ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৮ জানুয়ারি ২০২১, ১৫ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ব্যবহার কমেছে বিলুপ্ত হয়নি

প্রকাশিত : 08:23 AM, 12 December 2020 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

ঝাঁকিজাল মাছ ধরার চিরায়ত একটি পদ্ধতি। আবহমান কাল থেকে বাংলার এ ভূখণ্ডে মাছ ধরায় ঝাঁকিজাল ব্যবহার হয়ে আসছে। যদিও এখন আর আগের মতো খাল-বিল পুকুর নদী নালায় সে ধরনের মাছ নেই, যা কেবল ঝাঁকিজালেই ধরা পড়ত। জাল বোনায় দক্ষ করিগর কমে গেছে। বস্তুত কার্পাস তুলার সুতার উৎপাদন ক্রমে কমে যাওয়ায় ইদানীং হাতে বোনা ঝাঁকিজাল কেনাবেচা হ্রাস পেয়েছে। অন্যদিকে মেশিনে তৈরি নাইলনের জালের ব্যবহার বেড়েছে। জাল দিয়ে মাছ ধরা যে শৌখিনতা, তাও কমে গেছে। তাই বলে মাছ ধরার এ পদ্ধতি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। কমবেশি সারাদেশেই তা চালু আছে। এখনও নদী কিংবা খাল-পুকুরে মাঝে মধ্যেই ঝাঁকিজালের ব্যবহার হচ্ছে, যা কেবলই মনে করিয়ে দিচ্ছে বাংলার সেই ঐতিহ্যের কথা।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই বাঙালীর মৎস্যপ্রীতি ইতিহাসে ঠাঁই করে নিয়েছে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের প্রিয় খাবারের শীর্ষে তাই মাছের অবস্থান। স্মরণাতীত কাল থেকে এ ধারা চলে আসছে। একই সঙ্গে এ ভূখণ্ডে মাছ ধরার অজস্র পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে ঝাঁকিজাল নিঃসন্দেহে অন্যতম। ‘ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ’ বাক্যগুলো থেকে ‘ঝাঁকি’ শব্দের উৎপত্তি বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রকৃত অর্থেই ঝাঁকিজালে একটা সময়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছ ধরা পড়ত। তাই দেশের সর্বত্র বিশেষ করে বরিশাল-পটুয়াখালীসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ছিল ঝাঁকিজালের বহুল ব্যবহার। গ্রামীণ অঞ্চলে এমন গৃহস্থ বাড়ি বিরল ছিল, যে পরিবারে এক-দুটি কিংবা তারও বেশি ঝাঁকিজাল ছিল না। চার-পাঁচ দশক আগেও মাছ ধরায় ঝাঁকিজালের আধিপত্য ছিল প্রবল। প্রবীণদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সে সময়ে মাছ এতটা দুর্মূল্য ছিল না। পুকুর খাল বিলে ছিল দেশীয় নানা জাতের মাছের ছড়াছড়ি। খেতে বসার আগেও মানুষ কোমড়ে গামছা বেঁধে দু’চারটি ‘খেও’ মেরে ঝুড়ি ভর্তি মাছ নিয়ে ফিরে আসত। পান্তা অথবা গরম ভাত যাই হোক, সে সঙ্গে দেশী মাছের সংমিশ্রণ অপূর্ব স্বাদের সৃষ্টি করত।

প্রবীণদের মতে-ঝাঁকিজালেরও রয়েছে রকমফের। যেমন আকারে বড় ছোট। অর্থাৎ হাত দিয়ে মেপে জাল পরখ করা হয়। সাধারণত ঝাঁকিজাল নিচে তিন-চার হাত এবং সর্বোচ্চ দশ-বারো হাত লম্বা হয়। বড় জাল অর্থাৎ ১০-১২ হাত লম্বা জাল দিয়ে সবার পক্ষে খেও মারা সম্ভব নয়। এজন্য যথেষ্ট দক্ষতা এবং শারীরিক সক্ষমতার প্রয়োজন। জালের ফাঁসেও রয়েছে তারতম্য। ছোট মাছ ধরার জন্য ক্ষুদ্র ফাঁস। বড় মাছের জন্য বড় ফাঁস। ঝাঁকিজাল বোনা দেখে যতটা সহজ মনে হয়, প্রকৃত পক্ষে তা বেশ কঠিন কাজ। বিশেষ করে জালের ফাঁসের গেরো বা গিঁট শক্ত করা নিপুণ কারিগরি কাজ। ফাঁসের গিঁট দুর্বল হলে তাতে মাছ মিলবে কম। গিঁট শক্ত হলে মাছ যেমন বেশি মিলবে, তেমনি জাল হবে ঠেকসই। জাল কতটা ফুলের পাপড়ির মতো চারপাশে বৃত্তাকারে ছড়িয়ে পড়ে, সেটাও জাল বুনিয়েদের দক্ষতা প্রমাণ করে। জালের নিচে অর্থাৎ শেষ প্রান্তে এক ধরনের থলে থাকে। যা আঞ্চলিক ভাষায় ‘লোচ’ বলা হয়। এতে ছোট আকারের মাছ গিয়ে জমা হয়। ঝাঁকিজালে লোহার কাঠির ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এতে জালের ওজন বাড়ে। মাছ বেরিয়ে যেতে পারে না।

একটা সময়ে ঝাঁকিজাল কেবলমাত্র দেশীয় কার্পাস সুতার দ্বারা তৈরি হতো। দেশী গাবের রস আগুনে জ্বাল দিয়ে ঝাঁকি জাল ‘মাঞ্জা’ হতো। এতে জাল ঠেকসই হতো। কিন্তু পরে বাজারে নায়লনের সুতা আসায় দেশীয় সুতার কদর কমে যায়। নায়লনের সুতায় তৈরি ঝাঁকিজালে মাঞ্জার প্রয়োজন হয় না।

ঝাঁকিজাল বোনা একটা সময়ে বহু মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস ছিল। ঝাঁকিজাল কেনাবেচাও অনেকের পেশা ছিল। একনাগারে চার-পাঁচ দিনে ৫-৭ হাত লম্বা ঝাঁকিজাল বোনা সম্ভব হয়। এভাবে অনেকে সারা বছর ঝাঁকিজাল বুনতো। কারও কারও ঝাঁকিজাল বোনা ছিল স্রেফ সখ। দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় প্রতিটি সাপ্তাহিক হাটে ঝাঁকিজাল কেনাবেচার নির্দিষ্ট জায়গা ছিল। যেখানে সারি সারি জাল ঝুলিয়ে রাখা হতো। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ জাল কেনার জন্য হাটে যেত। কেবলমাত্র জাল কেনাবেচার জন্য এখনও অনেক সাপ্তাহিক হাট বিখ্যাত হয়ে আছে।

ঝাঁকিজাল ব্যবহারের সে সোনালি দিনগুলো অনেকটাই অতীত হয়ে পড়েছে। দল বেঁধে রাত জেগে ডিঙি নৌকা নিয়ে ঝাঁকিজাল দিয়ে মাছ ধরা মৎস্যপ্রেমিকদের কাছে কেবলই স্মৃতি। ঝাঁকিজালের ব্যবহার অনেক কমে গেছে। পুকুর ডোবা খাল বিলে আগের মতো ঝুপ ঝুপ শব্দে যত্রতত্র ঝাঁকিজালের ব্যবহার দেখা যায় না। তাই বলে ঝাঁকিজাল পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বরিশাল-পটুয়াখালী অঞ্চলের গ্রাম গঞ্জে বিশেষ করে চর-দ্বীপাঞ্চলে ঝাঁকিজালের ব্যবহার কমবেশি রয়েছে। যে কোন নদী কিংবা বিলের মধ্যবর্তী খালের পাড় ধরে হেঁটে গেলে দু’চারজন ঝাঁকিজাল দিয়ে মৎস্য শিকারির দেখা মিলবেই।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT