ঢাকা, রবিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

শিক্ষায় কি জীবন-জীবিকা-অর্থনীতি নেই?

প্রকাশিত : 06:42 PM, 25 July 2021 Sunday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

ষাট দিন পরপর নিয়ম মেনে বসছে সংসদ। আমি বলি নিয়মরক্ষার সংসদ। এই অতি সংক্ষিপ্ত আর করোনাকালের কঠোর সাবধানতা মেনে বসা সংসদের কয়েক অধিবেশনে বিভিন্ন ইস্যুতে বারবারই এসেছে শিক্ষা প্রসঙ্গ। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, শিক্ষার মান, কারিগরি শিক্ষা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলার মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরি, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবিধা নেওয়ার মতো পরিকল্পনা ইত্যাদি প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীকে দফায় দফায় প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছি আমি। এর মধ্যে অবশ্যম্ভাবী যে বিষয়টি আলোচনায় উঠেছে, তা হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা।

গত দেড় বছরে করোনা কখনো বেড়েছে, কখনো কমেছে। অল্প কিছু দিন বাদ দিলে জীবিকার অজুহাতে পুরো সময়টাই খোলা ছিল অফিস, আদালত, ব্যাংক, কলকারখানা, গার্মেন্টস থেকে শুরু করে অতি ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল এসি মার্কেট, রেস্তোরাঁ–সবকিছু। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, কোনো এক অজানা কারণে করোনা ঝুঁকির সবচেয়ে নিচে থাকা শিশু-কিশোর-তরুণদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, আছে করোনাকালজুড়ে।

শিক্ষামন্ত্রী ভালো বক্তা, বিতার্কিক। দীর্ঘ চর্চা আর অভিজ্ঞতার কারণেই হয়তোবা অতি অযৌক্তিক কথাও সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। দফায় দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা উঠলেও এখন পর্যন্ত তিনি এমন একটিও যুক্তি দেখাতে পারেননি, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনির্দিষ্টকালীন এই বন্ধ মেনে নেওয়া যায়।

এবারের বাজেট সেশনে শিক্ষা খাত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবারও যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার দাবি জানালাম, তখন অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, সরকারি ও তথাকথিত বিরোধী দল, দুই তরফেই এক অদ্ভুত যুক্তি উঠে এসেছে। তাঁরা সমস্বরে বলেছেন, স্কুল খোলার দাবি তাঁরাই সংসদে উঠিয়েছেন যাঁদের সন্তান নেই। আমি যেহেতু প্রতিটি অধিবেশনেই শক্তভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার কথা বলেছি, তাই মনে হতেই পারে, তিরের লক্ষ্যবস্তু আমি। যুক্তিটি যে শুধু অসার তা-ই নয়, হাস্যকরও বটে। অনেকটা যেন এমন, এখন থেকে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা ধর্ষণের শিকার না হলে এই বিষয়গুলো নিয়ে কোনো কথা বলা যাবে না, প্রতিবাদ করা চলবে না। আজব দেশ, আজব যুক্তি–সবই চলে এখানে।

করোনার আঘাত আসেনি বিশ্বে এমন কোনো দেশ নেই। গত দেড় বছরে অন্তত এটুকু বোঝা গেছে, করোনা আসে ঢেউয়ের মতো আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজেকে অনেকটাই রক্ষা করা যায়। কিন্তু তাই বলে আর সবকিছু খোলা রেখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের অদ্ভুত সিদ্ধান্ত কোনো দেশ নেয়নি।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের আর যে দেশগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা আছে সেই দেশগুলো হলো: উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমার, সৌদি আরব, মেক্সিকো, আজারবাইজান, তুরস্ক, ভেনেজুয়েলা, পেরু, উরুগুয়ে, সুরিনাম, মাদাগাস্কার, ইরাক, লাওস, কম্বোডিয়া ও ফিলিপাইন। এর কোনোটিই করোনাকালীন প্রায় পুরোটা সময় সবকিছু খুলে রেখে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখেনি। এর চেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে, এই দেশগুলোর করোনা পরিস্থিতি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ হওয়া দেশগুলোর তুলনায় অনেক ভালো ছিল। করোনায় এর চেয়ে অনেক বেশি বিপর্যস্ত দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান টানা বন্ধ ছিল না, করোনা পরিস্থিতি খারাপ হলে লকডাউনের অংশ হিসেবে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মাঝেমধ্যে বন্ধ হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।

বাংলাদেশের সবকিছু খুলে রেখে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখায় মনে হয়, এই দেশে করোনার সব জীবাণু গিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঘাঁটি গেড়েছে। একের পর এক টালবাহানা করা হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া নিয়ে। অথচ শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে আড্ডাবাজি, শপিং থেকে শুরু করে সবকিছু করে বেড়াচ্ছে। আমরা কে না জানি, করোনায় সবচেয়ে কম ঝুঁকিতে থাকে কিশোর-তরুণেরা। কেউ করোনা আক্রান্ত হলেও তার মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা অতি সামান্য। তাই একটা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখতে হলেও আর সব প্রতিষ্ঠানের আগে খোলা উচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

দীর্ঘকাল শিক্ষার্থীরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে থাকায় নানা রকম সংকট তৈরি হয়েছে। এই দেশের শিক্ষার মান এমনিতেই অতি নিচু। সেই মানে বিপর্যয় তৈরি করেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ ছুটি। এদিকে বোর্ড পরীক্ষার মতো জীবনের বাঁক পরিবর্তনের পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অটোপাস দেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনলাইন ক্লাস চলছে এবং বলা বাহুল্য, অসংখ্য পরিবার তাদের সন্তানদের স্মার্টফোন এবং পর্যাপ্ত মোবাইল ডেটা কিনে দিতে পারেনি। ফলে এখানে তৈরি হয়েছে এক নতুন বৈষম্য–‘ডিজিটাল ডিভাইড’।

করোনাকালে দেশে বাল্যবিবাহ বেড়েছে, বহু মেয়েশিশুর বিয়ে হয়ে গেছে। দেশের বেসরকারি সংস্থাগুলো জরিপ করে স্পষ্টভাবে বলেছে, বহু শিশু স্কুল থেকে চিরতরে ঝরে পড়েছে। কয়েক দিন আগে নারায়ণগঞ্জের হাশেম ফুডসের ফ্যাক্টরিতে আগুনে বেশ কয়েকজন শিশুশ্রমিক মারা যায়। দেশের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়ায় এসেছে, এদের মধ্যে কয়েকজন পড়াশোনা করত, করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় তারা কাজ করতে এসেছিল।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে শিশু-কিশোর-তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যেও।দেখা গেছে, বেশির ভাগ ছাত্রছাত্রী মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেছে। শিশুদের নানা রকম গেম এবং অন্যান্য অ্যাপে আসক্তি বেড়েছে। টিকটকের মতো কোনো কোনো অ্যাপকে কেন্দ্র করে কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে ভয়ংকর সব অপরাধেও। লিখতে লিখতেই মনে হলো এত সব কথা বলা অর্থহীন। এই সরকার কি আসলে কখনো মানুষের সত্যিকার কল্যাণের কথা ভেবেছে?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে নানা হাস্যকর যুক্তির সঙ্গে শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের টিকাদানের কথা বলা হয়। মজার ব্যাপার হলো, কয়েক দিন আগেই জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েটা ফোর ও ইউনেসকোর মহাপরিচালক অড্রে অ্যাজুলের যৌথ বিবৃতিতে এই ব্যাপারটাও এসেছিল।

টানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা দেশগুলোর সরকারগুলোর উদ্দেশে তাঁরা বলেন, ‘আজ পর্যন্ত বিশ্বের ১৯টি দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। এর ফলে ১৫ কোটি ৬০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটা চলতে পারে না। বন্ধের ক্ষেত্রে স্কুলগুলো সবার শেষে এবং পুনরায় খোলার ক্ষেত্রে সবার আগে থাকা উচিত। স্কুলগুলো পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর টিকা দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করা যায় না। স্কুল খোলার জন্য করোনা শূন্যের কোঠায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যায় না।’

যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সংক্রমণ সীমিত পর্যায়ে রাখার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সরকারগুলো অনেক সময়ই স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, এমনকি মহামারিজনিত পরিস্থিতি যখন এটা দাবি করে না, তখনো বন্ধ। প্রায়ই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ব্যবস্থাগুলো শেষ পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়ার বদলে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুলগুলো বন্ধ রাখা হলেও বার ও রেস্তোরাঁগুলো খোলা ছিল।

আরেকটা দিক দেখা যাক। শিক্ষাক্ষেত্রের সঙ্গে জড়িত আছে অসংখ্য মানুষের জীবিকা। সরকারি এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে আছে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে কাজ করছেন লাখ লাখ শিক্ষক। এই মানুষগুলো যে অবর্ণনীয় কষ্টে আছেন, তার রিপোর্ট নিয়মিত আসে মিডিয়ায়। নন-এমপিও শিক্ষক, কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক, এমনকি মালিকদেরও ফুটপাতে চায়ের দোকান দেওয়া, ফল বিক্রি কিংবা রিকশা চালানোর মতো কাজের খবর আমরা নিয়মিতভাবেই দেখেছি।

এদিকে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য আনুষঙ্গিক বইপত্র এবং স্টেশনারির দোকান আছে হাজার হাজার। এসব দোকানের মালিক ও কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবার মিলে নির্ভরশীল জনসংখ্যা কয়েক লাখ। আছে এসব পণ্যের আমদানিকারক। এই ব্যবসার আকারও ছোট নয় কোনোক্রমে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু থাকলে শিক্ষকেরা এবং এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা উপার্জন করতে পারলে সেটা তাঁদের জীবনের সংকট সমাধানে সহায়ক হতো। একই সঙ্গে সেটা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভোগকে বাড়িয়ে অন্যান্য ব্যবসা এবং শিল্পের জন্য চাহিদা তৈরি করত। এভাবেই খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ত অর্থনীতিতে।

সাম্প্রতিক কালে সরকার তথাকথিত ‘সীমিত পরিসরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে’ যত কিছু খুলে দিয়েছে, তার পেছনে যুক্তি দিয়েছে জীবন এবং জীবিকার সমন্বয় করাকে। যুক্তি দেখিয়েছে অর্থনীতির চাকা ঘোরানোকে। এমনকি অল্প কিছু দিন বাদ দিয়ে খোলা ছিল সর্বোচ্চ ঝুঁকির জায়গা রেস্টুরেন্টও, যেখানে গেলে মানুষ আর যাই করুক না কেন, তাকে মাস্ক খুলতে হয়।

তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে, জীবিকা এবং অর্থনীতি যদি বিভিন্ন কিছু চালু করে দেওয়ার জন্য প্রধান কারণ হয়ে থাকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন তার বাইরে থাকল? শিক্ষার সঙ্গে কি জীবিকা-অর্থনীতি নেই? তাহলে অনেকেই যে বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় খুললে সরকারবিরোধী কোনো জোরালো আন্দোলনের আশঙ্কার গোয়েন্দা তথ্য সরকারের আছে, সেটা সত্যি?

রুমিন ফারহানা, সংসদে বিএনপিদলীয় হুইপ

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT