সোমবার ২৯ নভেম্বর ২০২১, ১৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বার বার গ্যাস লিকেজে কেন বিস্ফোরণ?

প্রকাশিত : 10:10 AM, 7 September 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

বছরখানেক আগে রাজধানীর বংশাল কসাইটুলির একটি দোতলা বাড়ির নিচতলায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে দেয়াল ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়। অগ্নিদগ্ধ হন শিশুটির পরিবারের অন্য সদস্যরাও। আহতদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা দেয়া হয়। গত বছরের ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা ১৫ মিনিটের দিকে দুর্ঘটনাটি ঘটে। ওই দুর্ঘটনা কেন ঘটেছিল, কারা দায়ী, কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা জানাতে পারেনি কোন মহলই। আর তিতাস? ওই ঘটনা মনেই করতে পারেনি। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে থাকলেও তিতাসের কাছে নেই সুনির্দিষ্ট কোন তথ্য বা সর্বশেষ পরিস্থিতি। শুধু রাজধানীর বংশাল নয়, কিংবা একটি শিশু নয়। এ চিত্র সারাদেশের। গ্যাস লিকেজে প্রতিটি দুর্ঘটনাই ধামাচাপা দেয়া হচ্ছে। একটি তদন্তের রিপোর্টও আলোর মুখ দেখেনি। শাস্তি বা ব্যবস্থা বলতে প্রাথমিকভাবে কদিনের জন্য কয়েকজনকে এক জায়গা থেকে অন্যত্র বদলি। বড় জোর কদিনের জন্য সাময়িক বরখাস্ত। তারপর আবার বহাল তবিয়ত। এ হচ্ছে গত ৭ বছরে রাজধানীসহ দেশব্যাপী গ্যাস পাইপ লাইন লিকেজজনিত বিস্ফোরণের বিপরীতে নেয়া তিতাসের ব্যবস্থা। আর প্রাণহানি? অন্তত দেড়শ’ লোকের প্রাণহানি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনষ্ট হলেও সেগুলোর কোন ক্ষতিপূরণ বা উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যখনই ঘটনা ঘটেছে তখনই অকুস্থলে ছুটে গিয়ে কর্তাব্যক্তি তদন্ত, শাস্তি, সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছেন। আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ থাকছে এসব দুর্ঘটনা। সর্বশেষ গত শুক্রবার নারায়ণগঞ্জের মসজিদে ভয়াবহ গ্যাস লিকেজজনিত বিস্ফোরণ বা দুর্ঘটনায় আবারও অভিযুক্ত তিতাস গ্যাস। তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত তিতাস কোন কিছুই বলতে রাজি নয়, যেমনটি ছিল অতীতেও।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত তিন বছরে রাজধানীতে ঘটেছে এ ধরনের ২৪টি দুর্ঘটনা। প্রাণহানি ঘটেছে ২৬ জনের। যেমন গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর আসাদ গেটের আড়ং মোড়ে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে দু’টি গাড়িতে আগুন লাগে। বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের পর মোহাম্মদপুর, ধানমণ্ডি ও মিরপুরের একাংশে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। দুর্ঘটনার পর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন এ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি মেরামত কাজ করে। সেদিন ফায়ার সার্ভিস নিয়ন্ত্রণ কক্ষের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, সড়কের একটি ম্যানহোলের ওপর আট নম্বর রুটের একটি বাস থামলে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন লেগে যায়। এ সময় পেছনে থাকা একটি পিকআপ ভ্যানেও আগুন ধরে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভান। ওই ঘটনার তদতন্ত কমিটি হয়। ও পর্যন্তই। পরের খবর আর কেউ জানতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে এলাকাবাসী ওই ঘটনার জন্য তিতাসকে দায়ী করলেও কারোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার খবর তারা জানতে পারেনি। একইভাবে রাজধানীর উত্তরখানের ব্যাপারীপাড়ায় একটি বাসায় গ্যাসলাইনের লিকেজে আগুন লেগে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অগ্নিদগ্ধ হন আরও ৫ জন। তার কদিন পর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পানির লাইনে কাজ করার সময় পাশের গ্যাস লাইন বিস্ফোরিত হয়ে দগ্ধ হয়েছেন তিন শ্রমিক। দুটো ঘটনারই তদন্তের একই পরিণতি ঘটেছে। একই পরিণতি ঘটেছে রাজধানীর প্রগতি সরণির কোকা-কোলা মোড়েও একটি বাসভবনে গ্যাসের পাইপ লাইনে বিস্ফোরণ এবং পাঁচজন অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনায়। ছয় তলা ভবনের দোতলার একটি মেসে এই বিস্ফোরণ ঘটে। এতে আহত হন ৬ জন। তাদের একজন- শাহজালাল (২০) জানান, ওই বিস্ফোরণের পর দুদিন তদন্ত কমিটির লোকজন এসে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপর আর কেউ কিছু জানতে পারেননি। এ জন্য কারা দায়ী? কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে সেটা আজও অজানা।

একই বছরের ৩০ জুন গ্রীনরোড এলাকায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় চার জন দগ্ধ হন। ভবনটির চারতলায় কমফোর্ট জেনারেল হাসপাতাল। এর নিচ তলায় আরটেক্স শো-রুমে ডেকোরেশনের কাজ করছিলেন চার শ্রমিক। এসময় হঠাৎ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে চার শ্রমিক দগ্ধ হন। তারা হলেন, রাশেদ (৩৫), ফয়েজ (৩০), সুজন (১৯) ও লতিফ (২০)। ওই ঘটনায়ও তিতাস গ্যাস ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পৃথক পৃথক তদন্ত করে। তারপর কারোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কিনা সেটা জানতে দেয়া হয়নি কাউকে। ঘটনাস্থল বাড়ির মালিক এখনও জানে না দায়ীদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

তার কদিন আগে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং এলাকায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এতে কেউ হতাহত হয়নি। সেদিন শুক্রবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে উত্তরার হাউজ বিল্ডিং সড়কে হঠাৎ এ বিস্ফোরণ হয়। পাশেই মেট্রোরেলের কাজ চলছিল। ওই দুর্ঘটনায় অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে বড় ধরনের প্রাণহানি। এতে গোটা এলাকা কয়েক ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে। ঘটনার পর পরই গ্যাস কর্তৃপক্ষ সেখানে গিয়ে লাইন মেরামত করলেও কেন এমনটি ঘটেছে, কার অবহেলায় হয়েছে সেটা গ্যাস কর্তৃপক্ষ আজও প্রকাশ করেনি।

উত্তরার পাশেই একই বছর আশুলিয়ায় একটি দোতলা ভবনে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে নারী ও শিশুসহ একই পরিবারের ৩ জন দগ্ধ হয়েছেন। দেয়াল ধসে আহত হয়েছেন আরও ৬ জন। ভাদাইল এলাকায় শেখ মহব্বত আলী মাস্টারের বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে বিকট শব্দে গ্যাস লাইনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ওই ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া আলমগীর হোসেন, তার স্ত্রী রাতিয়া এবং তাদের শিশু মেয়ে রাফিয়া দগ্ধ হন। এ সময় দেয়াল ধসে আরও ৬ জন আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওই দুর্ঘটনায়ও কারোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কিংবা কেন তা ঘটেছিল সেটা জানতে পারেনি ভিকটিম পরিবার।

সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের বি¯েফারণের আগে ফতুল্লায় গত বছর আরও একটি ভয়াবহ গ্যাস লিকেজ জনিত বিস্ফোরণে একই পরিবারের ৫ জন নিহত হন। সদর উপজেলার সাহেবপাড়ার ওই বাসায় পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকতেন গার্মেন্ট এক্সেসরিজের ব্যবসায়ী কীরণ। গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে পরিবারের কেউ রান্নাঘরে গ্যাসের চুলা জ্বালাতে গেলে পুরো বাসায় আগুন ধরে যায়। তাতে পুড়ে যায় বাসার সব আসবাবপত্র। ফায়ার সার্ভিসের ধারণা, ওই ফ্ল্যাটের চুলার চাবি রাত থেকেই খোলা ছিল। তাতে সারারাতে পুরো ঘরে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে এবং সকালে ওই দুর্ঘটনা ঘটে।

দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান ও অনুস›ন্ধানে দেখা যায়, কয়েকটি দুর্ঘটনার তদন্তে প্রকৃত কারণ ও দায়ী ব্যক্তিরা চিহ্নিত হলেও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যেমন চট্টগ্রামে গত ১৭ নবেম্বর সকালে নগরীর কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটা ব্রিকফিল্ড রোডে বড়ুয়া ভবন নামে একটি পাঁচতলা বাড়ির নিচতলায় বিস্ফোরণে দেয়াল বিধ্বস্ত হয়। এতে আশপাশের আরও কয়েকটি বাসা এবং দোকানপাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিস্ফোরণে নারী ও কিশোরসহ সাতজনের মৃত্যু হয়। আহত হন কমপক্ষে ১০ জন। ওই বিস্ফোরণে সাতজনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়- কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) সরবরাহ লাইনে লিকেজ বা ফুটোর কারণে গ্যাস আবদ্ধ হয়ে এই বিস্ফোরণ ঘটেছে। আর গ্যাস আবদ্ধ হয়ে যাবার জন্য বাড়ির মালিকের নক্সাবহির্ভূতভাবে একটি বদ্ধ বারান্দা তৈরিকে দায়ী করেছে কমিটি। ওই গ্যাসের লাইনে লিকেজ ছিল। সেই লিকেজের কারণে গ্যাস বের হয়ে ঘরে আবদ্ধ হয়ে যায়। এরপর ম্যাচের কাঠি জ্বালানোর সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ হয়। মূলত গ্যাস লাইনে লিকেজের কারণেই বিস্ফোরণ হয়েছে। ওই ঘটনায় তদন্তের প্রকৃত কারণ বা রহস্য উদঘাটন হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কোন ব্যক্তিকে দায়ী না করে বরং নানা ত্রুটি ও পদ্ধতির ওপর দায় চাপানো হয়। ফলে ভিকটিম বঞ্চিত হয়েছে ক্ষতিপূরণ থেকে। যদিও এ ধরনের দুর্ঘটনায় গ্যাস কর্তৃপক্ষেরই দায় রয়েছে ভিকটিমের ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করা। কিন্তু সেটা হয়নি কোনটার ক্ষেত্রেই।

কেন ঘটছে এমনটি?

পাঁচ দশকের পুরনো ও ত্রুটিপূর্ণ লাইন, সময়মতো লাইনের তদারকি না করা, গ্রাহকের উদাসীনতা, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির পরও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বহাল তবিয়তে রাখা, গ্রাহকের সচেতনতা, অবৈধ লাইনের অসচেতন ব্যবহার, পাইপ লাইনে ময়লা জমা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবকেই দায়ী করা হচ্ছে সাম্প্রতিক গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের নেপথ্য কারণ হিসেবে। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে আশুলিয়ার ঘটনা। এ ঘটনার তদন্তে বলা হয়, ত্রুটিপূর্ণ লাইনের জন্যই সেদিন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এলাকার অধিকাংশ বাড়িতেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। সরবরাহ নেয়া গ্যাস লাইনের কোথাও ছিদ্র ছিল। ওই ছিদ্র থেকে পুরো বাড়িতে গ্যাস ছড়িয়ে পড়ে। এটা দেখার দায়িত্ব তিতাসের। তারা সেটা ঠিকমতো করেনি।

সেখানকার এক গ্যাস কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন- গ্যাস বিতরণ ও সিলিন্ডার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে চলেছে, তেমনইভাবে যারা এগুলো ব্যবহার করছেন তাদের অসচেতনতাও এ ক্ষেত্রে বহুলাংশে দায়ী। গ্যাসের পুরাতন পাইপলাইনে ক্ষয়, পুরাতন কিংবা নতুন পাইপলাইনে ময়লা-আবর্জনা জমে লিকেজ-ছিদ্র ইত্যাদি তৈরি হওয়া অমূলক নয়। গ্যাস বিতরণ লাইন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, অযত্ন-অবহেলা এবং সময়মতো কেন্দ্রীয় অফিস থেকে আঞ্চলিক অফিসগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ না করার কারণেও নাগরিকদের জন্য তা বিপদ ডেকে আনছে। সঠিকভাবে লিকেজ-ক্ষয় দূর ও পাইপ পরিবর্তন করা না হলে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ঝুঁকি যে ক্রমেই বাড়তে থাকে, সে ব্যাপারে সন্দেহ পোষণের সুযোগ নেই। জামগড়ায় গ্যাস লাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিষয়টি উঠে আসে। ফলে এ ব্যাপারে যথাযথ তদন্তের পর ব্যবস্থা নেয়া ছিল জরুরী। কিন্তু সেটা তো হয়নি। বরং যারা এ কাজে সহায়তা করেছিল তারা আজও বহাল তবিয়তে। এর দায় কিন্তু অবৈধ গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে গ্রাহক এবং সংশ্লিষ্ট গ্যাস কতৃর্পক্ষ এ দুর্ঘটনায় দায় এড়াতে পারে না। গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা এতই আকস্মিকভাবে ঘটে যে, তা থেকে সাধারণত পরিত্রাণ মেলে না। আর অগ্নিদগ্ধে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এ ক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধকেই গুরুত্ব দেয়া আবশ্যক।

তার ভাষ্যমতে- গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনগুলো যেমন নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করা অপরিহার্য তেমনইভাবে গ্যাস কোম্পানিগুলোর অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করে গ্রাহক সেবার মানোন্নয়নে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে সংশিষ্টদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। পাশাপাশি গ্রাহক ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতকর্তা ও সচেতনতার পরিচয় দিতে হবে। প্রত্যাশা থাকবে, গ্যাস বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট সবাই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু এসবই যেন কথার কথা। কাজের কিছুই নয়। যে কারণে সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের মতো গ্যাস ট্র্যাজেডি দেখতে হয়েছে। এখানেও গ্যাস কর্তৃপক্ষের দুর্নীতি, অনিয়ম, অরাজকতা, অবহেলা ও গাফিলতির বিষয়টি সামনে এসেছে।

তিতাসের গাফিলতির সর্বশেষ উদাহরণ সামনে এসেছে নারায়ণগঞ্জের ঘটনা। গত শুক্রবারের ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর থেকেই মসজিদ কমিটি থেকে বলা হচ্ছিল তিতাস গ্যাসের কাছে গ্যাস লিকেজ মেরামত করার আবেদন করার পরও সেটা করা হয়নি। মাত্র ৫০ হাজার টাকা ঘুষ না দেয়ায় গ্যাসের লিকেজ জিইয়ে রেখেছে তিতাস। পরিণতিতে ঘটেছে ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ যাতে প্রাণ হারিয়েছে ২৪ জন। বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কামুক্ত নয়। এ ঘটনা তিতাসের দুর্নীতি আর অরাজকতার ভয়াবহতা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার মতো উদাহরণ।

তিতাস গ্যাস সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই কোটি মানুষের এই মেগাসিটিতে ২৮ লাখের বেশি সংযোগ রয়েছে। যা পাইপ লাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস দিয়ে দৈনন্দিন গৃহস্থালির জ্বালানি চাহিদা মেটানো হচ্ছে। পাইপ লাইনের জটিলতায় যেমন গ্যাসের স্বল্প চাপের সমস্যা থাকে তেমনি লাইনে লিকেজের কারণে হুটহাট ঘটছে অগ্নিকাণ্ডের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনা। সবশেষ নারায়ণগঞ্জের মসজিদে বিস্ফোরণের ঘটনাও তারই বড় দৃষ্টান্ত। রাজধানীতে আবাসিক খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার শুরু হয় ১৯৬৮ সালে। আশির দশকের শুরুতে ব্যাপক হারে সংযোগ বাড়তে থাকে ঢাকা মহানগরীতে। বিপুল পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে বাড়ানো হয়নি পাইপ লাইনের সক্ষমতা। বিশেষজ্ঞদের মতে- পুরনো ও অবৈধ দু’প্রকার পাইপ লাইনই ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, তিতাসের কার্যক্রমে যথেষ্ট অবহেলা এবং অব্যবস্থাপনা রয়েছে। নতুন লাইন না লাগালে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। অন্যদিকে তিতাস বলছে, টেকসই ঝুঁকি নিরসনে বিতরণ ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে পুরনো পাইপ লাইন বদলে নতুন করে পাইপ স্থাপনে ১৪শ’ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ শুরু হবে শিগগিরই। ১৪৩টি ব্লকে ভাগ করে বসানো হবে ৪শ’ কিলোমিটার নতুন পাইপ। তিতাস গ্যাস জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আবদুল ওয়াহাব সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেন, ঘনবসতি এলাকায় সর্বনিম্ন দুই ইঞ্চি ব্যাসের পাইপ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একই বিষয়ে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, কাজটা শুরু হলে যত পুরনো লাইন আছে, সেগুলো আমরা সারাতে পারব। আমার বিভাগীয় গাফিলতি তো আছেই। পাইপ লাইন প্রতিস্থাপনের কাজের পাশাপাশি বছরজুড়েই চলবে শুদ্ধি অভিযান। প্রয়োজেনে জড়িতদের স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হবে। যারা এ রকম অবৈধ কাজে জড়িত আমরা ব্যবস্থা নিয়ে নেব। এদেরকে কোন সুযোগ দেয়া হবে না। তিতাসের ৫০ শতাংশ লোক বের করে দিতে হলে তাও বের করে দেব। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদের পাশাপাশি জ্বালানি খাতের পরিসেবায় স্বচ্ছতা আনতে জনগণের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছে বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

এ বিষয়ে তিতাসের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃত সমস্যা অনেক গভীরে। এ সমস্যা একদিনের সৃষ্টি নয়। কিংবা এককভাবে কোন ব্যক্তি বা মহলকে দায়ী করার মতো নয়। তিতাসের কয়েক যুগের অনিয়ম, দুর্নীতি, অরাজকতার পাশাপাশি ৫০ বছরের পুরনো গ্যাস পাইপ লাইনই এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। গ্যাস বিতরণ সংস্থাগুলোর অপেশাদার মনোভাব আর গাফিলতিতেই বারবার দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাচ্ছে। যদিও তিতাস বার বার বলছে, শীঘ্রই শুরু হবে পুরনো পাইপলাইন পরিবর্তনের কাজ।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT