ঢাকা, শুক্রবার ৩০ জুলাই ২০২১, ১৫ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

শিরোনাম
◈ রক্ষক যেনো ভক্ষকের ভুমিকায় না যায়! কুষ্টিয়ায় অবৈধ উপায়ে কাউন্সিলরের অফিস নির্মাণের অভিযোগ ◈ বিশ্বে করোনায় মৃত্যু ৪২ লাখ ছাড়াল ◈ জনগণের পাশে দাঁড়ানোর অক্ষমতা ঢাকতে বিএনপির মিথ্যাচার : ওবায়দুল কাদের ◈ যার হয়ে জেলে ছিলেন মিনু, অবশেষে গ্রেপ্তার সেই কুলসুমী ◈ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক কারখানা খুলে দিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ব্যবসায়ীদের আবেদন ◈ হকিতে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে কোয়ার্টারে ভারত ◈ টোকিও অলিম্পিক: সাঁতারে বিশ্ব রেকর্ড গড়ল চীন ◈ ঠিক সময়ে শুটিং শেষ না হলে পারিশ্রমিক দ্বিগুণ! ◈ মেরিলিন মনরোর বায়োপিক নিয়ে খারাপ খবর ◈ সিগারেট নয়, গাঁজায় ভবিষ্যৎ দেখছে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো

মাইজভাণ্ডারি সোহেলকে জবাই করে জঙ্গীরা, ভিডিও করে পুরো দৃশ্য

প্রকাশিত : 10:23 AM, 15 September 2020 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

কবিরাজির কথা বলে একটি পরিত্যক্ত ইটভাঁটিতে ডেকে নিয়ে মাইজভা-ারি সোহেল রানাকে জবাই করে জঙ্গীরা। জবাইয়ের পুরো দৃশ্য ভিডিও করা হয় মোবাইলে। তারপর সেই লাশ বস্তায় ভরে নৌকায় করে নেয়া হয় কাপাসিয়া ব্রিজ এলাকায়। নাড়িভুঁড়ি কেটে বের করে পাথর বেঁধে লাশ ফেলে দেয়া হয় নদীতে। জবাইয়ের আগে প্রথমে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সোহেল শরবত খেতে না চাইলে তার হাত-পা বাঁধা হয়। জঙ্গী নেতা সুমন তাকে নিজ হাতে জবাই করে। ঢাকার কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ট ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) একটি দল গত ১৩ সেপ্টেম্বর গাজীপুরে সোহেলের লাশ উদ্ধারের জন্য অনুসন্ধান চালিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

গত ৩১ জুলাই ঈদের আগের রাতে নৃশংস এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন ইসলামিক স্টেট-আইএসের অনুসারী বাংলাদেশের নব্য জেএমবির একটি সেল। আইএসের আদলেই জবাইয়ের ভিডিও ধারণ করে তা নিজেদের একাধিক প্রোপাগান্ডা চ্যানেলে প্রচার করে। গত ১৬ আগস্ট আইএস এই হত্যার দায় স্বীকার করে। আইএসের মিডিয়া সেল থেকে নিয়ে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ নিহত সোহেলের একাধিক ছবিও প্রকাশ করেছিল।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা বলছেন, গত ২৪ জুলাই রাজধানীর পল্টনে একটি বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এর সঙ্গে নব্য জেএমবির নতুন একটি গ্রুপের সন্ধান পান তারা। পরে ১১ আগস্ট অভিযান চালিয়ে সিলেট থেকে নব্য জেএমবির পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত জঙ্গীরা পল্টনে বোমা বিস্ফোরণের পাশাপাশি তাদের সদস্যরা নওগাঁয় একটি মন্দিরে বোমা হামলা ও গাজীপুরে এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছে বলে জানায়।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, সিলেট থেকে গ্রেফতার হওয়া জঙ্গীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তারা গাজীপুরকেন্দ্রিক সেলটির সদস্যদের শনাক্তের চেষ্টা করছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১১ সেপ্টেম্বর উত্তরার আজমপুর থেকে মামুন আল মুজাহিদ ওরফে সুমন ওরফে আব্দুর রহমান, আল আমীন ওরফে আবু জিয়াদ, মোজাহিদুল ইসলাম ওরফে রোকন ওরফে আবু তারিক ও সারোয়ার রহমান রাহাতকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর চার জঙ্গী পল্টনে বোমা বিস্ফোরণে জড়িত থাকার পাশাপাশি গাজীপুরের মাইজভা-ারি সোহেল রানাকে জবাই করে হত্যার কথাও স্বীকার করে।

সিটিটিসি উপ-কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রেফতার হওয়া চার জঙ্গী পল্টনের বোমা বিস্ফোরণ ছাড়াও আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। আমরা সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে দেখছি।’ আইএসের দায় স্বীকার করা মাইজভা-ারি সোহেল হত্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাইজভা-ারি সোহেল রানাকে হত্যার বিষয়েও জঙ্গীরা কিছু তথ্য দিয়েছে। কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত লাশ উদ্ধার হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

যেভাবে হত্যা করা হয় মাইজভা-ারি সোহেলকে ॥ কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্র জানায়, সিলেট থেকে গ্রেফতার হওয়া শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র নাইমুজ্জামান নব্য জেএমবির সামরিক শাখার দায়িত্ব পালন করছিল। নাইমুজ্জামান দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জঙ্গী সদস্য রিক্রুট করে তাদের ‘টার্গেট কিলিং’সহ বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে হামলার নির্দেশনা দিয়েছিল। গাজীপুরের শ্রীপুরের বড়মি বাজার এলাকার মামুন আল মুজাহিদ চলতি বছরের শুরুর দিকে নাইমুজ্জামানের হাত ধরে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়। এরপর তাকে একটি টার্গেট ফিক্সড করে আইএসের আদলে হত্যার নির্দেশনা দেয়।

জিজ্ঞাসাবাদে মামুন আল মোজাহিদ ওরফে সুমন জানান, আল-আমীন, রোকন ও রাহাত তার মাধ্যমেই নব্য জেএমবিতে সম্পৃক্ত হয়। আরবী জিলহজ মাসের ১০ তারিখের মধ্যে তাদের কোন একটি ‘কাজ’ করে দেখানোর দায়িত্ব ছিল। নাইমুজ্জামানের নির্দেশনা মতে তারা টার্গেট ফিক্সড করতে গিয়ে বড়মি বাজারের মাইজভা-ারি সোহেল রানাকে টার্গেট করে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ (৩১ জুলাই, ২০২০) সন্ধ্যায় তারা বড়মি বাজার থেকে মাইজভা-ারি সোহেল রানাকে কবিরাজি চিকিৎসার কথা বলে পাশের একটি ইটভাঁটিতে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে সোহেল রানাকে আটকে রেখে বিষয়টি সামরিক শাখার প্রধান নাইমুজ্জামানকে জানায়। নাইমুজ্জামান তাকে দ্রুত ‘কাজ’ অর্থাৎ জবাই করে হত্যা করতে বলে।

মামুন আল মুজাহিদ ওরফে সুমন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, তারা প্রথমে হত্যার বিষয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ছিল। এদিকে নির্দেশনা মতো জিলহজ মাসের ১০ তারিখও অতিক্রম হয়ে যাচ্ছিল। রাতে তারা একবার শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়াতে চেয়েছিল সোহেলকে। কিন্তু সোহেল শরবত খেতে না চাওয়ায় তার হাত-পা বেঁধে কিছুক্ষণ ফেলে রাখা হয়। পরে মামুন নিজ হাতে সোহেলকে জবাই করে। পুরো বিষয়টি মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ভিডিও করে নাইমুজ্জামানের কাছে পাঠায়। পরে লাশটির পেট কেটে নাড়িভুঁড়ি বের করে শরীরের সঙ্গে ইট বেঁধে বস্তায় ভরে। সকালে একটি নৌকায় করে কাপাসিয়া ব্রিজের কাছে নদীতে ফেলে দেয়।

সিটিটিসির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা গাজীপুরে একটি টিম পাঠিয়েছি। জঙ্গীদের দেয়া তথ্য আমাদের টিম সরেজমিন গিয়ে যাচাই-বাছাই করছে। আমরা লাশটি উদ্ধারের চেষ্টা করছি। ইতোমধ্যে যে নৌকার মাধ্যমে লাশের বস্তা নেয়া হয়েছে সেই মাঝিকেও শনাক্ত করা হয়েছে। লাশ উদ্ধার হলে তাদের বিরুদ্ধে আলাদা একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হবে।’

যা বলছে মাইজভা-ারি সোহেলের পরিবার ॥ মাইজভা-ারি সোহেলের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তারা প্রায় আড়াই মাস ধরে সোহেলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাচ্ছেন। সোহেলের কী হয়েছে এ বিষয়ে তাদের কোন ধারণা নেই। যোগাযোগ করা হলে সোহেলের ভাই সাইফুল ইসলাম জুয়েল জানান, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও থানাধীন শিলসি গ্রামে। তার বাবা আবুল কাশেম মাইজভা-ারির মতাদর্শের অনুসারী। কয়েক বছর আগে তার বড় ভাই সোহেলও মাইজভা-ারির মুরিদ হন। বছর কয়েক আগে ভাবির সঙ্গে বিচ্ছেদ হওয়ার পর তার ভাই সোহেল বিভিন্ন মাজারে মাজারে ঘুরে বেড়ান আর তাবিজ, সুতা, পাথর ইত্যাদি বিক্রি করেন।

সাইফুল ইসলাম জুয়েল জানান, তার ভাই গাজীপুরের শ্রীপুরের বড়মি বাজারে থাকতেন। মাঝে মধ্যেই বাড়িতে আসতেন। কোরবানির ঈদের আগের দিন অর্থাৎ ৩১ জুলাই বাবার সঙ্গে তার ভাইয়ের সর্বশেষ কথা হয়। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ। উল্লেখ্য, গ্রেফতার হওয়া জঙ্গী মামুন আল মুজাহিদ ওরফে সুমনও জানিয়েছে, ৩১ জুলাই সন্ধ্যায় তারা মাইজভা-ারি সোহেলকে ইটভাঁটিতে নিয়ে মধ্যরাতে জবাই করে হত্যা করেছেন।

জঙ্গী সুমনের বিরুদ্ধে এক ডজন মামলা ॥ পল্টনে বোমা বিস্ফোরণ ও মাইজভা-ারি সোহেল হত্যার সঙ্গে জড়িত মামুন আল মুজাহিদ ওরফে সুমন ওরফে আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে এক ডজন মামলার সন্ধান পেয়েছে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের কর্মকর্তারা। চাঁদাবাজি, ডাকাতি, লুটতরাজ ও অস্ত্র মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শ্রীপুরের বড়মি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করে ঢাকার তিতুমীর কলেজ থেকে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্পন্ন করে মামুন আল মুজাহিদ ওরফে সুমন।

সুমনের দাবি, তার বাবা মোসলেম মাস্টার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় আরেক নেতা রাজনৈতিক কারণে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছে। এসব কারণে হতাশ হয়ে সে ধীরে ধীরে ধর্মীয় বিষয়ে আগ্রহী হয়। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নব্য জেএমবির এক সদস্য তাকে নাইমুজ্জামানের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। মাইজভা-ারি সোহেলকে হত্যার মাধ্যমে সে সংগঠনে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে। সিলেটে নাইমুজ্জামানের মেসে গিয়ে তার বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই চার সহযোগীসহ নাইমুজ্জামানকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সোহেল রানা ছিলেন তান্ত্রিক ॥ শেখ আব্দুল আওয়াল ময়মনসিংহের গফরগাঁও থেকে জানান, গফরগাঁওয়ে মজিবুল বশর মাইজ ভা-ারির অনুসারী সোহেল রানা ছিলেন তান্ত্রিক জাদুকর। হঠাৎ করেই ৩১ জুলাই বাবার সঙ্গে শেষ কথা বলে নিখোঁজ হন। নিখোঁজের ১৬দিন পর এক লোক সোহেল রানার জাতীয় পরিচয়পত্র ও একটি ছবি প্রকাশ করে পৌর শহরের এক কাউন্সিলরকে দিয়ে তার পরিচয় জানতে চায়। ওই কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে জনকণ্ঠকে জানান, বিশ্বব্যাপী জঙ্গীগোষ্ঠীর অনলাইন তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ গত ১৬ আগস্ট ২টি ছবি প্রকাশ করে। ওই দুটি ছবির মধ্যে কোন নাম পরিচয় প্রকাশ না করলেও একটি ছবি পৌর কাউন্সিলর ওই লোককে অবহিত করে বলেন, ছেলেটির নাম সোহেল রানা (৩৮) পিতা আবুল কাশেম ভা-ারি, গ্রাম- শিলাসী, পৌর শহরের ৯নং ওয়ার্ড।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT