ঢাকা, মঙ্গলবার ১৯ জানুয়ারি ২০২১, ৬ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বিজয়ের মাসেই পদ্মা জয়

প্রকাশিত : 08:13 AM, 11 December 2020 Friday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

২০০১ সালের চার জুলাই পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন থেকেই দেশের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এর মধ্যে কেটেছে ১৯ বছরের বেশি সময়। আর বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা দুই মিনিটে দেশে আরেকটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। পদ্মা সেতুতে সর্বশেষ স্প্যান বসানো হয়েছে এই মাহেন্দ্রক্ষণে। যুক্ত হয়েছে মাওয়া-জাজিরা দুই প্রান্ত। দৃশ্যমান হয়েছে ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটারের সেতুটি। এরমধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে স্বপ্ন। অবসান হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার। রচিত হয়েছে ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন। ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে এই দিনটি। দেশী ও আন্তর্জাতিক নানা চক্রান্ত পেছনে ফেলে দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত হলো দেশের যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বড় এই প্রকল্প। এখন বাকি শুধু যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেয়া। সবকিছু ছাপিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ সৃষ্টি করল আরও এক বিস্ময়।

দুপুরে সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর শেষ স্প্যানটি যখন বসে তখন নদীর দু’পাড়ে হাজারও উৎসুক জনতার ভিড়। শেষ পর্যন্ত অনেকেই নদীর পাড়ে থাকতে পারেননি। শুভক্ষণের সাক্ষী হতে শত শত বোট নিয়ে উৎসুক জনতা চলে আসেন ঘটনাস্থলে। সর্বশেষ স্প্যান সংযোগের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশ আরেকটি স্বপ্নকে স্পর্শ করছিল ঠিক এই মুহূর্তে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানান সবাই। তিন ঘণ্টা চেষ্টার মধ্যে চারপাশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত এক সুতোয় গেঁথে দৃষ্টি সীমায় পূর্ণ রূপে ভেসে ওঠে সেতুর মূল অবকাঠামো। এজন্য বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বিশ্ব দেখছে নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম বাংলাদেশ। এজন্য বৃহস্পতিবারের পুরো দিনটিতেই আন্তর্জাতিক মহলের নজর ছিল বাংলাদেশের ওপর। অল্প সময়ের মধ্যে বিশ^ গণমাধ্যমে উঠে আসে দক্ষিণের ২৯ জেলাসহ পদ্মা সেতুর মধ্য দিয়ে গোটা দেশকে যুক্ত করার খবর; যা একসময় গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়। শেষ পর্যন্ত সেতুটি দৃশ্যমান হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলেছেন সবাই।

সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চলাচলের পথ সুগম হলো। সময় বাঁচল কয়েক ঘণ্টা। দূরত্ব কমবে ৭০ থেকে শত কিলোমিটার পথের। ফলে সময় বাঁচবে তিন ঘণ্টার বেশি। উপকৃত হবে তিন কোটির বেশি মানুষ। দারিদ্র্য কমবে এক দশমিক নয় শতাংশ হারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেতুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে ভবিষ্যত বাংলাদেশ।

বুধবার বিকেল সোয়া পাঁচটায় কাক্সিক্ষত পিয়ারের উদ্দেশ্যে ভাসমান ক্রেন তিয়ান-ই রওনা দেয়। পদ্মা সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মোঃ আব্দুল কাদের জানান, ঘন কুয়াশার কারণে গতকাল বিকেল সোয়া পাঁচটায় স্প্যানটি নিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রেনটি রওনা দেয়। এটি বসানোর পর সব স্প্যান বসানো সম্পূর্ণ হয়। আর তাতেই দৃশ্যমান পুরো সেতু। বুধবার বিকেলেই স্প্যানটি খুঁটি থেকে প্রায় ২০ মিটার দূরে ভাসমান ক্রেনে এনে রাখা হয়। বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে স্প্যানটি নিয়ে খুঁটির দিকে রওনা দেয় ভাসমান ক্রেন। এ সময় ঘটনাস্থলে এক উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। সর্বশেষ স্প্যানটির এক পাশে টাঙানো হয় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। অন্য পাশে চীনের পতাকা।

স্প্যানটি নিয়ে ভাসমান ক্রেন যখন খুঁটির দিকে রওনা দেয়, তখন উপস্থিত কর্মকর্তাসহ সবাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সঙ্গে নিয়ে কর্মকর্তা ছবি তোলেন। সবশেষ স্প্যান বসানোর কাজ দেখতে অনেক মানুষ নৌকা, ট্রলার, স্পীডবোট ভাড়া করে কাছাকাছি ভিড় জমায়। আরও কাছে আসতে চাইলে তাদের দূরত্ব বজায় রাখতে সরিয়ে দেয়া হয়। সবশেষ স্প্যান বসানোর দৃশ্য দেখতে দেখতে দর্শনার্থীরা উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে। ঘটনাস্থলে সেতু নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। সেই সঙ্গে দেশী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কর্মীসহ আশপাশের সাধারণ মানুষও ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পদ্মা সেতু খবরে একেবারে সয়লাব ছিল। কেউ ছবি কেউবা সর্বশেষ স্প্যান বসানোর ভিডিও আপলোড করেন। অনেকেই সরাসরি লাইভ করেছেন ফেসবুকে।

সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর মাধ্যমে আলোচিত পদ্মা সেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বড় কাজের সমাপ্তি হলো। এর পর সড়ক ও রেলের স্ল্যাব বসানো সম্পন্ন হলে সেতু দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯ জেলার সঙ্গে সারাদেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী অর্থাৎ আগামী বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে সেতুর কাজ। তবে বৃহস্পতিবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।

তবে যখনই কাজ শেষ হোক; এখন পদ্মা সেতু নির্মাণে আর কোন জটিলতা নেই। প্রমত্তা এই মহানদীর বুকচিরে চার লেনের সড়কে ছুটবে একের পর এক যানবাহন। মাঝখানে থাকবে ডিভাইডার। সড়কপথের ৪০ফুট নিচ দিয়ে ১৬০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে যাবে ট্রেন। ১১০কিলোমিটার গতিতে চলবে পণ্যবাহী ট্রেন।

সেতুর বাস্তব অগ্রগতি ৯১ভাগ ॥ গত ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৯১ ভাগ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৮ দশমিক ৩৮ ভাগ। পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যানটি খুঁটির ওপর বসেছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। বাকি ৪০টি স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস লাগল। প্রসঙ্গত ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। সে হিসেবে ৩ বছর ২ মাস ১০ দিনে বসানো হচ্ছে সেতুর সব স্প্যান। বন্যা, নদী ভাঙ্গন, চ্যানেলে নাব্য সঙ্কট, করোনাভাইরাস মহামারীসহ নানা জটিলতা কাটিয়ে একে একে ৪০ টি স্প্যান বসানো হয়। গত ৪ ডিসেম্বর ৪০তম স্প্যান বসানো শেষ হয়। বৃহস্পতিবার শেষ স্প্যানটি নদীর এপার-ওপারকে হাত ধরে যেন মিলিয়ে দিল।

প্রকল্পের নদীশাসন কাজের ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এলাকার কাজের শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্প ব্যবস্থাপক দেয়ান আবদুল কাদের বলেন, সার্বিকভাবে সেতুতে যান চলাচল শুরু করতে পারবে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে।

কবে পুরোদমে চালু হবে ॥ এখন সবার প্রশ্ন একটিইÑ কবে চালু হবে পদ্মা সেতু। কবে চলবে যানবাহন। এ যেন অনন্তকালের প্রতীক্ষা। আগ্রহ। স্থানীয় মানুষের কাছে তো বটেই সারাদেশের মানুষের এখন আগ্রহের শেষ নেই এ তথ্য জানতে। তেমনি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিও আছে এ ইস্যুতে। তবে বহুমুখী এই পদ্মা সেতু কবে চালু হবে এ নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। সেতু বিভাগের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বলছেন, স্বাধীনতার সূবর্ণজয়ন্তী অর্থাৎ আগামী বছরের ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও এই সময়সীমার মধ্যে সেতু চালু হওয়ার কথা বলেছেন অনেকবার।

দক্ষিণ জনপদের মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু ২০২২ সালের জুন মাসের মধ্যে যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে নিজের বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, পদ্মা সেতু এখন বাস্তব। অন্য আরেকটি সূত্র বলছে, আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সেতুর যানবাহন চলাচলের জন্য রাস্তার কাজ শেষ হলে তা উদ্বোধন করা হতে পারে। বাকি থাকবে রেললাইন নির্মাণসহ প্রস্তুতির কাজ।

আর যা বাকি ॥ ৪১তম স্প্যান বসার মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান পদ্মা সেতু। তবে আরও কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। যা সম্পন্ন হতে লাগবে প্রায় আরও এক বছর। এমনটাই জানিয়েছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মোঃ আব্দুল কাদের।

তিনি জানান, ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর ২ হাজার ৯১৭ টি রোডওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে ১ হাজার ২৮৫ টি এবং ২ হাজার ৯৫৯ টি রেলওয়ে স্ল্যাবের মধ্যে হাজার ৯৩০ টি স্থাপন করা হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরা ভায়াডাক্টে ৪৮৪টি সুপার-টি গার্ডারের মধ্যে ৩১০ টি স্থাপন করা হয়েছে। বাকি রোডওয়ে স্ল্যাব, রেলওয়ে স্ল্যাব ও সুপার-টি গার্ডার বসাতে প্রায় আটমাস সময় লাগবে। এর পরে স্ল্যাবের ওপর হবে পিচ ঢালাইয়ের কাজ। এছাড়া, ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কাজও বাকি।

কাদের আরও জানান, ভাঙ্গনের কারণে পদ্মা সেতুর ১২৬ টি রোডওয়ে স্ল্যাব ও ১৯২ টি রেলওয়ে স্ল্যাব নদীতে তলিয়ে যায়। সেগুলো নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। রেলওয়ে গার্ডার লুক্সেমবার্গ থেকে আনা হবে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ সেগুলো কনস্ট্রাকশন সাইটে চলে আসার কথা। এসব কাজ ছাড়াও বিদ্যুত, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ লাইন স্থাপনের কাজ বাকি আছে। সব মিলিয়ে বছরখানেক পর যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হতে পারে পদ্মা সেতু। রেল সড়কের জন্য আলাদা স্ল্যাব বসানো হচ্ছে। পদ্মা সেতুতে থাকছে গ্যাসলাইন, বিদ্যুত সংযোগ ও ফাইবার অপটিক্যাল। বাগেরহাটের রামপাল ও পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুতকেন্দ্র থেকে আসা বিদ্যুত জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে।

সেতুর স্টীলের স্প্যানের ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। এই পথ তৈরির জন্য কংক্রিটের স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে। সম্পন্ন হয়ে গেলে পিচঢালাই করা হবে। পুরো কাজ শেষ হলে যানবাহন চলাচলের পথটি হবে ২২ মিটার চওড়া, চার লেনের। মাঝখানে থাকবে বিভাজক। স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুতে একটি রেললাইনই থাকবে। তবে এর ওপর দিয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেন চলাচলেরই ব্যবস্থা থাকবে। ভায়াডাক্টে এসে যানবাহন ও ট্রেনের পথ আলাদা হয়ে মাটিতে মিশেছে।

যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে ॥ পদ্মা সেতু হওয়ায় শুধু দক্ষিণাঞ্চলের ২১ সহ মোটমাট ২৯ জেলার মানুষ উপকৃত হবে না জাতীয়ভাবে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। গোটা দেশের যোগাযোগ খাতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। রেল ও সড়কপথ মিলিয়ে দ্বিতল এই সেতুটি দক্ষিণাঞ্চলের সকল জেলা-উপজেলার সঙ্গে সড়ক ও রেল যোগাযোগকে আরও সমৃদ্ধ করবে। যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে। শুধু তাই নয় আরেকটু বড় পরিসরে যদি বলা হয় তাহলে পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের অন্যতম অনুষঙ্গ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ বেশি উপকৃত হলেও বিশে^র সঙ্গে বাংলাদেশের সড়ক ও রেল যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করবে, বলছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণ বলছে, দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এ দ্বারা উপকৃত হবে। এডিবি বলছে, বছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়বে এক দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে দুই ভাগ পর্যন্ত।

দুই পাড়ে গড়ে ওঠবে উন্নত শহর ॥ পদ্মা সেতুর সঙ্গে দুই পাড়ের মানুষের জীবনযাত্রাও একেবারে বদলে যাবে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে বৃহৎ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সেতুর দুই পাশে সিঙ্গাপুর ও চীনের সাংহাই শহরের আদলে পরিকল্পিতভাবে নতুন শহর গড়ে তোলা হবে। এর সঙ্গে আবাসিক সুবিধার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি হবে শিল্প কারখানা। যার মাধ্যমে প্রায় কোটি মানুষের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। বিনিয়োগের ১৯ভাগ রিটার্ন আসবে প্রতি বছর।

দেশে দীর্ঘ বিশে^ ১১ তম ॥ বিশ্বের দীর্ঘতম সেতুর তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে চীনের ডেনইয়াং কুনশান গ্র্যান্ড ব্রিজ। চীনের জিয়াংসু প্রদেশের সাংহাই ও নানজিং এলাকায় দীর্ঘতম সেতুটি অবস্থিত। চীনের ইয়াংজী নদীর ওপর ব্রিজটি স্থাপিত। সেতুর সঙ্গে রয়েছে রেললাইনও। সেতুটির দৈর্ঘ্য ১৬৪ দশমিক আট কিলোমিটার। ২০১০ সালে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। সেতুটিতে খরচ হয় ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর বৃহত্তম সড়ক সেতুগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে বাস্তবায়নাধীন পদ্মা সেতুর অবস্থান ১১তম। তবে নদীর ওপর নির্মিত সব সেতুর মধ্যে দৈর্ঘ্যরে দিক থেকে পদ্মা সেতুর অবস্থান প্রথম। সেতুর ফাউন্ডেশনের গভীরতার দিক থেকেও এর অবস্থান প্রথম। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, বিশে^র শক্তিশালী সেতুগুলো সাধারণত ‘সি’ আকৃতির হয়। কিন্তু নদীর অবস্থানের কারণে ওপর থেকে দেখলে পদ্মার নির্মাণ হয়েছে ‘এস’ আকৃতির। পদ্মার লাইফ টাইম ধরা হয়েছে শত বছর। এই সময়ে বড় কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা না দিলে সেতুর বড় রকমের কোন মেরামতের প্রয়োজন হবে না। নতুন করে রং করা, প্রয়োজনে নাট-বল্ট টাইট দেয়া, ঝালাই কাজ প্রয়োজন হতে পারে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের ইতিহাসে যোগাযোগ খাতের সবচেয়ে বড় এই প্রকল্পটি রেলের লাইন থেকে সড়ক পথের উচ্চতা ৪০ফুট। অর্থাৎ ওপর দিয়ে সড়কপথ আর নিচের অংশে রেলপথ নির্মাণ হয়েছে। কংক্রিট আর স্টীল দিয়ে নির্মিত এই সেতু যা বিশে^ প্রথম বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

থাকবে চার লেনের সড়ক ॥ পদ্মা সেতুর ওপর নির্মিত সড়ক হবে চার লেনের। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই বড় পরিসরে সড়ক করা হয়েছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত হবার পর সেতুতে যানবাহন চলাচলে চাপ বাড়বে। মূলত এই বিবেচনা থেকেই সেতুর পরিধি বড় করা হয়েছে। চার লেনের সড়কের মাঝখানে থাকবে রোড ডিভাইডার। ফলে যানবাহন আলাদা আলাদা লেনে চলবে। এতে দুর্ঘটনারও কোন সম্ভাবনা থাকবে না।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বিশে^র আমাজান নদীর পর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় নদী পদ্মা। প্রমত্তা এই নদীতে ৪১তলা গভীর পর্যন্ত পাইল করে পিলার বসানো হয়েছে। সেতুর মোট প্রস্থ ৭২ফুট। ভায়াডাক্ট নির্মাণ হয়েছে তিন দশমিক ১৮কিলোমিটার। মাওয়া-জাজিরা প্রান্ত মিলিয়ে সংযোগসড়ক নির্মাণ হয়েছে ১৪ কিলোমিটার। দুই পাড়ে নদী শাসন হয়েছে ১২কিলোমিটার। কাজ করেছে চার হাজার মানুষ। মোট ৪২পিলারের মধ্যে প্রতি পিলারের জন্য পাইলিং হয়েছে ছয়টি। মাটি জটিলতার কারণে ২২টি পিলারের পাইলিং হয়েছে ৭টি করে। মোট পাইলিং হয়েছে ২৮৬টি। পানির স্তর থেকে সেতুর উচ্চতা ৬০ফুট। সেতুর ভায়াডাক্ট পিলার ৮১টি।

যারা কাজে যুক্ত ॥ মূল পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে। সেতুর নক্সা করেছে আমেরিকান মাল্টিন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম এইচসিওএম নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মূল সেতুর নির্মাণকাজ করছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (সিএমবিইসি)। নদীশাসনের কাজ করছে চীনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো কর্পোরেশন। সেতু ও নদীশাসনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে। মাওয়া ও জাজিরায় পদ্মার উভয় তীরে সংযোগ সড়কের নির্মাণকাজ যৌথভাবে করছে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান আবদুল মোনেম লিমিটেড ও মালয়েশিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচসিওএম। সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এলাকার পরামর্শক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কার্স অর্গানাইজেশন।

সেতুর মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তে যানবাহন সেতুতে ওঠার জন্য এবং সেতু থেকে নামার জন্য দুইদিকে ভাগ করা হয়েছে সংযোগ সড়ক। এটি মূলত ভায়াডাক্ট বা ডাঙ্গায় সেতুর অংশ। দুই প্রান্ত মিলিয়ে সেতুর এই অংশের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ১৫ কিলোমিটার। মাঝখান দিয়ে চলে যাবে ট্রেনলাইন। জাজিরা প্রান্তে থাকছে টোল প্লাজা।

নানা বাধা-বিপত্তি ॥ বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয় ২০০৭ সালে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই বছরের ২৮ আগস্ট ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকার এসে রেলপথ সংযুক্ত করে ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি প্রথম দফায় সেতুর ব্যয় সংশোধন করে। কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ধরা হয়েছিল ২০১৩ সাল। প্রকল্পের অর্থ ঋণ হিসেবে জোগান দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পাঁচটি সংস্থা।

সংস্থাগুলো হলো এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বিশ্বব্যাংক, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক ও আবুধাবি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংক ১২০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর জাইকার দেয়ার কথা ছিল ৪১ দশমিক ৫ কোটি ডলার। কিন্তু বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ২০১২ সালের ২৯ জুন অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেয়। বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ ছিল, কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনকে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করার জন্য পদ্মা সেতু সংশ্লিষ্ট কিছু লোক তাদের কাছ থেকে ঘুষ নিতে চেয়েছিল। এ নিয়ে কানাডার আদালতে একটি মামলাও করা হয়। কাল্পনিক দুর্নীতির অভিযোগে ওই সময়ের সেতুসচিব মোশাররফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়, মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয় যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে। কানাডায় গ্রেফতার করা হয় এসএনসি-লাভালিনের কর্মকর্তা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক কানাডিয়ান নাগরিককে। পরবর্তী সময়ে কানাডার আদালত দুর্নীতির অভিযোগ অসত্য বলে রায় দেয়।

বিশ্বব্যাংক প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহারের পর ২০১২ সালের ১০ জুলাই জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে বক্তব্য দেয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে তাঁর সরকার আর কোন দেশ বা সংস্থার কাছে স্বেচ্ছায় সহায়তা চাইবে না। কেউ স্বেচ্ছায় দিতে চাইলে ভাল। এর পরই দেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ এগোতে থাকে। ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরীয়তপুরের জাজিরা প্রান্তে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের মূল সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন।

শুরুর বাধা পেরিয়ে কাজ শুরুর পর কাদামাটির কারণে পাইলিংয়ে সমস্যা দেখা দেয়। পরে সেতুর ২২টি পিয়ারে একটি করে পাইলের সংখ্যা বাড়ানো হয়। এসব খুঁটিতে ছয়টি পাইল অন্যান্য পিয়ারের মতোই কিছুটা বাঁকা করে বসানো হয়। এই ছয়টি পাইলের মধ্যে ৭ নম্বর পাইল সরাসরি সোজাভাবে বসানো হয়। ওই সময় পদ্মা সেতু প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রধান অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেছিলেন, মূল বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল সেতুর পাইল ড্রাইভিং। এটি সম্পন্ন হয়েছে।

বাড়তে পারে ব্যয় ॥ কয়েকবার পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাব্য তারিখ ও ব্যয়ের ঘোষণা দেয়া হলেও নির্ধারিত সময় ও ব্যয়ে কাজ সম্পন্ন হয়নি। সেতুর ঠিকাদার নিয়োগের পর বলা হয়েছিল, ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শেষ হবে। ২০১১ সালে নির্ধারণ করা ব্যয় সংশোধন করে পরবর্তী সময়ে ধরা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা। ২০১৮ সালে এসে ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা। গত ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পে মোট খরচ হয়েছে ২৪ হাজার ১১৫ দশমিক ০২ কোটি টাকা।

প্রকল্পের ব্যয় বাড়ার আভাস দিলেন পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের ব্যবস্থাপক দেওয়ান আবদুল কাদের। তিনি বলেন, পদ্মা একটি জটিল প্রকৃতির নদী, নির্মাণকাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রাকৃতিক বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে, যে কারণে ব্যয় ও সময় বেড়েছে। তিনি বলেন, পদ্মা বহুমুখী সেতুর প্রথম চুক্তির সময়ে ভ্যাট ও ট্যাক্স ধরা হয়েছিল ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। এখন সরকার ভ্যাট ও ট্যাক্স ধার্য করেছে ১৫ শতাংশ। যখন চুক্তি হয়, সে সময়ে এক ডলারের মূল্যমান ছিল ৭৮ দশমিক ৩ টাকা। এখন ডলারের মূল্যমান বেড়ে হয়েছে ৮৪ দশমিক ৯৫ টাকা। প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে এই অতিরিক্ত অর্থ বেশি যাচ্ছে। বাড়তি পাইলিংয়ের কারণেও ব্যয় বেড়েছে।

নির্মাণ শেষে পদ্মা সেতু জিডিপিতে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ অবদান রাখবে বলে আশা করছেন সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন, শেষ স্প্যানটি বসলে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারই দৃশ্যমান হবে। বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতা প্রমাণ হবে।

সর্বশেষ স্প্যান বসানো শেষে এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাহসী সিদ্ধান্তের ফসল এ সেতু। বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ পদক্ষেপের ফলে দেশীয় অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এটি আমাদের সক্ষমতার প্রতীক।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম কবে নাগাদ সেতুর কাজ শেষ হবে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ২০২১ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে আমাদের দেশী ও বিদেশী কর্মী, কনসালট্যান্ট ও প্রকৌশলীদের সঠিকভাবে কাজে নামানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে এখনই কাজ শেষ হওয়ার টাইমফ্রেম বলা যাচ্ছে না।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিস্তারিত সমীক্ষা পরিচালনার জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য সেতু বিভাগ থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অর্থায়নের জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপান দূতাবাসে চিঠি দেয়া হয়। জাপান সরকার ইআরডির প্রস্তাবে সম্মত হয়ে ২০০১ সালের ৪ ডিসেম্বর চুক্তি স্বাক্ষর করে। সমীক্ষায় ব্যয় ধরা হয় প্রায় ৫৩ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০৩-০৫ সালে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া পয়েন্টে এবং শরীয়তপুর জেলার জাজিরা পয়েন্টে সেতুর স্থান নির্বাচন করে। ২০০৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে প্রকল্পটি কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিকে থেকে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। পদ্মা সেতুর নির্মাণের পাশাপাশি আলাদা লাইনে বিদ্যুত, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ স্থাপন করা হবে। বর্তমান সরকার সেতুর কাজ শুরু করার পর শুরু হয় নানামুখী ষড়যন্ত্র। বিশ^ব্যাংক সেতুর অর্থায়নের আগে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন তথা সরকারের বিরুদ্ধে। এর নেপথ্যে ড. ইউনূসের নামও উঠে আসে। এ নিয়ে রাজনীতির মাঠে বেশ তোলপাড় হয়।

কত হবে টোল ॥ টোল দিয়ে চলতে হবে স্বপ্নের পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে। প্রকল্পের পরিচালক মোঃ শফিকুল ইসলাম জানান, সাধারণত যেসব নদীতে ফেরি চলাচল করে, সেখানে একটি স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস রয়েছে যে, ফেরি পারাপারের সময় যানবাহনগুলোকে যে পরিমাণ টোল দিতে হয়, সেতু পারাপারের ক্ষেত্রেও সেটাই টোল নির্ধারণ করা হয়।

সাধারণত বিদেশী অর্থায়নে কোন সেতু নির্মিত হলে কত টাকা টোল হবে, সেটা নির্ধারণে দাতাদের পরামর্শ বা শর্ত থাকে। কিন্তু দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত সেতুর টোল কত হবে, সেরকম কোন নিয়মনীতি নেই। আপাতত সরকারের সেতু বিভাগ পদ্মা সেতুর জন্য যে টোল হারের প্রস্তাব করেছে, সেটি ফেরি টোলের চেয়ে দেড়গুণের বেশি।

সেতু চালু হওয়ার পর পরবর্তী ১৫ বছরের জন্য মোটরসাইকেলের জন্য ১০৫ টাকা, কার জীপের জন্য ৭৫০ টাকা, ছোট বাসের জন্য ২ হাজার ২৫ টাকা, বড় বাসের জন্য ২ হাজার ৩৭০ টাকা, পাঁচ টনের ট্রাকের জন্য ১ হাজার ৬২০ টাকা, আট টনের বড় ট্রাকের জন্য ২ হাজার ৭৭৫ টাকা, মাইক্রোবাসের জন্য ১ হাজার ২৯০ টাকা টোল প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রতি ১৫ বছর টোলের হার ১০ শতাংশ বাড়ানো হবে। তবে এখনও এই প্রস্তাবের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত টোল কত হবে, সেটা নির্ভর করে সরকারী সিদ্ধান্তের ওপর।

বাংলাদেশের অর্থ বিভাগের সঙ্গে সেতু বিভাগের চুক্তি অনুযায়ী, সেতু নির্মাণে ২৯ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে সরকার। ১ শতাংশ সুদ হারে ৩৫ বছরের মধ্যে সেটি পরিশোধ করবে সেতু কর্তৃপক্ষ। সেই পরিশোধ বিবেচনায় নিয়েই টোলের এই হার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নয় মাত্রার ভূমিকম্পেও ক্ষতি হবে না ॥ সেতুতে ‘ফ্রিকশন পেন্ডুলাম বিয়ারিংয়ের’ সক্ষমতা হচ্ছে ১০ হাজার টন। এখন পর্যন্ত কোন সেতুতে এমন সক্ষমতার বিয়ারিং লাগানো হয়নি। রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে টিকে থাকার মতো করে পদ্মা সেতু নির্মাণ হচ্ছে। সেতুর নদীতে থাকা ৪০টি পিলারের নিচের পাইল ইস্পাতের। আর ডাঙ্গার দুটি পিলারের পাইল কংক্রিটের। নদীতে যেসব পাইল বসানো হয়েছে, সেগুলো তিন মিটার ব্যাসার্ধের ইস্পাতের বড় বড় পাইপ, যার ভেতরটা ফাঁপা। ২২টি পিলারের নিচে ইস্পাতের এমন ৬টি করে পাইল বসানো হয়েছে। বাকি ২২টিতে বসানো হয়েছে ৭টি করে পাইল। আর ডাঙ্গার দুটি পিলারের নিচের পাইল আছে ৩২টি, যা গর্তের মধ্যে রড-কংক্রিটের ঢালাইয়ের মাধ্যমে হয়েছে।

নদীর পানি থেকে প্রায় ১৮ মিটার উঁচু পদ্মা সেতুর তলা। পানির উচ্চতা যতই বাড়ুক না কেন, এর নিচ দিয়ে পাঁচতলার সমান উচ্চতার যে কোন নৌযান সহজেই চলাচল করতে পারবে। সেতুটির মূল কাঠামোর উচ্চতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রায় সমান। এর মূল কারণ, সেতুর ভেতর দিয়ে রেললাইন আছে। সড়ক ও রেললাইন একসঙ্গে থাকলে সেতু সাধারণত সমান হয়। না হলে ট্রেন চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পদ্মা নদীর পানির প্রবাহ পরিবর্তন হয়। কখনও মাওয়া প্রান্তে, কখনও জাজিরা প্রান্তে সরে যায়। আবার মাঝখান দিয়েও স্রোত প্রবাহিত হয়। এ জন্য নৌযান চলাচলের পথ সব স্থানেই সমান উচ্চতায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT