ঢাকা, রবিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বহুমাত্রিক সায়ীদ স্যার

প্রকাশিত : 07:15 PM, 27 July 2021 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

এই অতিমারির সময়েও একটা বড় আনন্দের সংবাদ-গতকাল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার ৮২ বছর পার করে ৮৩ বছরে পা দিয়েছেন। আমাদের সৌভাগ্য, সায়ীদ স্যারের কারণেই আমরা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গ পেয়েছি। আবার সায়ীদ স্যারের মতো জীবনবাদী, স্বপ্নপ্রবণ, হৃদয় জাগানিয়া মানুষের ভালোবাসা ও স্নেহ পেয়েছি।

কয়েক দশকেরও বেশি সময়জুড়েই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র বহু মানুষের জন্য এক আত্মিক প্রেরণার জায়গা হয়ে উঠেছে। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অবকাঠামোগত বাহ্যিক একটা চেহারা দাঁড়িয়েছে বটে; কিন্তু এর আত্মিক চেহারাটা খুবই অশরীরী। যে যার মতো করে অনুভব করে। আবার সায়ীদ স্যারের সঙ্গে বহু মানুষের বহুবিধ সম্পর্কও একটা অবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়েছে। পৃথিবীর বহু প্রান্ত থেকেই বহু নারী, পুরুষ মনে করেন তার সঙ্গেই স্যারের সম্পর্কটা বোধহয় সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। আমাদের যুগে এরকম বহুমাত্রিক ভালোবাসা জাগিয়ে তা সজীব রাখার রসায়ন জানা মানুষ শুধু বিরলই নয়, অনন্যও। সায়ীদ স্যার অসম্ভব গুণগ্রাহী মানুষও বটে। সারা জীবনে তিনি যত কর্মকাণ্ড করেছেন, সবখানেই এই গুণগ্রাহিতার ছোঁয়া পাওয়া যায়।

দুই.

২০০৪ সালে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র এবং সায়ীদ স্যারের জীবনে একটা বড় ঘটনা ঘটে। স্যার সে বছর ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান। স্যারের কাজকে স্বীকৃতি দিয়ে এই পুরস্কার ঘোষণাকালে ম্যাগসাইসাই ফাউন্ডেশন আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, ‘In electing Abdullah Abu Sayeed to receive the 2004 Ramon Magsaysay Award for Journalism, Literature, and Creative Communication Arts, the board of trustees recognizes his cultivating in the youth of Bangladesh a love for books and their humanizing values through exposure to the great works of Bengal and the world.’

এ পুরস্কার গ্রহণকালে ফিলিপাইনের ম্যানিলায় নানা অনুষ্ঠানে স্যারকে আলোকিত মানুষ গড়ার এই প্রচেষ্টার অবয়ব তুলে ধরতে হয়। চিরায়ত শুভ মূল্যবোধ ছাড়া, বড় হৃদয়ের মানুষ ছাড়া যে বড় জাতি তৈরি হয় না এবং সেটি না হলে যে সমষ্টির কল্যাণধর্মী একটা রাষ্ট্র দাঁড় করানো যায় না-স্যারের এই কথা সেখানকার দর্শক-শ্রোতাদের খুব গভীরভাবেই স্পর্শ করে। পুরস্কার গ্রহণের দিন আনুষ্ঠানিক বক্তৃতায় সায়ীদ স্যার খুব সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করলেন, ‘Little minds and great nations cannot go together. Consequently, our aspiration for greatness as a nation must be matched by our commitment to create enlightened people within the nation. And therefore, our endeavor is to create for Bangladesh an informed, enriched and committed generation of future citizens. In this, our focus has been on the youth.’

তিন.

কয়েক বছর ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আমন্ত্রিতদের নিয়ে একটি আড্ডার আয়োজন করে চলেছেন সায়ীদ স্যার। সেখানেই নানা বিষয়ে নানাজন কথা বলেন। স্যারও নিজের মতো করে প্রসঙ্গমতো নিজের ব্যাখ্যাটা দেন। আড্ডার মধ্যমণি থাকেন স্যারই। একদিনের আড্ডার কথা মনে আছে। দিনটি ছিল ১৬ মে ২০১৯, বৃহস্পতিবার। আড্ডায় কথা উঠল আমরা কাকে বলব ‘সমালোচক’? নানাজন নানা মত দিলেন। তখন সায়ীদ স্যার স্বভাবসুলভ কণ্ঠে বলে উঠলেন, আমার লেখা বই ‘বিস্রস্ত জার্নালে’ একটা লাইন আছে, ‘চোরকে চুরির মুহূর্তে যে ধরতে পারে সে হলো কবি, আর চোর পালালে যার বুদ্ধি বাড়ে সে হচ্ছে, ‘সমালোচক’। লন্ডনে একটা আলোচনায় আমাকে প্রশ্ন করল, এই বিষয়টির ব্যাখ্যা কী, বোঝান।

আমি বললাম, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটা-আবেগের এক বিস্ফোরণ। এরকম প্রচণ্ড আবেগ, মনে হয় যে, আমিই সেই মুহূর্তে নজরুল। এমন প্রচণ্ড আবেগ! একটা শব্দেও কী সামান্যতম দুর্বলতা আছে? একটা ছন্দেও কী সামান্যতম দুর্বলতা আছে? কোনো জায়গায়ই কোনো ভুল নেই। নিখুঁত। অর্থাৎ যখন তার আবেগরূপী চোরটা এসেছিল, প্রচণ্ড আবেগ সেসময় যে ধরে ফেলতে পারে সেই হচ্ছে কবি। আর চোর পালালে যার বুদ্ধি বাড়ে সেই হচ্ছে সমালোচক।’

আলোচনার এই অবস্থায় কথা উঠল স্যারের বক্তৃতা নিয়ে। আমি বললাম, স্যার এমনিতে তো আপনার বক্তৃতা সুন্দর। কিন্তু শিশুদের সামনে আপনি যখন কথা বলেন, তখন সেটা তো অসাধারণ। আমার মনে আছে একবার হলিক্রস স্কুলে তখনকার হেড মিসট্রেস ফিলিমিনো কুইয়ার অনুরোধে ক্লাস এইট-নাইনের মেয়েদের আপনি ‘আদব-লেহাজ’ শেখাতে গেলেন। ওরা বড়দের কথা শোনে না, তাই ওদের এক ধরনের মোরাল টিচিং দিতেই আপনাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেখানে শত শত স্কুল শিক্ষার্থীর সামনে আপনি যে বক্তৃতা দিলেন সেটি শুনে তো ওরা হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।

সায়ীদ স্যার বললেন, সেই বয়স তো আমার চলে গেছে, তাই না?

আমি বললাম, খুব বেশিদিন আগের কথা তো না, স্যার।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তার ব্যাখ্যা দিয়ে বললেন, ‘বেশিদিন আগের কথা না হয়তো। কিন্তু ৭০ বছর বয়সের সঙ্গে ৮০ বছর বয়সের, ৮০’র সঙ্গে ৯০ বছর বয়সের যে কী পার্থক্য! এখন বক্তৃতা ভালো হবে কী হবে না, সেটা নির্ভর করে আমার শরীর ভালো আছে কিনা তার ওপর। তারপর আগে আমার বক্তৃতা যে স্বতঃস্ফূর্ত ছিল, সেটি এখন নেই।’

এ কথার মাঝে সাংবাদিক ও কবি হাসান হাফিজ ভাই তার একটি অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করলেন। বললেন, ‘স্যার সংগীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায় মৃত্যুর আগে শেষবার যখন ঢাকা এসেছিলেন, আমি তার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। উনি আমাকে বলেছিলেন আমার সেই গলা আর নেই। পাওয়ারফুল মাইক্রোফোনের সামনে সেটি ধরা পড়ে।’

সায়ীদ স্যার, তাতে একমত হলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, এটা হয়। আমার নিজের গলাও তো আগের চাইতে খারাপ হয়ে গেছে। তবুও কাজ চলে যায়। আর বক্তৃতায় গলার দরকার হয়। ক্যাঁ ক্যাঁ করতে থাকলে আর কে কথা শুনবে’।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের কর্মী এই আড্ডার সংগঠক তানিয়া আফরোজ বলে উঠলেন, ‘স্যার আপনার আগের বক্তৃতার ভিডিও আর এখনকার বক্তৃতা শুনলে পার্থক্য বোঝা যায়। আগেরটা হচ্ছে ফাস্ট আর এখনকারটা স্লো। আগে আপনি খুব ফাস্ট বলতেন।’

সায়ীদ স্যার তারও জবাব দিয়ে বললেন, ‘আমি এখনো ফাস্ট বলতে পারি। এখন যেহেতু ভাবনাটা আরও গাঢ় হয়েছে, কাজেই একটু চিন্তা করে বলি। যদিও এখনো দ্রুত, ফ্লুয়েন্ট বলতে পারি, আমার কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এখন যেহেতু একটু গভীরতর বা ডিপার জায়গাতে বলতে হয়…’

হাসান হাফিজ ভাই জবাবটা শেষ হতে না দিয়েই বলে ফেললেন, ‘এখন হয়তো লঘু কথাটা আপনার বলতে ইচ্ছা হয় না…’

সায়ীদ স্যারের ত্বরিত জবাব, ‘না, বলতে ইচ্ছা হয়। হয়কী, অল্প বয়সে আসলে কথায় অলংকার থাকে। বেশি বয়সে সে অলংকার থাকে না। রবীন্দ্রনাথের একটা গান আছে না, ‘আমার এ গান ছেড়েছে সকল অলংকার..’। রবীন্দ্রনাথের প্রথমদিকের গানের মধ্যে যে অলংকার ছিল শেষের দিকে কিন্তু সেই অলংকার থাকেনি। কিন্তু অন্য একটা জিনিস থাকে…।’

সায়ীদ স্যারের এটিও একটা বড় গুণ। আড্ডায় সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। সবার কথার জবাব দেন। সম্ভবত সবার প্রতি স্যারের ভালোবাসার এটিও একটা বড় নিদর্শন। স্যারের সঙ্গে যে কোনো বিষয় নিয়ে সমানতালে বাহাস করা যায়। এমনকি সায়ীদ স্যারের সামনে তাকে নিয়েও সমালোচনা করা যায়। স্যারের এই বিনয়, পরমতসহিষ্ণুতা অসাধারণই নয়, শিক্ষণীয়ও বটে।

চার.

সায়ীদ স্যারের ৮২ বছরের জীবন ফুলে ও ফলে বিকশিত। কর্মে ও স্বপ্নে পূর্ণ। সমাজের বড় অংশের কাছে স্বীকৃত ও আদরনীয়ও। আমাদের জন্য বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠান রেখে গেলেন সায়ীদ স্যার। স্যারের কাছে সেজন্য আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। এখন নানা সামাজিক-রাজনৈতিক ডামাডোলে হয়তো বোঝা সম্ভব নয়, কী এক আলোকখনি তিনি আমাদের জন্য তৈরি করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ যখন আরও বড় হবে, রাষ্ট্র হিসাবে আরও সংহত হবে, আমাদের দৃষ্টি যখন আরও প্রসারিত ও উদার হবে, আরও গণতান্ত্রিক এবং মানবিক হবে, তখন হয়তো এই মানুষটির প্রতি আমাদের সুদৃষ্টি আরও সুদৃঢ় হবে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক; সাবেক সমন্বয়কারী, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT