ঢাকা, বুধবার ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১লা বৈশাখ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বৈশাখ উদ্যাপনের আশা ছাড়ছে না বাঙালী

প্রকাশিত : 09:11 AM, 4 April 2021 Sunday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের আশা ছাড়ছে না বাঙালী। করোনা সংক্রমণ বাড়ায় এক সপ্তাহের জন্য লকডাউনে যাচ্ছে গোটা দেশ। এরপর আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর জোর চেষ্টা চালানো হবে। একইভাবে ফের নেয়া হবে বাংলা নববর্ষবরণের প্রস্তুতি। বিশেষ করে মৌলবাদের ভয়ঙ্কর উত্থানের কালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত উদার অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কথা বলতে চান আয়োজকরা। প্রতিবাদী চেতনায় নতুন করে জেগে ওঠার প্রত্যয়েই বরণ করতে চান ১৪২৮ বঙ্গাব্দকে।

বাংলাদেশে সারা বছরই নানা উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তবে সবচেয়ে বর্ণিল উৎসবটির নাম পহেলা বৈশাখ। আনন্দঘন দিনের জন্য অনেক আগে থেকে প্রতীক্ষা করতে থাকে বাঙালী। শুধু মুসলমান বা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান নয়, সব ধর্মের মানুষ সমান আগ্রহ নিয়ে উৎসবে যোগ দেয়। উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বড় সুযোগ করে দেয় বাংলা নববর্ষ। কিন্তু সংক্রমণ বাড়তে থাকায় গত বছর বর্ষবরণ উৎসব আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। প্রথমবারের মতো বর্ষবরণের আনুষ্ঠানিকতা বাতিল করে ছায়ানট। উদ্যোগী হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদও। ঘুম থেকে ভোরে উঠে রমনা বটমূলে যাওয়া হয়নি রাজধানীবাসীর। গান গেয়ে আবাহন করা হয়নি ১৪২৭ বঙ্গাব্দকে। আকর্ষণীয় মঙ্গল শোভাযাত্রায় যোগ দেয়া হয়নি। ছোট বড় সব আয়োজন বন্ধ ঘোষণা করে ঘরে ঢুকে পড়তে হয়েছিল সংগঠকদের। সাধারণ মানুষও নতুন পোশাক কিনতে পারেনি। আগের বছরের শাড়ি পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বাসার ছাদে বারান্দায় অনেকে পায়চারি করে কাটিয়েছেন। সেই মনোকষ্ট হতাশা এবার আর থাকবে না বলেই আশা করা হচ্ছিল। করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে গিয়েছিল অনেকখানি। নিউ নরমাল সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বর্ষবরণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আয়োজকরা। অনেক আগে সীমিত পরিসরে নতুন বছর ১৪২৮ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল ছায়ানট। একইভাবে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের কথা জানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ।

তবে বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির আবারও অবনতি হয়েছে। গত কয়েকদিনে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার অনেক বেড়েছে। দুটোতেই হয়েছে নতুন রেকর্ড। অবস্থা পর্যবেক্ষণে নিয়ে সোমবার থেকে গোটা দেশে লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। জরুরী ও অতি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো ছাড়া সবই এ সময় বন্ধ থাকবে। তবে এরপর অবস্থার উন্নতি হলে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানার শর্তে খুলে দেয়া হবে অনেক কিছুই। কিন্তু বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন কতটা সম্ভব হবে?

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যাচ্ছে এখনই হাল ছাড়তে নারাজ উৎসবের মূল আয়োজকরা। তারা বলছেন, পহেলা বৈশাখের এখনও অনেকদিন বাকি। এ সময়ের মধ্যে অবস্থার উন্নতি হবে বলেই আশা করছেন তারা। মোটামুটি উন্নতি হলে অনেক কিছুই পুরনায় সচল হবে। তারাও তখন ফিরতে চান উৎসবে।

অবশ্য উৎসব বলা হলেও পহেলা বৈশাখকে বাঙালী শুধু উৎসব হিসেবে দেখে না কখনই। ষাটের দশকে প্রতিবাদের অংশ হিসেবে বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা করা হয়। বিপুল এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে নিজেদের উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় বাঙালী। মুক্তিযুদ্ধের মৌল চাওয়াগুলোকে সামনে রাখার চেষ্টা করে। এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ নেয়। এসব বিবেচনায় বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের রয়েছে আলাদা তাৎপর্য। পাশাপাশি এবার স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তীর মাহেন্দ্রক্ষণটিকে উদ্যাপনের অংশ করতে চান আয়োজকরা।

তবে করোনাকালেও সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে মৌলবাদের উত্থান। উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বাংলাদেশের ৫০ বছরের সকল অর্জনকে ব্যর্থ করে দিতে ওঠে পড়ে লেগেছে। এখনও দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তারা। বিশেষ করে গত কয়েকদিনের ঘটনায় তা স্পষ্ট। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দিনে ১৭ মার্চ হেফাজতে ইসলাম নামের উগ্রপন্থীরা সুনমাগঞ্জের শাল্লায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বাসাবাড়িতে হামলা চালিয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে ২৬ মার্চ আরও বড় তা-ব চালিয়েছে তারা। ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের কয়েকটি এলাকায় ভয়ঙ্কর এ তান্ডব চালানো হয়। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ম্যুরালে ভাংচুর চালানো হয়। এখনও জঙ্গীগোষ্ঠী মাঠ ছাড়েনি। ওরা যখন মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখন মুক্তিযুদ্ধের শক্তির আর ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। বাঙালীর চির উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা আরও জরুরী হয়ে পড়েছে। এ কারণেও বর্ষবরণ উৎসবে ফিরতে চান বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।

ছায়ানটের সাধারণ সম্পাদক লাইসা আহমেদ লিসা জানান, রমনা বটমূলেই প্রভাতী অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। রিহার্সালও করছে শিক্ষার্থীরা। ধানমন্ডির শঙ্কর এলাকায় অবস্থিত ভবনের বড় বড় কক্ষে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখেই চলছে রিহার্সাল। বর্তমান সময়টিকে আমলে নিয়ে তাদের জন্য গান নির্বাচন করে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রতিকৃৎ সন্জীদা খাতুন। গানগুলো শিক্ষার্থীরা নিয়মিতই চর্চা করছেন বলে জানান লিসা।

তিনি বলেন, অন্যান্য বছর শতাধিক শিল্পী নিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান করেছি আমরা। এবার তা অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে। প্রয়োজনে লোক সমাগম কমিয়ে বা দর্শকশূন্য মঞ্চে অনুষ্ঠান করার চিন্তা করছেন বলে জানান তিনি।

অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখনও বন্ধ। হলগুলো ফাঁকা। চারুকলা অনুষদের যে শিক্ষার্থীরা মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন তারা ক্যাম্পাসে নেই। এ অবস্থায় সীমিত পরিসরে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজন করা হবে বলে জানিয়েছেন অনুষদের ডিন শিল্পী নিসার হোসেন।

জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের কাজে শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষক নিয়োজিত থাকেন। বরেণ্য শিল্পীরা ছবি আঁকেন। সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা আসে তা দিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে। ফলে আগের মতো করে কিছু আয়োজন করা সম্ভব হবে না। বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় ১০০ জন নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের সিদ্ধান্ত দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। উগ্রবাদী হামলা ও ষড়যন্ত্রের বিপরীতে মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে বাঙালীর উদারনৈতিক ভাবাদর্শ জোরালোভাবে প্রচার করতে চান বলে জানান তিনি।

এদিকে সময় ঘনিয়ে আসায় পহেলা বৈশাখ উদ্যাপনের বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ও। ইতোমধ্যে ছায়ানট, চারুকলা অনুষদ ও সাংস্কৃতিক জোটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, বাঙালী সবসময়ই খুব গুরুত্ব দিয়ে পহেলা বৈশাখ উদ্যাপন করে থাকে। গতবার করোনার জন্য সম্ভব হয়নি। এবারও করোনাই বাধা। তবে আমরা এখনই কোন সিদ্ধান্তে যাচ্ছি না। পর্যবেক্ষণে রাখছি সবকিছু। সবাই চাইলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে উৎসব উদ্যাপন করা হবে।

এদিকে পহেলা বৈশাখ সামনে রেখে চলছে কেনাকাটাও। শনিবার পর্যন্ত ঢাকার মার্কেট ও শপিংশমলে উৎসবপ্রেমীদের কেনাকাটা করতে দেখা গেছে। বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের ‘দেশী দশ’ সেজেছে বৈশাখের পোশাকে। এখানে দশ প্রতিষ্ঠানের প্রতিটিতেই বৈশাখের নতুন পোশাক। বিভিন্ন ডিজাইন দেখে পছন্দ করে পোশাক কিনতে দেখা গেছে ক্রেতাদের। এর বাইরে চলছে অনলাইন কেনাকাটা। লকডাউনের সময় অনলাইন কেনাকাটা আরও বাড়বে বলেই আশা করছেন বিক্রেতারা।

‘সাদা কালো’র কর্ণধার আজহারুল হক আজাদ বলেন, আমরা আমাদের সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। বাঙালীর উৎসবের সঙ্গে থাকতে চাই। তাই অনলাইনে আমাদের পোশাক কেনা যাচ্ছে। বিক্রিও ভাল বলে জানান তিনি।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে লোক ও কারুশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরাও বহুদিন ধরে ব্যস্ত সময় পার করছেন। রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী শখেরহাঁড়ি দিয়ে ঘর ভর্তি করে রেখেছেন শিল্পী মৃত্যুঞ্জয় কুমার পাল। মোবাইল ফোনে জনকণ্ঠকে তিনি বলেন, আমাদের পরিবারের সবাই মিলে শখের হাঁড়ি গড়েছি। ঘর ভর্তি মাল। বৈশাখী মেলায় বিক্রির চিন্তা ছিল। এখন কি হবে জানি না। তবে অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। সবমিলিয়ে বৈশাখ উদ্যাপনের আশা এত সহজে ফিকে হচ্ছে না।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT