ঢাকা, বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

মৌলবাদীদের রুখবই ॥ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে অপশক্তির ষড়যন্ত্র নস্যাতের অঙ্গীকার

প্রকাশিত : 09:53 AM, 15 December 2020 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

‘একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্তরসূরিরা এখন ‘নব্য রাজাকারের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বাঙালীর সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানছে। এখন আলোচনা নয়, প্রতিরোধ করার সময়। এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তিকে রুখে দিতে হবে, মৌলবাদী উগ্রবাদী গোষ্ঠীকে শক্তহাতে দমন করতে হবে। নতুন রাজাকারদের আমরা প্রতিহত করবই।’

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা বুদ্ধিজীবীদের সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নানা পেশার মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে এই দৃপ্ত শপথ। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে তার ভাস্কর্য স্থাপনের বিরোধিতা এবং কুষ্টিয়ায় ভাস্কর্য ভাংচুর নিয়ে যখন দেশজুড়ে প্রতিবাদ চলছে, সেই সময়ে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পর মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তিকে প্রতিরোধের প্রত্যয় ঝরেছে নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের কণ্ঠে। ডাক এসেছে ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তিকে রুখে দেয়ার।

সময়ের ব্যবধানে বাঙালীর স্লোগান-দাবিও পাল্টে গেছে। স্বাধীনতার পর দেশবাসীর প্রতিটি অনুষ্ঠানেই ছিল একই দাবি- তা হচ্ছে একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা বিচারের পরিবর্তে যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে করেছে পুরস্কৃত, লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা গণহত্যাকারীদের হাতে তুলে দিয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে স্বাধীনতার পক্ষের মানুষকে। কিন্তু বর্তমান অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত।

২০১৩ সালে বাচ্চু রাজাকারের ফাঁসির রায় কার্যকরের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় কলঙ্ক মোচনের প্রক্রিয়া। এরপর বাঘা বাঘা সব নরহন্তারক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, ফাঁসির রায়ও কার্যকর হয়েছে। তাই এবার স্বজন হারানোর বেদনা আর বুদ্ধিজীবী হন্তারকদের ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে রায় কার্যকরের স্বস্তি- এই ভিন্ন আবহেই সোমবার জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করল কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতি। করোনা মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা স্বাধীনতার পক্ষের সব মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী ও নব্য রাজাকারদের সকল ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধায় ও ভালবাসায় শহীদ বৃদ্ধিজীবীদের স্মরণ করেছেন দেশের মানুষ।

দীর্ঘ চার দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর দেশী-বিদেশী নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজাল ছিন্ন করে শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের হন্তারকদের বিচারের রায় কার্যকরের তৃপ্তি নিয়েই গোটা জাতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় পালন করেছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। তবে করোনার কারণে প্রতিবছরের মতো শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের তীব্র জনস্রোত না থাকলেও খুব একটা কমও ছিল না। বয়োজ্যেষ্ঠ অনেকেই বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে কিংবা রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে যেতে না পারলেও তাদের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধার এতটুকু কমতি ছিল না। তবে দিবসের প্রতিটি কর্মসূচীতে একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্তরসূরি ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদানকারী নব্য রাজাকারদের প্রতিরোধের জন্য দেশবাসীর প্রতি আবেদন ছিল সর্বত্র।

জঙ্গীবাদ-মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার আর স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীমুক্ত দেশ বিনির্মাণে এবার দিবসটিতে নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি ছিল উল্লেখ করার মতো। স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের দোসরদের আরেকবার পরাজিত করার দীপ্ত শপথে যেন একাত্তরের মতোই জেগে উঠেছিল দেশের মানুষ। পথে পথে ছিল নতুন প্রজন্মের জাগরণ। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস জানিয়ে ‘সচেতন নতুন প্রজন্ম’ গড়ে তুলতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তানরা। শহীদদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণের পাশাপাশি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন সর্বস্তরের জনগণও।

জাতীয় জীবনের বেদনাঘন দিনটিতে রাজধানীতে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানিয়েছেন কৃতজ্ঞ বাঙালী জাতি। তাদের হাতে ছিল ফুল, কণ্ঠে ছিল স্বাধীনতাবিরোধীদের মোকাবেলার দৃপ্ত শপথ। বুদ্ধিজীবী হন্তারক যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি প্রবল ঘৃণা-ধিক্কার জানানোর পাশাপাশি দেশে-বিদেশে পালিয়ে থাকা সব যুদ্ধাপরাধীকে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকরের দাবিও ছিল প্রচণ্ড।

বেদনায় আচ্ছন্ন মন, শোকে মুহ্যমান হƒদয়- এমনই এক বেদনাবিধুর পরিবেশে জাতি স্মরণ করেছে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। তবে ছিল না কোন আক্ষেপের সুর কিংবা হতাশার বাণী। শোক যেন এখন পরিণত হয়েছে শক্তিতে। একের পর এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করতে পারায় এবং দেশ দ্রুত এগিয়ে যাওয়ায় এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে লাখো মানুষের কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার ওপর আস্থা ও বিশ্বাসের ধ্বনিও উচ্চারিত হয়েছে। একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করার শপথ নিয়েছেন স্বাধীনতার পক্ষের সকল মানুষ।

শীতের আগমনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোভিড-১৯ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে এবার সীমিত পর্যায়ে পালিত হয়েছে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। করোনার কারণে এবার স্বশরীরে উপস্থিত থেকে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারেননি রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সকালে রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল শামীম উজ জামান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকীব আহমেদ চৌধুরী স্মৃতিসৌধের বেদিতে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণের মাধ্যমে জাতির বীর সন্তানদের প্রতি এই শ্রদ্ধা জানান। জাতীয় সংসদের স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পক্ষে সকালে শহীদ বৃদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জাতীয় সংসদের সার্জেন্ট এ্যাট আর্মস এম এম নাঈম রহমান।

এরপর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করেন। এর আগে তারা ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যরাও এ সময় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি হয়েছে। অন্যদেরও বিচার প্রক্রিয়া চলছে। তাইতো এবার শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শহীদদের স্মরণ করতে আসা সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখছেন স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধীমুক্ত একটি আধুনিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের। রায়েরবাজার বধ্যভূমি ও মিরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আসা সব বয়সী শ্রেণী পেশার মানুষের কণ্ঠে ছিল এমনই সুর। করোনার মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিনভর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতাসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ জড়ো হয়েছিল মিরপুর আর রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে। তাদের হাতে ছিল ফুল, কণ্ঠে ছিল সব স্বাধীনতাবিরোধী নব্য রাজাকারদের প্রতিরোধের দাবি। নতুন প্রজন্মসহ দেশমাতৃকার সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অমর স্মৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে আসা শোকার্ত মানুষের কণ্ঠে ছিল অভিন্ন আওয়াজ-‘বঙ্গবন্ধুর বাংলায়, স্বাধীনতাবিরোধী, যুদ্ধাপরাধী ও নব্য রাজাকারদের ঠাঁই নাই’।

মানুষের বিনম্র শ্রদ্ধায় ফুলে ফুলে ভরে উঠেছিল মিরপুর ও রায়েরবাজার শহীদ বৃদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ। শোকার্ত মানুষ মিরপুর এবং রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুলে ফুলে নিবেদন করেছেন তাদের প্রাণের অর্ঘ্য। এ দুটি স্থানে একটি বা দু’টি ব্যানার নয়, পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর হায়েনাদের দেশমাতৃকার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যার পর বধ্যভূমিতে ফেলে রাখার অসংখ্য নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ আলোকচিত্র শ্রদ্ধা জানাতে আসা হাজারও বাঙালীকে শিহরিত করে তুলেছিল। বুদ্ধিজীবী হত্যায় জড়িত আল বদরনেতাসহ কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর হওয়ায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ গড়ার পথ আরও মসৃণ হওয়ার আশা বুকে ধারণ করেছেন শহীদ পরিবারের সদস্যরা। রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে একাত্তরে দেশের মেধাবী সন্তানদের হত্যার প্রতীকী চিত্রও তুলে ধরা হয়।

সকালে কলো পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা, শহীদদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বালন, শোক শোভাযাত্রা, শ্রদ্ধা নিবেদন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে পালন করা হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে সকালে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে বিপুলসংখ্যক মানুষ উপস্থিত হন। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই মানুষ ভিড় করে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে। এ সময় সবার হাতে ছিল ফুলের তোড়া, কালো ব্যানারে আর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে লেখা ‘বুদ্ধিজীবীর স্মরণে ভয় করি না মরণে’ বুদ্ধিজীবীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’ ‘জামায়াত, শিবির, রাজাকার এই মুহূর্তে বাংলা ছাড়’। আর কণ্ঠে একাত্তরের ঘাতক রাজাকার, আলবদর যুদ্ধাপরাধী ও তাদের মদদদাতাদের পরাজিত করার প্রত্যয় সেøাগান; দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে স্মৃতিস্তম্ভের বেদিমূলে যাওয়ার অপেক্ষা।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর একে একে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় শহীদ পরিবারের সন্তান, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা, কেন্দ্রীয় ১৪ দল, আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, গণফোরাম, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এছাড়া ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা লীগ, শ্রমিক লীগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, শেখ হাসিনা পরিষদ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসন, উদীচী, ছাত্র ইউনিয়নসহ অজস্র সংগঠন দিনভর শ্রদ্ধা জানান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসর সকালে আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই পুষ্পমাল্য নিয়ে একে একে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হাজির হতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিক, সংস্কৃতি কর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে অনেক বাবা-মাও চলে আসেন শহীদ বেদিতে। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে গান, কবিতা ও বক্তৃতামালায় বৃদ্ধিজীবীদের স্মরণ করেন তারা।

রায়ের বাজার বাধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব বুদ্ধিজীবী পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আগামী ২৬ মার্চ প্রকাশ করা হবে। ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমরা এক হাজার ২২২ জন বুদ্ধিজীবীর একটি তালিকা প্রকাশ করেছি। আরও যারা যারা শহীদ হয়েছেন তাদের কারও নাম বাদ পড়েছে কিনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদের সবাইকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তালিকা ২৬ মার্চ প্রকাশ করা হবে। সারাদেশ থেকে আমরা বুদ্ধিজীবী হত্যার ইতিহাস সংগ্রহ করছি।

শ্রদ্ধা জানাতে এসে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মাঝে মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারা নানা ছদ্মাবরণে আমাদের সংস্কৃতির ওপর আঘাত হানার চেষ্টা চালায়। যারা একাত্তর সালে ফতোয়া দিয়েছিল যে মুক্তিযোদ্ধারা সবাই কাফের, তারা এই অপচেষ্টাগুলো চালাচ্ছে। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির ঐক্য, সংহতি আজকের প্রেক্ষাপটে অনেক বেশি প্রয়োজন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনভাবে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া প্রয়োজন, এটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। কারণ এটি প্রকারান্তরে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা। এটি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও বিরোধী দলীয় উপনেতা গোলাম মোহাম্মদ কাদের তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দেশের মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি পালন করেই একটি সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ চায়। গুটিকয়েক মানুষ বাঙালী সংস্কৃতির বাইরে থাকতে পারে, কিন্তু যারা বাঙালী সংস্কৃতির বাইরে তারা কখনই দেশের নীতিনির্ধারক হতে পারে না। আর সাম্প্রদায়িকতা বাঙালী জাতির ঐতিহ্য নয়। আমরা ধর্মপ্রাণ, ধর্মকে ভালবাসি। কিন্তু ধর্মের গোঁড়ামিকে পছন্দ করি না। যারা আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তা বাস্তবসম্মত নয়, জনগণের মনের কথা নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আখতারুজ্জামান বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপন করব এই বছর। একইসঙ্গে চলছে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। এই দুটো বিষয় মিলিয়ে এবারের বুদ্ধিজীবী দিবসের একটা স্বতন্ত্র তাৎপর্য রয়েছে। এ সন্ধিক্ষণে সাম্প্রাদায়িক অপশক্তির আস্ফালনকে ‘ক্ষণিকের বিষয়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িক উগ্র গোষ্ঠীর স্থান কখনও এই দেশে হয়নি, হবেও না। এগুলো ক্ষণিকের জন্য উত্থান হতে পারে। কেননা বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার পানি, বাংলার বাতাস সব কিছুই অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধে সম্পৃক্ত। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের চেতনাও ছিল তাই। এই দিনে আমাদের প্রত্যাশা, এদেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটুক।

শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সন্তান ও মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, একাত্তরের পরাজিত শক্তি মৌলবাদীরা আমাদের সংস্কৃতির ওপর এখন হাত দিয়েছে। সোনার বাংলার আদর্শ-অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র ও বাঙালী জাতীয়তাবাদের বিপরীতমুখী বাংলাদেশকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। তাই এখন আলোচনার সময় নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধের সময়। এখনই মৌলবাদী গোষ্ঠীকে নির্মূল করতে হবে। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তাদের স্মরণ করার মধ্য দিয়ে দিয়ে আমরা বলিষ্ঠ হব, মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলব।

শ্রদ্ধা জানাতে আসা মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও বুদ্ধিজীবীরা ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এই দেশের জন্য জীবন বাজি রেখেছেন। একাত্তর সালে যে মানুষগুলো আমাদের দেশের প্রাণভ্রোমরা বুদ্ধিজীবীদের মেরে ফেলেছিল, বাংলাদেশকে বুদ্ধিহীন করার যে অপচেষ্টা তারা করেছিল, মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পর এসেও তাদের সেই আস্ফালন আমরা দেখতে পাচ্ছি। সেই হন্তারকদের কবল থেকে বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত মুক্ত হতে পারেনি। ভাস্কর্য নিয়ে তাদের যে আস্ফালনটা আমরা দেখছি তা থেকে বোঝা যায় এই অপশক্তিও পুরোপুরি জামায়াতের দোসর। একাত্তরের মতোই এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

গত ছয় বছর ধরে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে ‘কাদামাখা মাইক্রোবাস’ নামের একটি নাটক পরিবেশন করে আসছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের থিয়েটার জয়বাংলা। এই দলের নাট্যকর্মীরা বলেন, কেবল বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ঘটনা নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস আমাদের সামনে আরও বেশি বেশি করে নিয়ে আসা উচিত। কারণ এখন চারদিক থেকে আমাদের সংস্কৃতির ওপরে যেভাবে আক্রমণ চলছে, সংস্কৃতিকে ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটা অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি মৌলবাদীরা শহীদ মিনার, স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য ধ্বংস করে দিতে চায়। এদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT