতমারী থানায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। আবার এই পাখিকে স্থানীয় অনেকে সৌভাগ্যের পাখিও বলছে। পাখি জোড়া যাতে সেখানে নিরিবিলি বাস করতে পারে তার জন্য বিশেষ পরিবেশ তৈরিতে হাসনাহেনা গাছের তলায় জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ কোলাহল মুক্ত করা হয়েছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোঃ সাইদুল রহমান জানান, হামিং বার্ড পুরাতন ঝোপঝাড় ও ফুলের বাগানে মধু খেতে আসে। আমাদের দেশে পাখিটি তেমন দেখা যায় না। এটা একটি বিরল প্রজাতির পাখি। করোনায় পরিবেশের দূষণমুক্ত ও কোলাহলমুক্ত পরিবেশ পাওয়ায় তাদের জনসম্মুখে দেখা যাছে। এটা পরিযায়ী পাখিও। গবেষকরা এটি নিয়ে গবেষণা করলে এদেশে এর অস্তিত্ব মিলবে বলে তিনি দাবি করেন। হিমালয়ের পাদদেশ লালমনিরহাট ও পাশের জেলা পঞ্চগড়। শীতে এরা এখানে খাবারের সন্ধানে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে আসে। বাংলাদেশে প্রায় সাত শ’ প্রজাতির পাখি আছে।

এদিকে গুগলের আর্কাইভ সূত্রে জানা গেছে, পৃথিবীর সব থেকে ক্ষুদ্রতম পাখির নাম হামিং বার্ড। ক্ষুদ্রতম এ পাখি হামিং বার্ড শুধু উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় দেখা মেলে। ৩শ’র অধিক প্রজাতি রয়েছে তাদের। সব থেকে ছোট আকৃতির হামিং বার্ড পাওয়া যায় কিউবায়। এর দৈর্ঘ প্রায় আড়াই ইঞ্চি, ওজন দুই গ্রামের নিচে। এরা বিরতিহীনভাবে হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। হামিং বার্ড প্রতি সেকেন্ডে ১২ থেকে ৯০ বার ডানা ঝাপ্টাতে পারে। এই পাখি খুব দ্রুততম সময়ে সামনে, পেছনে, উপরে ও নিচে উড়তে পারে। মনে হয়, খাবার খেতেই এদের জন্ম হয়েছে। হামিং বার্ড বেশ শক্তিশালী পাখি। এদের ঠোঁট বেশ লম্বাকৃতির হয়। ফুলের মধুই এদের প্রধান খাদ্য। ফুল থেকে নিজের দূরত্ব বজায় রেখে শূন্যে উড়ে উড়ে ফুলের মধু লম্বা ঠোঁট ডুকিয়ে খেয়ে নেয়। একটি হামিং বার্ড দৈনিক এক হাজার ৫শ’ ফুলের মধু খেয়ে থাকে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT