ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৮ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বাঙালীর সাধনা সুকৃতি ব্যর্থ হতে দেব না

প্রকাশিত : 11:52 AM, 7 October 2020 Wednesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

বহুদিন পর ঘর থেকে বের হয়ে এলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। আসলে বের হয়ে আসতে তারা বাধ্য হলেন। কোভিডের আঘাতে সহকর্মী স্বজনসহ অনেককেই হারাতে হয়েছে। নিজেরাও কেউ কেউ আক্রান্ত হয়েছিলেন। এ অবস্থায়ও ব্যক্তির দায়, বিবেকের দংশন বড় হয়ে উঠল তাদের কাছে। সাম্প্রতিক ধর্ষণের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে সমবেত হলেন তারা। এখানে বিকেলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে এক ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচী পালন করা হয়। প্রতিবাদী অবস্থানে বিভিন্ন অঙ্গনের কয়েক শ’ সংস্কৃতিকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

অন্য সময় হলে বিভিন্ন অঙ্গনের বিশিষ্ট শিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের এটি মিলনমেলায় পরিণত হত। কোন না কোন সুযোগে একে অন্যকে ঠিক জড়িয়ে ধরতেন। এতদিন পর দেখা হওয়ায় উচ্ছ্বাসটুকু গোপন রাখতে পারতেন না কেউ। কিন্তু হায়! সময়টা একদমই অনুকূলে নয়। দেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। নারীর প্রতি চরম নিষ্ঠুর ও বীভৎস আচরণ দেখতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। উপস্থিত সবার মধ্যে তাই এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। বিশেষ করে পুরুষরা নারী সহকর্মীদের পাশে বসে ভেতরে ভেতরে লজ্জায় ডুবেছিলেন।

এদিন গান কবিতা নৃত্য নাটক কিছুই হলো না। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে এক ঘণ্টার প্রতিবাদী অবস্থান গ্রহণ করলেন তারা। সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত এক ঘণ্টার অবস্থান কর্মসূচী থেকে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে মনের দুঃখ ক্ষোভ ঘৃণা উজার করে দিলেন।

নাটক ও চলচ্চিত্রের মানুষ নাসির উদ্দীন ইউসুফ। তার চেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এত বড় পরিচয় নিয়েও মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রথম কথা: নিজেকে আজ খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। বললেন, আমি আমার কন্যার চোখের দিকে তাকাতে পারি না। এ অধিকার, আমার মনে হয়, আমি হারিয়েছি। এমন ধর্ষকে ভরা দেশ দেখার জন্য নিশ্চয়ই আমরা ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করিনি। এ দেশ সে দেশ নয়, যে দেশ বাঙালী চেয়েছিল। এ দেশ সে দেশ নয়, যে দেশের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন। ৩০ লক্ষ শহীদের দেশ তো এমন হতে পারে না। কোথাও আমাদের একটা বড় ভুল হয়ে গেছে। আমরা একে অন্যকে দোষারোপ করছি। ব্লেইমগেম চলছে। কিন্তু আমাদের আসলে উচিত ভুলগুলো খুঁজে বের করা।

ধর্ষকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কত কঠোর হতে হবে তা বোঝাতে বঙ্গবন্ধুরই একটি বিখ্যাত উক্তি তুলে ধরেন তিনি, যেখানে বাঙালীর নেতা বলছেন, ‘হোয়েন ইউ প্লে উইথ এ জেন্টলম্যান, ইউ প্লে লাইক এ জেন্টলম্যান। বাট হোয়েন ইউ প্লে উইথ বাস্টার্ডস, মেক শিউর ইউ প্লে লাইক এ বিগার বাস্টার্ড। আদারওয়াইজ ইউ ইউল লুজ।’

এ অবস্থার সমাধান সূত্র খুঁজতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনি ঘুরে দাঁড়ান। আপনার পক্ষে সম্ভব। আপনি ঘুরে দাঁড়ালে সব ঠিক হয়ে যাবে।

ধর্ষকদের বিচার চাইলেও, লেখক চিন্তক মফিদুল হক আরও গভীরে যাওয়ার ওপর জোর দিলেন। বললেন, আমরা আরও তলিয়ে দেখতে চাই। দোষী কি কেবল ওই কয়েকজন বিভ্রান্ত তরুণ? কয়েকজন বিপথগামী মানুষ? কয়েকজন বিকৃত মনের অধিকারী ব্যক্তি? এখন সুস্পষ্টভাবেই আমাদের তা বলতে হবে।

‘সুস্পষ্ট’ করে বলা বলতে, সরকারের বিরুদ্ধে গেলেও, সে কথা বলতে পিছ পা না হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। বলেন, আমরা অনেক সময় অনেক রকমভাবে আপস করেছি। বিভ্রান্ত হয়েছি। এভাবে চলতে পারে না। আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবকে বাঙালীর নারী শক্তির আরাধনার বিশেষ ক্ষণ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সময় সংস্কৃতির শক্তি নিয়ে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আমাদের গর্জে উঠতে হবে। তা না হলে বাঙালীর সাধনা সুকৃতি সব ব্যর্থ হয়ে যাবে। আমরা তা হতে দিতে পারি না।

এ প্রসঙ্গে সমাজের কোথাও অন্যায় হলে প্রগতিশীল সংস্কৃতিকর্মীদের অবস্থান কী হবে, তা ঠিক করতে একটি সুস্পষ্ট নীতি এবং পথ খুঁজে বের করারও পরামর্শ দেন তিনি।

মফিদুল হক বলার চেষ্টা করেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশে যে উন্নয়নকর্মকা- চলছে তা বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তারা এতদিন অনেক বিষয়ে কথা বলেননি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সরকারের ভেতর থেকেই বাধা তৈরি হচ্ছে।

এ দিনের সবচেয়ে জরুরী প্রশ্ন উত্থাপন করে তিনি বলেন, যারা ধর্ষণ করে দুর্নীতিসহ নানা অন্যায় করে তাদের এত শক্তিশালী কারা করছে? সরকারের ভেতরে যারা তাদের নিজেদের নিজেদেরই এ প্রশ্ন করার কথা বলেন তিনি।

এত অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়! কত আর প্রতিবাদ করব? কী লাভ হচ্ছে প্রতিবাদ করে? এমন প্রশ্নও এখন বেশ শোনা যায় না। এই হতাশ ক্লান্ত মনোভাবের জবাব দেন জোট সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। বলেন, আমাদের প্রতিবাদের কারণেই দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে ধর্ষকদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য শুধু সামাজিক প্রতিরোধ নয়, প্রশাসনকেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। নৈতিক দৃঢ়তা ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠার আগেই ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের হাতে এন্ড্রয়েড মোবাইল ফোন তুলে দেয়ার সমালোচনা করেন তিনি।

এর আগে জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেন। কোভিডের কালে হারানো দুই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী ও আনিসুজ্জামানের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, তারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ। নারীর অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষ। তাদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছি আমরা। ঘর থেকে বের হয়েছি যেহেতু, চলমান অন্যায়ের প্রতিকার না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাব না। এদিন আরও একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ সত্য সামনে আনেন তিনি। বলেন, দূরের চরে যেমন ধর্ষণ হচ্ছে। তেমনি হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়ও। এর থেকে বের হয়ে না আসতে পারলে আমাদের মুক্তি নেই।

ধর্ষণের এই দুঃসহকালে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন নারীরা। সেই নারীদের প্রতিনিধি হয়ে অনুষ্ঠানে কথা বলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী অরুণা বিশ্বাস ও আবৃত্তি শিল্পী রেজিনা ওয়ালী লীনা। ধর্ষকদের প্রতি ‘ছিঃ’ বলে বক্তব্য শুরু করেন অরুনা। বলেন, মনে হচ্ছে প্রতিদিন আমরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, আমরা কি বাঙালী আছি এখনও? উত্তরে নিজেই বলেন, রুচি দেখে তা আর মনে হয় না।

রেজিনা ওয়লী লীনা প্রথম থেকেই ভীষণ আবেগপ্রবণ ছিলেন। কখনও কান্না জড়ানো কণ্ঠ। কখনও রাগে ক্ষোভে ফুসছিলেন তিনি। বলছিলেন, আমাদের পুরুষ বা নারী তান্ত্রিক নয়, মানুষতান্ত্রিক হতে হবে। পুরুষকে তার দুষ্টু আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আত্মিক উন্নয়ন ঘটাতে হবে। ধর্ষকরা যে পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেছে, সে পরিবারকেও দায়ী করেন তিনি। একইভাবে দায়ী করেন তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। মৌলবাদীদের তোসন করার জন্য স্কুলের টেক্সটবুকে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে সেগুলোরও পরিবর্তন চান তিনি।

দুঃখ করে লীনা বলেন, মা মা বলে এত গান করি আমরা। কবিতা করি। সেই মায়ের আজ এই অবস্থা!

এর পরও গণসঙ্গীতের তারকা শিল্পী ফকির আলমগীর মাকে নিয়ে কয়েক লাইন গাইলেন। ‘মায়ের এক ধার দুধের দাম কাটিয়া গায়ের চাম,/পাপোশ বানাইলেও ঋণের শোধ হবে না/এমন দরদি ভবে কেউ হবে না আমার মা গো…।’ শিল্পী যখন প্রশ্ন রাখেন, ‘কেন সে মায়ের ভক্তি রাখ না’ তখন আরও একবার লজ্জায় ডুবে গোটা সমাবেশ।

পথনাটক পরিষদের সভাপতি মান্নান হীরা, অভিনয় শিল্পী ঝুনা চৌধুরী, মিজানুর রহমান, আশিকুর রহমান বুলু, হানিফ খানসহ আরও অনেকেই এদিন নিজের মতো করে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে এর প্রতিকার দাবি করেন।

কর্মসূচী শেষে আগামী ১০ অক্টোবর সারাদেশের জেলা ও থানায় ধর্ষণের বিচার চেয়ে অবস্থান কর্মসূচী পালন করার নতুন কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT