ঢাকা, বুধবার ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ১৪ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করার সুযোগ নেই॥ রাষ্ট্রপতি

প্রকাশিত : 09:39 PM, 9 November 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশকে জানতে হলে, বাঙালির মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে হবে, বঙ্গবন্ধুকে জানতে হবে। এই দুই সত্তাকে আলাদাভাবে দেখার চেষ্টা যারা করেছেন তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আজকের বাস্তবতা এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যারা বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পিত কাহিনী ও পরিস্থিতি বানিয়ে দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে দেশের শান্তি ও অগ্রগতির ধারাকে ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সোমবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনে স্মারক বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর জাতির পিতার আদর্শকে ধারণ করে জাতি এগিয়ে যাক ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে, নোঙ্গর ফেলুক বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলায়’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক বিশাল হৃদয়ের মানুষ। নিজে স্বপ্ন দেখতেন এবং মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন। দেশের মানুষের প্রতি তাঁর আস্থা, ভালোবাসা ও বিশ্বাস ছিল অপরিসীম। নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাংলার মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান দিয়ে গেছেন। ঋণী করে গেছেন বাঙালি জাতিকে। মুজিববর্ষ পালনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর জীবন-কর্ম, চিন্তা-চেতনা ও দর্শন ছড়িয়ে দিতে হবে বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের তরুণ প্রজন্মের কাছে।

এর আগে স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সন্ধ্যা ৬টায় সংসদের বিশেষ অধিবেশন শুরু হয়। বিউগলে রাষ্ট্রপতির আগমনি অর্কেস্ট্রা বাজানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি মো, আবদুল হামিদ ৬টা ৭ মিনিটে সংসদ কক্ষে পৌঁছালে প্রথা অনুযায়ী জাতীয় সঙ্গীত বাজানো হয়। সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যসহ অধিবেশন কক্ষে থাকা সবাই দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্মান জানান। এরপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ভাষণ সংসদ কক্ষে দেখানো হয়। স্পীকারের পাশে রাখা ডায়াসে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন রাষ্ট্রপতি, যিনি গণপরিষদ ও দেশের প্রথম সংসদের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আইনসভায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন।

রাষ্ট্রপতি শুরুতেই দেশবাসীসহ দেশের বাইরে বসবাসরত সকল প্রবাসীকে মুজিববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ-২০২০’ উপলক্ষে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশনে থাকতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দ ও গৌরবের বিষয়। এটি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। এজন্য মহান আল্লাহ তায়ালার দরবারে অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমি আশা করি অধিবেশনের কার্যক্রম বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এছাড়া জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অধিবেশনে জাতির পিতাকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে আমরা নিজেরাও সম্মানিত হবো।

ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর চেতনায় উজ্জীবিত করতে সকলকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়। বঙ্গবন্ধু একটি প্রতিষ্ঠান, একটি সত্তা, একটি ইতিহাস। জীবিত বঙ্গবন্ধুর মতোই অন্তরালের বঙ্গবন্ধু শক্তিশালী। যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, বাঙালি থাকবে, এদেশের জনগণ থাকবে, ততদিনই বঙ্গবন্ধু সকলের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবেন। নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আলোকবর্তিকা হয়ে তিনি বিশ্বকে করেছেন আলোকময়। তাই আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে বঙ্গবন্ধুর নীতি, আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে সকলকে উদ্যোগী হতে হবে।

দেশের সাধারণ মানষকে বিভ্রান্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপ্রধান আরও বলেন, স্বাধীনতার সুফল প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তোলার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্য। জনগণের ঐক্য, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ঐক্য। যে ঐক্য একাত্তরে আমাদেরকে এক করেছিল, সেই ঐক্যই গড়ে তুলতে হবে সাম্প্রদায়িকতা, অগণতান্ত্রিকতা, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে।

তিনি বলেন, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের কবল থেকে আমরা যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি, তাকে রক্ষা করতে হবে। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। যারা বাস্তবকে অস্বীকার করে কল্পিত কাহিনী ও পরিস্থিতি বানিয়ে দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত ও বিপথগামী করে দেশের শান্তি ও অগ্রগতিরধারাকে ব্যাহত করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। তাহলেই প্রতিষ্ঠিত হবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা, সার্থক হবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন।

‘মুজিববর্ষ’ পালনের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সরকারকে এবং বিশেষ অধিবেশন আয়োজনের জন্য স্পীকার ও জাতীয় সংসদের সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, চলমান করোনা পরিস্থিতিতে বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আমি আশা করি অধিবেশনের কার্যক্রম বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মকে বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে জানাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি বলেন, জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অধিবেশনে জাতির পিতাকে সম্মান জানানোর মাধ্যমে আমরা নিজেরাও সম্মানিত হবো। সীমিত সময় ও পরিসরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা কোনভাবেই সম্ভব নয়। তাঁর জীবন ও কর্মের বিস্তৃতি এতটাই বিশাল যে ঘন্টার পর ঘন্টা, এমনকি দিনের পর দিন আলোচনা করলেও তা অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।

স্মারক বক্তৃতায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশে ফিরে বঙ্গবন্ধু সংসদ কার্যকর করার উদ্যোগ নেন জানিয়ে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরেই পুনর্গঠন কর্মকান্ডের সঙ্গে সঙ্গে সংসদকে কার্যকর করার উদ্যোগ নেন। ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ রাষ্ট্রপতির ২২ নম্বর আদেশবলে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে গণপরিষদ গঠন করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম ‘গণপরিষদ’ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের জাতীয় এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যরা এই পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন।

গণ পরিষদে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, গণ পরিষদের প্রধান দায়িত্ব ছিল দেশের জন্য একটি সংবিধান প্রণয়ন করা। কনিষ্ঠ ও নবীন সদস্য হিসাবে গণপরিষদের অধিবেশনে অংশগ্রহণ ছিল আমার জন্য খুবই আগ্রহ ও আকর্ষণের। নিতান্ত নবীন সদস্য হিসাবে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ সদস্যদের কর্মকান্ড খুবই আগ্রহভরে প্রত্যক্ষ করতাম। পার্লামেন্টারিয়ান বঙ্গবন্ধু তখন ছিলেন আমার আগ্রহের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু গণপরিষদের কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। গণপরিষদে কোন বিরোধী দল ছিলো না। বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র সব মিলিয়ে সদস্যসংখ্যা ১০-এ উন্নীত হয়নি। কিন্তু বিরোধী সদস্যগণ প্রতিবাদমুখর ছিলেন, দীর্ঘক্ষণ বক্তব্য রাখার সুযোগ পেতেন। সংসদ অধিবেশন হতো প্রাণবন্ত। যুক্তিতর্ক ও মতামত উপস্থাপন ছিল খুবই আকর্ষণীয়। সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল সংসদে স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর উপস্থিতি ও তাঁর ভাষণ।

সংসদে বিরোধীদের বঙ্গবন্ধু গুরুত্ব দিতেন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি সেই সময়কার ন্যাপ থেকে নির্বাচিত পরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে ন্যাপ থেকে নির্বাচিত তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের কথা। পার্লামেন্টে বক্তৃতা করার সুযোগ চাইলে সবসময়ই তিনি সুযোগ পেতেন। স্পীকার মাঝে মাঝে তাকে মাইক দিতে না চাইলেও বঙ্গবন্ধু বলতেন ‘ওকে সুযোগ দেন,বিরোধী পক্ষের কথা আগে শুনতে হবে’।

সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে কমিটি গঠন প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,‘শুধু যে আমাদের দলীয় সদস্য থেকে কমিটি করব তা নয়, দল-মত নির্বিশেষে সকলের সঙ্গে আলোচনা করা হবে, জনগণকে যাতে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী একটা সুষ্ঠু সংবিধান দেওয়া যায়, এই উদ্দেশ্যে সকলের মতামত চাইব, এই সংবিধানে মানবিক অধিকার থাকবে, যে অধিকার মানুষ চিরজীবন ভোগ করতে পারবে।’

স্মারক বক্তৃতায় রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু সংসদের সকল কার্যক্রমে বিরোধী সদস্যদের মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতেন। রুলস অব প্রসিডিওর এর খসড়ার ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টিই একেবারে সবকিছু চূড়ান্ত করে নাই। দুই-একজন যারা নির্দলীয় বা বিরোধী পার্টি যাই বলুন আমার কোনো আপত্তি নাই, যদি আপনাদের ভালো কোনো সংশোধনী থাকে, তা নিশ্চয়ই দেশের মঙ্গলের জন্য মনকে আমরা বড় করে তা গ্রহণ করব।

বিরোধীদের কথা বলার সুযোগ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কথা তুলে ধরে সেই সময়কার আইনপ্রণেতা আবদুল হামিদ বলেন, ‘সংসদে আরও একটা বিষয় ছিল লক্ষ্যণীয়, পার্লামেন্টে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে স্পীকার বিব্রত হতেন, কিন্তু বঙ্গবন্ধু হতেন না। উদার না হলে, গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন না হলে এটা ভাবাই যেত না। ১৯৭৩ সালের পার্লামেন্টে আতাউর রহমান খান, এমএন লারমাসহ বিরোধী দলের কয়েকজন এমপি ছিলেন। তখনও দেখেছি তাঁরা কথা বলতে চাইলেই সুযোগ পেতেন। প্রায় সময় বঙ্গবন্ধুই স্পীকারকে বলে সে সুযোগ করে দিতেন। বিরোধী দলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আলাদা একটা মনোযোগ ছিল বলেই এটা সম্ভব হয়েছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শের যত অমিলই থাকুক না কেন বঙ্গবন্ধু কখনো বিরোধী দলের নেতাদের কটাক্ষ করে কিছু বলতেন না বরং তাদেরকে যথাযথ সম্মান দিয়ে কথা বলতেন। রাজনৈতিক শিষ্টাচার তার জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপ্রধান আবদুল হামিদ বলেন, আপামর জনগণের আর্থিক সহায়তার জন্য চালু করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু সুরক্ষা বীমা’। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে দেশের ১০০টি উপজেলায় পুষ্টিসমৃদ্ধ চাল বিতরণ করা হয়েছে। সারাদেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুব উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ই-কমার্স প্লাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এসব কর্মসূচি গ্রহণের ফলে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যাব।

রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল যখন এভাবে কাজ করে তখন জাতির উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত হয়। সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে দলমত নির্বিশেষে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারলে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। মুজিববর্ষে এটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।

বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিভিন্ন পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস মানবসভ্যতাকে ইতিহাসের এক চরম বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর অপার সম্ভাবনাময় বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে মারাত্মক হুমকির মুখে। করোনার প্রভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি, কর্মহীন হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। উন্নত বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে করোনা দুর্যোগ মোকাবেলায়। বাংলাদেশও এর ব্যাতিক্রম নয়। ইতোমধ্যে করোনায় আমরা অনেককে হারিয়েছি, যাদের মধ্যে রয়েছেন বরেণ্য রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, চিকিৎসক, নার্সসহ নানা পেশা ও বয়সের মানুষ।

তিনি বলেন, করোনার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের অর্থনীতি, শিক্ষা,স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পসহ অর্থনীতির সকল সেক্টরে। ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। জীবনযাত্রায় নেমে আসে অচলাবস্থা। এ অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩১ দফা নির্দেশনা প্রদান এবং প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল কনফারেন্সের মাধ্যমে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন ও দিক-নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তাঁর এই সময়োচিত সাহসী সিদ্ধান্ত এবং অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে বাংলাদেশ করোনা পরিস্থিতি সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করে যাচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে তাঁর সাহসিকতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের জন্য আমি আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।

করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন যাতে সবাই পায় সে জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, একক বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে এর প্রাদুর্ভাব মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আজ আমরা কেউই সুরক্ষিত নই, যতক্ষণ না পর্যন্ত সুরক্ষার জন্য ভ্যাকসিন আবিষ্কার হচ্ছে। অতীতে মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্লেগ, স্প্যানিশ ফ্লু, কলেরা, টাইফয়েড, যক্ষা, হাম, ম্যানিনজাইটিস, পোলিও ইত্যাদি মহামারী ও সংক্রামক ব্যাধিতে কোটি কোটি লোক প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান থেমে থাকেনি। সময়ের অগ্নিপরীক্ষায় মানুষ এসবের প্রতিষেধক আবিষ্কার করেছে। তাই একসময় যা মহামারী ছিল আজ তা বিশ্ব থেকে নির্মূল হয়েছে।

করোনার ভ্যাকসিন বিশ্বের সকল দেশ সমভাবে পায় তা নিশ্চিত করতে বিশ্বসমপ্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গোটা বিশ্ববাসীর মতো আমরাও আশাবাদী অচিরেই করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কৃত হবে, যা গোটা মানবজাতিকে এক চরম অনিশ্চয়তা, হতাশা, উৎকন্ঠা থেকে মুক্তি দেবে। স্বস্তি ফিরে আসবে ঘরে ঘরে। তবে এ ভ্যাকসিন বিশ্বের সকল দেশ ও অঞ্চল যাতে একই সময়ে ও সমভাবে পায় তা নিশ্চিতকরতে বিশ্বসম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। আমি জাতিসংঘসহ বহুজাতিক সংস্থা ও উন্নতবিশ্বকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা এ জেনে আশাবাদী যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যথাসময়ে ভ্যাকসিন পাওয়ার সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘৭ কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না‘। করোনা মহামারী আমাদের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকে সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত করলেও থামিয়ে দিতে পারেনি। আমি আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে করোনাসহ সকল বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে বাঙালি জাতি কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে এবং গড়ে তুলবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ।

রাষ্ট্রপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত, দুর্নীতি ও শোষণহীন সমৃদ্ধ এক বাংলাদেশ। জাতির পিতার দর্শন ছিল ‘বাংলার মানুষের মুক্তি। সেই মুক্তি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি। কিন্তু কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের লক্ষ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নে ভবিষ্যত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। পরিকল্পিত উন্নযনের ওপর ভিত্তি করে বঙ্গবন্ধু আধুনিক রাষ্ট্রের রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন, যা দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) প্রতিফলিত হয়েছিল।

আবদুল হামিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরাধিকারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ ২০১৫ সালে এমডিজির অধিকাংশ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনসহ নি¤œ মধ্যমআয়ের দেশের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৮ সলে প্রথমবারের মত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ উত্তীর্ণ হওয়ার সকল শর্ত পূরণ করেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। কিছু কিছু সূচকে বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে। বাংলাদেশ আজ এশিয়ার সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী দেশ। এই অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে হবে। জাতিসংঘসহ সকল আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশকে রাষ্ট্রপতি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীরা সসম্মানে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য পুনরায় আহ্বান জানান।

স্মারক বক্তৃতার শেষাংশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জ্যোতি কবিতার কিছু অংশ পাঠ করে বলেন- ‘ভেঙ্গেছে দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়, তিমির বিদার উদার অভ্যুদয়, তোমারি হউক জয়।…… প্রভাব সূর্য এসেছ রুদ্র সাজে, দুঃখের পথে তোমার তূর্য বাজে- অরুণ-বহ্নি জ্বালাও চিত্ত মাছে, মৃত্যুর হোক লয়, তোমারি হউক জয়।’

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT