ঢাকা, বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

রাসনৃত্য দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন খোদ রবীন্দ্রনাথ

প্রকাশিত : 01:15 PM, 2 December 2020 Wednesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

১৯২৬ সালে সিলেটের মাছিমপুরে এসে মনিপুরী মেয়েদের রাসনৃত্য উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরে কবিগুরু কমলগঞ্জের নৃত্য শিক্ষক নীলেশ্বর মুখার্জীকে শান্তি নিকেতনে নিয়ে প্রবর্তন করেছিলেন মনিপুরী নৃত্যশিক্ষা। সেই থেকে এই নৃত্য আরও উপমহাদেশে বেশি কৌলিন্যপ্রাপ্ত হয়। এখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আগমন ঘটে। বর্ণময় শিল্পসমৃদ্ধ বিশ্বনন্দিত মনিপুরী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবে সবার মহামিলন ঘটে।

প্রতি বছরের মতো এবারও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে মনিপুরী সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী কৃষ্ণের ১৭৮তম মহারাসলীলা সম্পন্ন হয়েছে। প্রতি বছর মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের মাধবপুরে পূর্ণিমার চাঁদের সঙ্গে মিল রেখে রাস পূর্ণিমা বা রাস উৎসব পালন করা হয়। পৃথকভাবে আদমপুরের মনিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্স ও তেতইগাঁও সানাঠাকুর মণ্ডপ প্রাঙ্গণে এই রাস উৎসব পালিত হয়। উৎসবের সূচনা করা হয় রবিবার সন্ধ্যার কিছু আগে এবং এর সমাপ্তি ঘটে মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের পর।

দুটি পাতা একটি কুঁড়ির অঞ্চল, বৃহত্তর সিলেটের ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্যতম বিশ্বনন্দিত সাংস্কৃতিক ধারক মনিপুরী সম্প্রদায়ের বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব ‘রাসলীলা’। কঠোর নিরাপত্তা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য্যরে মধ্য দিয়ে ধর্মীয় লগ্ন মতে সোমবার দুপুর ১২টার পর ৩টি মণ্ডপে রাখাল নৃত্যের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। পরে ৫ বছরের অধিক বয়সী কিশোরা রাখাল সেজে সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত উন্মুক্ত স্থানে পৃথক ৩টি কদম গাছের নিচে বাদ্যের তালে তালে বাঁশি নিয়ে নাচতে থাকে। রাখাল নৃত্যের বিভিন্ন ধাপে রাধাকৃষ্ণের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনকালের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়।

কথায় আছে ‘যে দেখেনি রাস মিটেনি তার মনের আস’ অর্থাৎ রাসলীলা দর্শনে মনের আশা পূর্ণ হয়। মনে জাগ্রত হয় কৃষ্ণ প্রেম। যুগ যুগ ধরে এই বিশ্বাস নিয়ে মনিপুরীরা তা পালন করে আসছেন। মনিপুরের রাজা মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নদ্রষ্ট হয়ে তার মেয়ে চিত্রাঙ্গদাকে নিয়ে প্রথম শুরু করেছিলেন এ রাসলীলা। তাকে অনুসরণ করে ১৮৪২ সালে এ এলাকায় মনিপুরীরারা কমলগঞ্জ মাধবপুর জোড়া মণ্ডপে রাসলীলার আয়োজন করেন, যা বিগত ১৭৫ বছর ধরে অভ্যাহত রয়েছে।

রাতভর রাধাকৃষ্ণের প্রণয়োপাখ্যানের সে রাসলীলা উপভোগ করতে সারাদেশ থেকে ছুটে আসেন হাজারো নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক, দেশী-বিদেশী পর্যটকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষজন।

সন্ধ্যায় উন্মুক্ত মঞ্চে আলোচনা ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান মনিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সভাপতি প্রকৌশলী যোগেশ্বর চ্যাটার্জির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান, পুলিশ সুপার ফারুক আহমদ, কমলগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক রফিকুর রহমান, কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশেকুল হক। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম কান্ত সিংহ।

মধ্যরাতে পৃথক তিনটি-মণ্ডপে উৎসবের মূল উৎসব রাসলীলা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে এক কিশোরী কৃষ্ণের প্রেয়সী সেজে নাচতে থাকে, পরে অপর কিশোর শ্রীকৃষ্ণ সেজে বাঁশি হাতে নিয়ে নাচে। সবশেষে রাধাকে নিয়ে একঝাঁক গোপিনী একত্রে নাচতে আসে মণ্ডপের ভেতর। এভাবে সারারাত নৃত্যের তালে রাধা ও কৃষ্ণের মিলন ঘটানোর মাধ্যমে মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের পর উৎসবের সমাপ্তি ঘটে।

মণিপুরী মহারাসলীলা সেবা সংঘের সাধারণ সম্পাদক শ্যাম কান্ত সিংহ জানান, চলমান বৈশ্বিক মহামারী করোনা পরিস্থিতির কারণে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে সংক্ষিপ্ত আকারে পালন করা হয়। রাসলীলায় মঞ্চস্থ মনিপুরী নৃত্য শুধু কমলগঞ্জের নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের তথা সমগ্র বিশ্বের নৃত্য কলার মধ্যে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। এখানে ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের আগমন ঘটে। বর্ণময় শিল্পসমৃদ্ধ বিশ্বনন্দিত মনিপুরী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রাস উৎসবে সবার মহামিলন ঘটে।

মনিপুরী ললিতকলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস সিংহ জানান, এখানে সব ধরনের সুবিধা বিদ্যমান থাকায় এটি উৎসবে রূপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উৎসবে যোগ দিতে হাজার হাজার ভক্ত অনুরাগী এখানে এসেছেন। উৎসব উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনা পরস্পর মিলিত হন। এবছর করোনায় কারণে উৎসবকে ঘিরে মিলনমেলায় ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।

রাসলীলায় মনিপুরী নৃত্য শুধু মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশ, তথা সমগ্র বিশ্বের নৃত্যকলায় বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। ১৯২৬ সালে সিলেটের মাছিমপুরে মনিপুরী মেয়েদের পরিবেষ্টিত রাসনৃত্য উপভোগ করে মুগ্ধ হয়েছিলেন বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরে কবিগুরু কমলগঞ্জের নৃত্য শিক্ষক নীলেশ্বর মুখার্জীকে শান্তি নিকেতনে নিয়ে প্রবর্তন করেছিলেন মনিপুরী নৃত্য শিক্ষা। কমলগঞ্জে প্রায় এক মাস আগ থেকেই শুরু হয় রাসোৎসবের প্রস্তুতি। প্রতিবছর এই সময়টায় মনিপুরী সম্প্রদায়ের বাড়ি বাড়ি কুমারী ও কিশোরদের রাসলীলায় অংশগ্রহণ করার জন্য নৃত্য ও সঙ্গীতের তালিম নেয়ার ধুম পড়ে যায়।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT