ঢাকা, মঙ্গলবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বাড়ছে দূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি ॥ করোনার সুরক্ষা সামগ্রীই গলার কাঁটা

প্রকাশিত : 11:15 AM, 10 October 2020 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে মানুষের ব্যবহৃত মাস্ক ঝুলছে রাজধানীর বিভিন্ন গাছে, পড়ে থাকছে শহরের অলি-গলিতে, ড্রেনে। শুধু মাস্কই নয় হাতের গ্লাভসও যেখানে সেখানে ফেলে দেয়া হচ্ছে। একজনের ব্যবহৃত মাস্ক-গ্লাভস পা দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছেন অন্য কেউ। করোনার সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর রাস্তাঘাটেই ফেলে দেয়ার ফলে বাড়ছে দূষণ, বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও। স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রীগুলো সময়ের ব্যবধানে গলার কাঁটা হয়েছে। সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণেই এমনটি ঘটছে বেশি। এছাড়াও কিছু হাসপাতাল ক্লিনিকের বর্জ্যও যুক্ত হচ্ছে দূষণে। চিকিৎসকরা বলছেন, করোনার কঠিন সময়ে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হতে পারে এমন উদাসীনতা। জনসাধারণের উদাসীনতা আর হাসপাতালগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে কঠোর হচ্ছে সরকারও। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি নিয়মের মধ্যে আনতে চান সরকার সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা নিয়ে কথা বলেছেন সরকার প্রধান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। এছাড়াও ইতোমধ্যেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সভাপতিত্বে ঢাকার দুই মেয়র ও উর্ধতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি নিয়মের মধ্যে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন উপস্থিত সবাই।

করোনা শুরুর পর থেকে বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বেই মাস্কের ব্যবহার ব্যাপকহারে বেড়ে গেছে। অনেকেই করোনার এসব সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর রাস্তাঘাটেই ফেলে দেয়ার কারণে এগুলো বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে চলে যাচ্ছে ড্রেনে, ড্রেন থেকে নদী ও সাগরের তলদেশে গিয়ে নষ্ট করছে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।

রাজধানীর দুই সিটিতে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার ২৫০ টন বর্জ্য তৈরি হয়। করোনাকালে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ পরিত্যক্ত সুরক্ষা সামগ্রী। করোনা প্রাদুর্ভাবের বর্তমান পর্যায়ে এসে সুরক্ষা সামগ্রীই যেন গলার কাঁটা হচ্ছে নগর জীবনে। ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠান উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত মাস্ক, গ্লাভস, পিপিই যত্রতত্র ফেলায় দূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। রাজধানীর বিভিন্ন সড়কের পাশাপাশি বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিক প্রাঙ্গণে এমনকি বন্ধ থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সামনে হরহামেশাই দেখা মিলছে ব্যবহৃত সুরক্ষা সামগ্রীর। বর্জ্য হিসেবে ফেলা হয় যেখানে সেখানে। ঢাকা শিশু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালসহ অসংখ্য প্রাইভেট ক্লিনিকে যত্রতত্র এসব বর্জ্য দেখা গেছে। বিভিন্ন সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব বর্জ্য পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা সকালে ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করলেও আবার সারাদিনে মানুষ এখানে সেখানে ফেলছেন। পরিষ্কার কার্যক্রম থেকে শুরু করে চলার পথে যে কেউ থাকছেন ঝুঁকির মধ্যে। কেননা, লেগে থাকা জীবাণু থেকে আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ। নাগরিক অসচেতনতাকে দায়ী করছেন অনেকে। এই অসচেতনতার কারণে বাসাবাড়ির ময়লা আবর্জনাতেও করোনা রোগীর পরিত্যক্ত সামগ্রী মিশে থাকা অসম্ভব কিছু নয়। আর এসব বর্জ্য কোন প্রকার সুরক্ষা সামগ্রী ছাড়া খালি হাতে পরিষ্কার করায় ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছেন পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। একাধিক পরিচ্ছন্নতা কর্মী জনকণ্ঠকে জানিয়েছেন, তারা বাসার ময়লা নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে রাখেন। সেখান থেকে ট্রাকে চলে যায় ময়লার ভাগাড়ে। কেউ কেউ বলেছেন, এসব পোড়ানোর কথা থাকলেও তা হচ্ছে না।

ব্র্যাকের এক গবেষণার তথ্যে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত চিকিৎসা বর্জ্যরে মাত্র ৬ দশমিক ৬ ভাগের সঠিক ব্যবস্থাপনা হয় বাকি করোনা চিকিৎসা বর্জ্যরে ৯৩ ভাগই ব্যবস্থাপনাহীন। ব্র্যাক জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচী পরিচালিত কোভিড-১৯ মহামারীকালে কার্যকর মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক গবেষণাটি গত ২০ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত হয় যা গত ৫ অক্টোবর এক ওয়েবিনারের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ব্র্যাকের গবেষণায় দেখা গেছে, সারাদেশে চিকিৎসাসেবা কেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ২৪৮ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মাত্র ৩৫ টন (১৪ দশমিক ১ শতাংশ) সঠিক নিয়মে ব্যবস্থাপনার আওতায়। এর অধিকাংশই আবার রাজধানী শহর ঢাকায় সীমাবদ্ধ এবং মাত্র একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপসারণ ও শোধন করা হয়। বর্জ্য আলাদা করার ব্যবস্থাপনা থাকলেও তা বিনষ্ট বা শোধন করার নিজস্ব কোন ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর নেই। ব্র্যাক জানায়, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে সরকার চলতি বছরের ৩০ মে থেকে ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। তবে ৮২ দশমিক ১ ভাগ মানুষের কাছে এটি অর্থনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ এসব সুরক্ষা সামগ্রী পুনর্ব্যবহার করেন। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, গত মে মাসে শুধু ঢাকাতেই ৩ হাজার টন মেডিক্যাল বর্জ্য উৎপাদন হয়েছে। এ থেকেই বোঝা যায়, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এদিকে, তিনটি বেসরকারী সংস্থার সমীক্ষার তথ্য বলছে, শুধু ঢাকা মহানগরে প্রতিদিন ২০৬ দশমিক ২১ টন করোনা বর্জ্য হচ্ছে। ৪৯ শতাংশের বেশি নগরবাসী অন্যান্য বর্জ্যরে সঙ্গে করোনা বর্জ্য রাখে এবং সিটি কর্পোরেশনের কর্মীদের কাছে হস্তান্তর করে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতি দ্রুত সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভাকে তাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ঢেলে সাজাতে হবে। ধরনভেদে প্রতিটি বর্জ্য তার উৎসেই আলাদা করার ব্যবস্থা নেয়া, আলাদাভাবে সংগ্রহ, পরিবহন, ডাম্পিং ও ধ্বংস করার ব্যবস্থা নিতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষাও।

সূত্রমতে, সরকারী-বেসরকারী মিলিয়ে রাজধানীতে ৫০০ হাসপাতাল আছে। এর মধ্যে শেখ হাসিনা বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ছাড়া অন্য কোথাও আধুনিক মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তির মেডিক্যাল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট সলিউশন নেই। তবে এখানে করোনা চিকিৎসা হয় না। এর আগে ঢাকাসহ দেশের কয়েকটি হাসপাতালে ইনসিনারেটর মেশিনের মাধ্যমে এসব বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলা হতো। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরে এ ধরনের বর্জ্য শোধনের ব্যবস্থাপনা নেই। ফলে হাসপাতালগুলো থেকে ময়লা নিয়ে কোথাও মাটিতে পুঁতে ফেলা হচ্ছে। কোথাও ফেলে দেয়া হচ্ছে ময়লার ভাগাড়ে। কোথাও আগুন দিয়ে পুড়িয়ে বাতাস বিষাক্ত করা হচ্ছে। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি ও সংক্রমণের শঙ্কা। করোনার বর্জ্য মানব স্বাস্থ্যের জন্য ভয়ঙ্কর ঝুঁকি বিবেচনায় সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য পরিবেশ অধিদফতর গত ১৩ জুন হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোকে পাঁচটি নির্দেশনা মানতে চিঠি দেয়। নির্দেশনায় বাস্তবায়ন হাসপাতাল ক্লিনিক পর্যায়ে তেমন নেই বললেই চলে।

বর্জ্যবাহী একটি গাড়ি অনুসরণ করে দেখা গেছে, আমিন বাজার ল্যান্ডফিলিং স্টেশনে পৌঁছে স্পর্শকাতর ময়লা আলাদা বা ধ্বংস না করে স্তূপাকারে ফেলে চলে যায়। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রধানত অনুশাসন তিনটি- বর্জ্য সংগ্রহ, বর্জ্য পৃথককরণ এবং বর্জ্য নিষ্পত্তিকরণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, হাসপাতালে ব্যবহৃত সংক্রামক বর্জ্য হাসপাতালের নিজস্ব বর্জ্যাগারে রেখে বিনষ্ট করা উচিত। হাসপাতালের বাইরে নেয়া ঝুঁকিপূর্ণ। যেহেতু মানুষের ব্যবহৃত মাস্ক-গ্লাভস প্রকৃতই বিপজ্জনক, তাই বিশেষজ্ঞ মতামত নিয়ে পুড়িয়ে ফেলার বিকল্প নেই বলে জানান।

সম্প্রতি, একনেক সভায় যে কোন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ সব ধরনের কর্মকা-ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেডিক্যাল বর্জ্যই নয়, প্রধানমন্ত্রী বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী একনেক সভায় বলেছেন, যারা যেখানেই যে কর্তৃপক্ষ বা সংস্থার দায়িত্বে আছেন তাদের অন্যতম প্রধান দিক হবে এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। হতে পারে এটা সিইটিপি অথবা মাটির নিচে পুঁতে দিলে সেই বর্জ্য আবার মাটি হয়ে যায়। কিন্তু প্লাস্টিক, কেমিক্যাল, মেটাল জাতীয় বর্জ্যরে ব্যবস্থাপনা স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে করতে হবে। এছাড়াও গত ২৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ‘বেসরকারী মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কলেজ আইন-২০২০’-এর খসড়ায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়। পরে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, আইনে বর্জ্য ব্যস্থাপনার বিধান রাখা হয়েছে। মেডিক্যাল বর্জ্যগুলো খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো নরমাল ডাম্পিংয়ে রাখলে হবে না। এখান থেকে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া বা রোগ-জীবাণু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।

বর্জ্য বিষয় নিয়ে কাজ করা সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ বর্জ্য থেকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় অন্যকে পৃথক করতে হবেই। এমনকি ডাস্টবিনে বা ডাম্পিং স্টেশনে বেশি দিন রাখাও অনিরাপদ। এসব বর্জ্য টোকাইরা কুড়িয়ে নিলে আরও ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে। এসব কাজ ঠিকভাবে হয় কিনা, তার কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) জরিপে জানা গেছে, দেশে মার্চ মাসে করোনা শনাক্তের পর শুধু এপ্রিলেই প্রায় সাড়ে ৪৫ কোটি সার্জিক্যাল ফেস মাস্ক ব্যবহার করেছেন দেশের মানুষ। মাস্কের ব্যবহারের কারণে বর্জ্য অনেক গুণ বেড়ে গেছে। যা পরিবেশকে মারাত্মকভাবে দূষণ করছে। এসডোর জরিপের তথ্য মতে, বাংলাদেশে গত এপ্রিলে এক মাসে একবার ব্যবহৃত দ্রব্য থেকে ১৪ হাজার ১৬৫ টন ক্ষতিকর প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়েছে। এই বর্জ্যরে ৩ হাজার ৭৬ টন উৎপন্ন হয়েছে শুধু ঢাকা শহরে। জরিপে বলা হয়েছে, চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য কর্মীরা নিয়মিতই একবার ব্যবহারযোগ্য মাস্ক, গ্লাভসসহ পিপিই ব্যবহার করায় হাসপাতালগুলোতেও প্লাস্টিক বর্জ্য বেড়েছে। এসডোর চীফ টেকনিক্যাল এ্যাডভাইজর অধ্যাপক আবু জাফর বলেছেন, এই মহামারীর সময়ের বর্জ্যগুলোকে আমরা সাধারণ বর্জ্য থেকে আলাদা করে রাখতে পারি কিনা? আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে যদি হালকাভাবে নেই, তাহলে মহামারী দূর করা যাবে না। পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, করোনা থেকে আত্মরক্ষার জন্য যে উপকরণগুলো অত্যাবশ্যকীয়, ভবিষ্যতে তা হয়ে উঠবে পরিবেশ দূষণের অন্যতম বিপদের কারণ। একবার ব্যবহার করা মাস্ক এবং গ্লাভসকে এ ক্ষেত্রে দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। সুতি কাপড়ের তৈরি মাস্ক দ্রুত পচনশীল হওয়ায় পরিবেশের তেমন কোন ক্ষতি হয় না। তবে পলিভিনাইলের তৈরি মাস্ক এবং নাইট্রাইল, ভিনাইল এবং প্লাস্টিক দিয়ে বানানো হ্যান্ড গ্লাভস দীর্ঘদিন পরিবেশে থেকে যায় ও এর ক্ষতি করে। একই সঙ্গে মানুষ যে ধরনের স্যানিটাইজার ব্যবহার করেছে, তার প্রায় সবই প্লাস্টিকের বিভিন্ন বোতলে বিক্রি করা হয়। স্যানিটাইজারের এসব খালি বোতলও নতুন করে পরিবেশ দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইতোমধ্যেই যেখানে সেখানে মাস্ক, গ্লাভস ও স্যানিটাইজারের বোতল দেখা যাচ্ছে। করোনার সুরক্ষা সামগ্রী হয়ে উঠছে করোনা সংক্রমণের অন্যতম নিয়ামক। বাড়ছে পরিবেশ দূষণও। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান এর আগে বলেছেন, করোনা সুরক্ষা সামগ্রী ব্যবহারের পর সঠিকভাবে ধ্বংস না করলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে। প্লাস্টিকের যে দূষণ, করোনা বর্জ্যরেও একই দূষণ। এই দূষণের পরিমাণ এখন অনেক বেশি হচ্ছে। আমরা বাইরে থেকে এসে মাস্ক কিংবা গ্লাভস খুলে অন্যান্য বর্জ্যরে সঙ্গে ফেলে দিচ্ছি। এসব সুরক্ষা সামগ্রীতে যদি কোন ধরনের জীবাণু থাকে, তাহলে যে এটা হ্যান্ডল করছে সে আক্রান্ত হতে পারে। যেখানে এই বর্জ্য ফেলা হচ্ছে সেখানেও জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। এরপর এই বর্জ্য আবার নদী-নালা, খাল-বিলে চলে যাচ্ছে। পরিবেশের ক্ষতি করছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য বিশিষ্ট ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডাঃ নজরুল ইসলাম বলেছেন, সাধারণ মানুষ মাস্ক ব্যবহারের পর যেখানে সেখানে ফেলে দিচ্ছে। তাদের ব্যাপকভাবে সচেতন করতে হবে গণমাধ্যম দিয়ে। মাস্ক ব্যবহারের পর তারা যেন এটাকে অন্তত ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে ধুয়ে তারপর অন্যান্য বর্জ্যরে সঙ্গে এটাকে ফেলে। তা না হলে ভবিষ্যতে আমাদের জন্য আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

দেশের চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় মন্ত্রীর নেতৃত্বে পর্যালোচনা সভা ॥ দেশের চিকিৎসা বর্জ্যগুলো নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর নেতৃত্বে সম্প্রতি একটি পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঢাকা দুই সিটির মেয়রসহ মন্ত্রণালয়ের বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এবং বিভিন্ন মতামত তুলে ধরেন।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ওই সভায় ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আতিকুল ইসলাম সারাদেশের হাসপাতালগুলোর চিকিৎসা বর্জ্য নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় আনার জন্য অভিযানের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অভিযানের কোন বিকল্প নেই। চিকিৎসার বর্জ্য একটা সিস্টেমে যাচ্ছে না। অথচ হাসপাতালগুলো মানুষের কাছ থেকে ডাকাতির মতো করে পয়সা নিচ্ছে। যে হাসপাতালগুলো আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে অনেক বড় লোক হচ্ছে, কিন্তু তারা তাদের নিয়ম মেনে চলছে না, তাদের একটি নিয়মের মধ্যে আনতেই হবে বলেও জানান মেয়র আতিক। মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, যার যার বর্জ্য কবে থেকে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে হবে, তা বলে দিতে হবে, এর কোন বিকল্প নেই। আমি দেখেছি সরকারী হাসপাতালে পেছনে খোলা জায়গায় তাদের বর্জ্য পোড়ানো হচ্ছে, এতে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে। সরকারী হাসপাতালই যদি করে আমি তো অন্যান্য হাসপাতালের কথা বললাম না, উনারা পোড়ান না আবার। উনারা লুকিয়ে লুকিয়ে কখন যে অজান্তে কোন খালে-বিলে ফেলে দেয়, তাও কিন্তু আমরা জানি না। অভিযান চালানোর একটি তারিখ দেয়ার জন্য মন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়ে মেয়র বলেন, আমি মনে করি অভিযানের কোন বিকল্প নেই। তাদের একটি নিয়মের মধ্যে আনতেই হবে। মেডিক্যাল বর্জ্যটা সাইলেন্ট কিলার, আমাদের কিল করে দিচ্ছে কিন্তু। বর্জ্যগুলো কোন্ জায়গায় ফেলব, কোথায় রাখব, এসব শৃঙ্খলার মধ্যে আনা দরকার। তিনি বলেন, তারা বিল নেবে কিন্তু তারা তাদের বর্জ্য কি ঠিকমতো ফেলছে? তারা তাদের বর্জ্য ঠিকমতো ফেলছে না, এটি মনিটরিং করা হচ্ছে না। আতিকুল ইসলাম বলেন, বর্জ্য থেকে বিদ্যুত উৎপাদনের জন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একটি প্রকল্প প্রায় শেষ পর্যায়ে আছে। এই প্রকল্প নিয়ে আমরা অনেক দূর পর্যন্ত এগিয়ে গেছি, প্রধানমন্ত্রী সামারি অনুমোদন দিয়েছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেছেন, বেসরকারী কোন হাসপাতাল, ক্লিনিককে আমাদের (সিটি কর্পোরেশন) নিবন্ধন ছাড়া চলতে দেয়া হবে না। এখন পর্যন্ত কোন বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক আমাদের নিবন্ধন নেয়নি। আমরা তাদের চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ প্রত্যেকটি বিষয় উল্লেখ করে নিবন্ধনের আওতায় এনে তা বাস্তবায়নে বাধ্য করব। মেয়র বলেন, আমরা ইতোমধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজিয়েছি। দিনের বেলা উন্মুক্ত স্থানে কোথাও বর্জ্য রাখার সুযোগ রাখিনি। সন্ধ্যার পর থেকে আমরা বর্জ্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম আরম্ভ করেছি। ঢাকাবাসী ইতোমধ্যে সুফল পাওয়া আরম্ভ করেছে। এই করোনা মহামারীর মধ্যে মাস্ক, হাতমোজা এটা চিকিৎসা সামগ্রী হলেও এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা এখন সাধারণ বর্জ্যে পরিণত হয়েছে। তাপস আরও বলেন, সরকার-বেসরকারী হাসপাতালের মূল অনুমোদন দিয়ে থাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনে সেটা দেয়া হয়ে থাকে। ‘মেডিক্যাল প্র্যাকটিস এ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিক, ল্যাবরেটরি অর্ডিন্যান্স-১৯৮২’-এ আছে আবেদনের সঙ্গে আবশ্যিক ডকুমেন্টের তালিকায় হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিভিন্ন তথ্যের কথা বলা হয়েছে। আমি অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছি, এখানে অবকাঠামো বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। জনবলের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, কিন্তু সেই হাসপাতাল-ক্লিনিকের বর্জ্যগুলো কিভাবে ব্যবস্থাপনা করবে, তাদের অবকাঠামো কী থাকবে, কী নিশ্চিত করতে হবে- এ বিষয়ে এখানে কিছু বলা হয়নি। দক্ষিণ সিটির মেয়র বলেন, সিটি কর্পোরেশনের জন্য যে আইনটি আছে আমরা বাস্তবায়ন করতে চাই। আমরা এরইমধ্যে একটা বিধিমালা-প্রবিধান করব। সুনির্দিষ্টভাবে চিকিৎসা বর্জ্য কিভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে কী কী অবকাঠামো তাতে থাকতে হবে- ১০, ১০০ কিংবা ৫০০ শয্যা হোক কী কী তাদের মানতে হবে এই বিষয়গুলো তুলে ধরে আমরা তাদের নিবন্ধনের আওতায় আনতে চাই। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০০৮ সালে চিকিৎসা বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি বিধিমালা হয়েছে জানিয়ে ফজলে নূর তাপস বলেন, আজ পর্যন্ত সে বিধিমালার বাস্তব কোন পরিপালন আমরা লক্ষ্য করিনি। আমাদের আইন, বিধিমালা, প্রবিধান কম নেই, সবই আছে। অন্যান্য উন্নত দেশে যা আছে আমাদেরও তাই আছে। কিন্তু সেখানে একটি বড় ফারাক আমরা লক্ষ্য করি তা হলো সেটা পরিপালন। মেডিক্যাল বর্জ্য ধ্বংসের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকলে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হবে বলে সতর্ক করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম। মন্ত্রী বলেন, মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণের দায়িত্ব হাসপাতালের পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশনের ওপর বর্তায়। সিটি কর্পোরেশন এটা তদারকি করবে। হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলো নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য ধ্বংস করবে। অন্যথায় এসব বর্জ্য যেখানে সেখানে ফেলানোর ফলে মানুষ অজানা রোগে আক্রান্ত হবে। সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, স্বাস্থ্য ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন দফতরের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মানুষ প্রত্যাশা করে পরিকল্পিত সুন্দর নগরী আবার সেই নগরী দূষণমুক্ত রাখতে নাগরিকদেরও দায় আছে। সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিককে স্ব স্ব অবস্থান থেকে দায়িত্ববোধের পরিচয় দেয়ার আহ্বান জানান সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT