ঢাকা, সোমবার ১৪ জুন ২০২১, ৩১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

প্রাণ ফিরেছে সাতছড়ি উদ্যান

প্রকাশিত : 01:24 PM, 6 June 2021 Sunday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

সারা দেশে যখন পরিবেশ বিপন্নের মহোৎসব চলছে ঠিক তখন হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের উল্টো চিত্র তৈরি হচ্ছে। জাতীয় উদ্যানে গত এক বছরে ভ্রমণপিপাসু মানুষের উৎপাত আর প্রকৃতির ওপর নানা অত্যাচার বন্ধ থাকায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে বন ও বনের প্রাণিকুল।

এ উদ্যানে দেশে মহাবিপন্ন ও বিপন্ন বিরল প্রকৃতির নানা প্রাণিকুলের সঙ্গে রয়েছে বিপন্ন উদ্ভিদকুল। প্রকৃতি নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ পেলেই বেড়ে উঠে আপন মনে। শৌখিন ফটোগ্রাফার আর প্রাণী গবেষকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ছে নানা প্রাণীর ছবি। দেখা মিলেছে মহাবিপন্ন, বিপন্ন ও আইইউনিএনের লাল তালিকায় থাকা প্রাণী।

করোনায় লকডাউনে দুই দফায় প্রায় এক বছর ধরে বন্ধ সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। এ সময়ে সাতছড়ি বনে নেই কোনো কোলাহল, নেই মানুষের কোনো যাতায়াত। নীরব নিস্তব্ধ বনের নানা প্রাণিকুল ঘুরে বেড়াচ্ছে সারা পাহাড়ে। ছিল না তাদের খাবারের কোনো কমতি, ছিল না চলাচলের সীমাবদ্ধতা। প্রাণিকুলের মতোই উদ্ভিদকুলও দীর্ঘ সময় পেয়েছে আপন মহিমায় ফিরে যেতে।

বৃষ্টি আর ঠাণ্ডা বাতাস যেন তাদের জীবণের অনুষঙ্গ। নানা জাতের গাছপালা আর লতাপাতায় এখন ভরে উঠছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। গাছের যেমনি বেড়েছে ডালপালা, তেমনি লতাপাতার বেড়েছে আগা, প্রকৃতি তার সাজগোজ সেরে নিয়েছে এ সময়ে। বিপন্ন বনও যেন ফিরে পেয়েছে প্রাণ।

সাতছড়ি বনে আইইউসিএনের তালিকায় বিপন্ন চশমাপরা হনুমান, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, পৃথিবী থেকেই প্রায় বিপন্ন উল্লুক, রামকুত্তা, মেচোবাঘ, উড়ন্ত কাঠবিড়ালী, বন্য মোরগ, বন্যশূকর, ২শ’ প্রজাতির পাখি ও শতাধিক প্রজাতির সাপসহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বসবাস। মানুষ ঘরে আবদ্ধ থাকায় বন যেন ফিরে পেয়েছে তাদের রাজত্ব।

ছায়া ডাকা পাখির কোলাহলমুখর এ উদ্যানটিতে এখন চোখে পড়বে নানা পাখির কলতান। যান্ত্রিক সভ্যতার বাহিরে অন্য একটি জগত এখন পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেখানে প্রকৃতি সৌদর্যকে অবলোকন করা যায় আপন মনে। ডানা মেলেছে বড়-বড় বৃক্ষরাজি, পাখির কলতান, উঁচু-নিচু পাহাড়, নাম না জানা অসংখ্য পাহাড়ি ফুল, প্রকৃতির সবুজ জগত।

সম্প্রতি জাবির প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মুনতাসির আকাশ ঘুরে গেছেন এ বনে। তিনি জানালেন, সাতছড়িতে ফিরে আসছে বিপন্ন হওয়া প্রাণীগুলো। বাড়ছে নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী ও পাখির সংখ্যা।

তিনি বলেন, দেশের আর কোনো বনেই এমন সমুদ্ধ প্রাণীর দেখা এখন আর মিলছে না। প্রকৃতি স্বরূপে ফিরে গেছে। এখন সাতছড়ি গেলে মনে হচ্ছে এদেশের পরিবেশ প্রতিবেশ যেমন থাকার কথা, তার শতভাগই আছে সাতছড়িতে।

সাতছড়ি উদ্যানের ৩দিকে কাছাকাছি ৯টি চা-বাগান রয়েছে। যা বনের পরিবেশকে আরো উন্নত করেছে। সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রয়েছে প্রায় ২০০ বেশি গাছপালা। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ উদ্যানে ১৯৭ প্রজাতির জীবজন্তু রয়েছে। এদের প্রায় ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির উভচর।

এখানে পাখির মধ্যে কাও ধনেশ, বনমোরগ, লালমাথা ট্রগন, কাঠঠোকরার, ময়না, ভিমরাজ, শ্যামা, ঝুটিপাঙ্গা ইত্যাদি। এখন এদের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায় সকাল বিকালে। চলতি বছরের সাতছড়ি বনে দুজন ফটোগ্রাফারের তোলা দুটি ছবি আলাদাভাবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেছে। দুটি ছবিই পাখির এবং লাখো ছবিকে পেছনে ফেলে সেরা অর্জনটি সাতছড়ির।

জাতীয় উদ্যানের ত্রিপুরা পল্লীর হেডম্যান চিত্ত দেববর্মা বলেন, এখন মানুষের আনাগোনা না থাকায় বন যেন দিন দিন জীবন্ত হয়ে উঠছে। নানা প্রজাতির পশুপাখি এখন আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে বনে বনে। বানর, শূকর, সাপসহ নানা প্রাণী এখন অনায়াসেই দেখা যায়। প্রকৃতি আরো সুন্দর হয়ে উঠছে তার আপন মহিমায়।

শৌখিন ফটোগ্রাফার হারিস দেববর্মা জানান, এখন আর গভীর বনে নয়, বনের কিছু ভেতরে গেলেই দেখা মিলছে নানা প্রাণীর; যা আগে সারাদিন ঘুরেও আমরা বণ্যপ্রাণীর দেখাই পেতাম না।

তিনি জানান, সম্প্রতি আমাদের ক্যামেরা ট্রায়ালে পেয়েছি নানা প্রজাতির বিপন্ন প্রাণী। তাদের মধ্যে মহাবিপন্ন রামকুত্তা, বনরুই, উল্লুক, চশমাপড়া হনুমান, কালো ভল্লুকের মতো প্রাণী। মিলেছে বিপন্ন লজ্জাবতী বানর, মায়া হরিণ, মেছো বিড়াল, খাটাশ ও সজারু।

জাতীয় উদ্যানের রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন বলেন, উদ্যানে এখন মানুষের পদচারণা না থাকায় পশুপাখির কলতান বেড়েছে। বেড়েছে নানা প্রজাতির প্রাণীর অবাধ চলাফেরা। এছাড়া সবুজ বন এখন প্রকৃতরূপে ফিরে পেয়েছে তার আসল চেহারা। বনে নানা উদ্ভিদকুলের পাশাপাশি বেড়েছে নানা প্রাণীও।

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের যতগুলো বন আছে, তার মধ্যে বন্যপ্রাণীর জন্য সাতছড়ি অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি বন। মাত্র ২৪৩ হেক্টর বন নিয়ে গঠিত উদ্যানে দেশের বিপন্ন ও বিলুপ্ত নানা প্রাণীর দেখা মিলছে এ বনে। আমাদের এ বনকে রক্ষা করতে হবে, রক্ষা করতে হবে প্রাণীদের। তবেই প্রাণ ফিরে পাবে আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশ।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT