ঢাকা, বুধবার ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১লা বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

‘প্রথম চাহনিতেই জমাট রক্তপুঞ্জের দাগ দেখতে পেয়েছিলাম’

প্রকাশিত : 09:19 AM, 21 December 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

‘পূর্ব বাংলার শ্যামল প্রান্তরজুড়ে আমি আমার প্রথম চাহনিতেই জমাট রক্তপুঞ্জের দাগ দেখতে পেয়েছিলাম। এই সংঘবদ্ধ নিপীড়নের শিকার কেবল হিন্দুরাই নয়, হাজার হাজার বাঙালী মুসলমানও এ নির্মমতার শিকার।’

‘অখণ্ড পাকিস্তানের নামে নিরস্ত্র জনতার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চলছে সামরিক সরকারের। আর তাতে নিশ্চিত হলো- পাকিস্তান আর এক থাকতে পারে না। দুই বছর, পাঁচ বছর বা ১০ বছর- যতদিনই লাগুক না কেন, দেশটা ভাগ হবেই।’

১৯৭১ সালে ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পরিকল্পনা মতো অতর্কিতে বাঙালী নিধনযজ্ঞে মেতে ওঠেছিল পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী। সেই রাতের ধ্বংসযজ্ঞের খবর দ্রুত ছড়িয়ে দেয়ার তেমন কোন সুযোগ ছিল না আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কর্মীদের। ঘটনার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাক বাহিনীর ভয়াবহ নির্মমতার চিত্র একে একে এভাবেই বিশ্ব মিডিয়ায় ওঠে আসতে থাকে।

সবচেয়ে মজার বিষয় ছিল, পাকিস্তানের পক্ষে সংবাদ লেখার জন্য যেসব সাংবাদিককে ঢাকায় আনা হয়েছিল তারাও শেষ পর্যন্ত পক্ষে ছিল না। তাদের এক পর্যায়ে পূর্ব বাংলা থেকে বহিষ্কার করা হলে অনেকে পালিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করেন। তাদের মানবিক লেখনিতে ওঠে আসে ২৫ মার্চের গণহত্যার ভয়াবহতা। যা কঠিনভাবে বিশ্ব মানবতাকে নাড়া দিয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল সেদিনের এ ধরনের সংবাদ।

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় সাংবাদিক সায়মন ড্রিংয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঠাণ্ডা মাথায় ২৪ ঘণ্টা অবিরাম গোলাবর্ষণ করে ১৫ হাজার মানুষকে হত্যা করে। পুলিশ সদর দফতর, ছাত্রাবাস, দোকানপাটে নির্বিচারে হত্যা ও আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার খবর দেয়। বাঙালী জনগণ যে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল, তা গত সপ্তাহে বেদনাদায়ক এক গণহত্যার মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে। এই দুঃস্বপ্ন ভুলতে তাদের কয়েক প্রজন্ম সময় লাগবে।’ এই প্রতিবেদনে ২৫ মার্চের গণহত্যার ভয়াবহতা বহির্বিশ্বে প্রথম ওঠে এসেছিল।

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল টাইম সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পশ্চিম পাকিস্তানী সেনাবাহিনী সম্ভবত কিছু সময়ের জন্য ঢাকাসহ পূর্বাংশের শহরগুলোর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে। কিন্তু অনির্দিষ্টকাল ৫৪ হাজার বর্গমাইলের বিশাল অঞ্চল বাগে রাখতে পারবে না’।

প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলাম লেখক ও রাজনীতিবিদ রণেশ মৈত্র ‘মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যম শীর্ষক’ এক লেখায় বলেছেন, ২৫ মার্চ রাতে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে রাতেই ঢাকাতে ব্যাপক গণহত্যা চালানো হয়। গভীর রাতে সকলেই যখন নিদ্রিত, তখন ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক বের করা হয়। আক্রমণ করা হয় রাজারবাগ পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স এবং পিলখানা ইপিআর হেডকোয়ার্টার্সে। এই অতর্কিত আক্রমণে অসংখ্য পুলিশ ও ইপিআর বাহিনীর সদস্য নিহত হন।

তিনি বলেন, একই সঙ্গে ট্যাংক বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও তার বিভিন্ন ছাত্রাবাসে আক্রমণ করে হাজার হাজার ছাত্রকেও হত্যা করে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও শাসক গোষ্ঠী বাঙালীর প্রতিরোধের শক্তিগুলোকে নিঃশেষ করার লক্ষ্যে এবং সমগ্র বাঙালী জাতিকে নির্মূল করার লক্ষ্যেই এমন আসুরিক নির্মমতার সঙ্গে বাঙালী নিধনযজ্ঞে প্রবৃত্ত হয়।

লেখায় আরও উল্লেখ করা হয়, প্রচার করা হয় পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে ষড়যন্ত্র শেখ মুজিবুর রহমান করেছিলেন সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ করতেই সেনাবাহিনী ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আক্রমণ পরিচালিত করেছে। এগুলোর সম্পর্কে কোন খবর যাতে কোন পত্রিকা প্রকাশ না করে বা রেডিও প্রচার না করে তেমন নির্দেশ দিয়ে সব ঘটনা বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্ব যাতে না প্রচার করতে না পারে তার সব ব্যবস্থা তারা করেছিল। সেই লক্ষ্যে তার পূর্বেই বিদেশী সাংবাদিকদের পূর্ব বাংলা ছেড়ে ফিরে যেতে নির্দেশ দেয়। পরদিন অর্থাৎ ২৬ মার্চ ভোর থেকে কলকাতা কেন্দ্র থেকে আকাশ বাণী বারবার ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি প্রচার করা হয় এবং দফায় দফায় ঢাকার ঘটনাবলি তারা প্রচার করতে থাকে। তবে বিদেশী সাংবাদিকরা গোপনে ট্যাংক বাহিনী ঢাকা শহরে যে গণহত্যা চালিয়ছে তার ছবি নিজ নিজ ক্যামেরায় ধারণ করে ঘটনার বর্ণনাসহ নানা বিশেষ এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে গোপনে পাচার করতে থাকে। মুহূর্তে বিবিসিসহ সব আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিশেষ খবর হিসেবে গণহত্যার বিবরণসমূহ প্রচার করতে থাকে। ঢাকা শহরকে তারা যে মৃতের শহরে পরিণত করেছে তাও গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হয়। বিদেশী সাংবাদিকরা ঢাকা ছেড়ে নানা পথে গোপনে চলে যান নিজ নিজ দেশে নিজ নিজ কর্মস্থলে।

তিনি বলেন, পাকবাহিনীর নির্মমতায় অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশ থেকে প্রায় এক কোটি নর-নারী শিশু দেশত্যাগ করে পশ্চিম বাংলায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। ওই এক কোটি মানুষের দেশত্যাগের ছবি বিভিন্ন দেশের সংবাদপত্রে প্রকাশ হলে তা বিশ্বের মানুষের চিত্তকে আলোড়িত করে।

গণমাধ্যমের অনবদ্য ভূমিকা ॥ ২৫ মার্চ রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র বাঙালীর ওপর পাক হানাদার বাহিনীর সশস্ত্র হামলার তথ্য-সংবাদ প্রচারে বিশ্ব গণমাধ্যমের অনবদ্য ভূমিকা ছিল। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক মফিদুল হকের এক লেখা থেকে জানা যায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বিশ্ব গণমাধ্যমে বহুল আলোচিত ঘটনা এবং মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীর বিজয় অর্জনে তা অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিল।

২৫ মার্চ কালরাত থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের সেই সব ঘটনার নির্মমতা, অন্যায্যতার পাশাশাপি পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) স্বাধিকার আন্দোলনের ন্যায্য দাবিকে যৌক্তিকভাবে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ায় কর্মরত সাংবাদিকরা মানবিক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অবস্থান ছিল মানবিক ও ন্যায়ের পক্ষে। বিদেশী সাংবাদিকদের সেই অবস্থান বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতাকে যুক্তির সঙ্গে তুলে ধরে এবং পর্যায়ক্রমে সচেতন বিশ্ববিবেকের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়।

প্রতিকূলতার মধ্যেও ফাঁস হয় খবর ॥ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যার চিত্র যাতে বিশ্ববাসী জানতে না পারে, সেজন্য পাক হানাদার বাহিনী বিশেষ ব্যবস্থাও নিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিংয়ের জন্য তাদের পরিকল্পনা সফলতার মুখ দেখেনি। লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে ‘ট্যাঙ্কস ক্রাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন লিখে সাইমন ড্রিংই সর্বপ্রথম পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার খবর বিশ্ববাসীকে জানান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে বাঙালী নিধনে যে গণহত্যা চালানো হয়, এই খবর যাতে বিশ্ববাসী না পায় সে ব্যাপারে পাক শাসকদের ব্যাপক তৎপরতায় ঢাকায় বন্দুকের মুখে সব বিদেশী সাংবাদিককে আটকে রেখে করাচীতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু কিছু হোটেল কর্মীর সহযোগিতায় সে রাতে হোটেলেই লুকিয়ে থাকেন লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফ রিপোর্টার সাইমন ড্রিং এবং ফটোসাংবাদিক মাইকেল লরেন্ট। তারা দুজন হোটেলের ছাদে উঠে চারদিকের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। কার্ফু তুলে নেয়ার পর শহর ঘুরে অপারেশন সার্চলাইটের নিষ্ঠুরতার আলামতের ছবি তোলেন। শেষ পর্যন্ত প্লেনে করাচী হয়ে ব্যাঙ্কক পৌঁছে সব ঘটনার সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য পাঠান।

স্বাভাবিক অবস্থার খবর প্রচারে পাকিস্তানের কৌশল ॥ এপ্রিল মাসে ঢাকার ‘স্বাভাবিক’ অবস্থা বিশ্ববাসীকে জানানোর উদ্দেশ্যে পাকিস্তান সামরিক সরকার ৮ সাংবাদিককে ঢাকায় নিয়ে আসে। কিন্তু আমন্ত্রিত সাংবাদিকদের মধ্যে করাচীর সাংবাদিক এ্যান্থনি মাসকারেনহাস প্রোপাগান্ডা ছড়াতে সহযোগিতার বদলে তুলে ধরেন প্রকৃত চিত্র। তিনি পূর্ব বাংলায় ১০ দিন অবস্থান করে যুদ্ধাপরাধের নানা তথ্য নিয়ে ‘জেনোসাইড’ শিরোনামে দ্য সানডে টাইমসে ১৩ জুন ১৯৭১ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেন। এছাড়া দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবাগ, ইতালির সাংবাদিক ওরিয়ানা ফেলাচি, ফরাসী সাংবাদিক বার্নার্ড হেনরি লেভিসহ অনেক বিদেশী সাংবাদিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সরাসরি প্রত্যক্ষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলার মুক্তির সপক্ষে বিশ্ব জনমত সৃষ্টিতে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেন।

ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদকরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে এসে মুক্তিযুদ্ধের তথ্য প্রকাশ করেন। এভাবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত গণমাধ্যমের প্রতিবেদকরা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ প্রকাশ করেন। ২৬ মার্চ গার্ডিয়ান পত্রিকায় ঢাকা থেকে তাড়ানো বিদেশী সাংবাদিকদের অন্যতম মার্টিন এ্যাডনির তিনটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। তিনি একটি প্রতিবেদনে বলেন, অখণ্ড পাকিস্তানের নামে নিরস্ত্র জনতার ওপর সশস্ত্র আক্রমণ চলছে সামরিক সরকারের। আর তাতে নিশ্চিত হলো- পাকিস্তান আর এক থাকতে পারে না।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের সংবাদপত্রের পাশাপাশি বেতার কেন্দ্র ‘আকাশবাণী’ দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঙালীর মুক্তির আকাক্সক্ষাকে যথার্থভাবে তুলে ধরে। এছাড়া সে সময় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া, রেডিও জাপান। আরও স্মরণীয় ঘটনার অবতারণা করেন বয়সের ভারে ৭০ পেরোনো ফরাসী দার্শনিক আন্দ্রে মালরোর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার ঘোষণা। কবি-গায়ক জর্জ হ্যারিসন, বব ডিলান এবং ভারতের পণ্ডিত রবিশঙ্কর নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে সাড়া জাগানো ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করে বাংলাদেশের সপক্ষে বিশ্ব জনমত তৈরি এবং ফান্ড সংগ্রহে অবিস্মরণীয় অবদান রাখেন। কলিন জ্যাকসনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে বিচিত্র পেশার ১০ সদস্যের দল- ওমেগা। এই দলের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঙালী শরণার্থীদের জন্য ব্যাপক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন।

সাংবাদিকরা ছিলেন মানবতার পক্ষে ॥ মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে জানা গেছে, বিশ্বের প্রভাবশালী গণমাধ্যম বিবিসি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ প্রচার করে, ‘পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষের হুলিয়া সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সমর্থকরা এখনও যশোর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা নিয়ন্ত্রণ করছে।’

টাইম ম্যাগাজিন অত্যন্ত স্পর্শকাতর মানবীয় ভাষায় প্রতিবেদন প্রকাশ করে- Bloodz Birth of Bangladesh নামক দেশটির রক্তিম জন্মলগ্নে রাজনৈতিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো পাকিস্তানের পক্ষ নিলেও বিশ্বনন্দিত গণমাধ্যম ও নিয়োজিত সাংবাদিকরা সরব ছিলেন মানবতার পক্ষে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীনের নীতি বাঙালীর আকাক্সক্ষাবিরোধী হলেও সেসব দেশের গণমাধ্যমের ঐকান্তিক ভূমিকার সুবাদে বাংলাদেশের পক্ষে দ্রুত জনমত গড়ে ওঠে। এসব সাংবাদিকের সাহসী ভূমিকার ফলে বিশ্বের প্রায় সব গণমাধ্যমেই পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানীদের মানবতাবিরোধী অপরাধের খবর বস্তুনিষ্ঠভাবে উপস্থাপনা করা হয়।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ‘বল্টিমোর সান’ এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘অবস্থা সৈন্যদের নিয়ন্ত্রণে’। একই তারিখ নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘সেনাবাহিনী কর্তৃক বিদেশী সাংবাদিক বহিষ্কার’। একই পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ট্যাঙ্কের বিরুদ্ধে লাঠি’। একই বছরের ৩০ মার্চ বল্টিমোর সানে প্রকাশিত আরেকটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘ইয়াহিয়ার পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ পূর্ব-পরিকল্পিত’। এই প্রতিবেদনে পাকিস্তান সরকারের আক্রমণের পরিকল্পিত নিশার কথা ফাঁস করা হয়। একই তারিখে এই পত্রিকার আরেকটি শিরোনাম ছিল, ‘বিক্ষুদ্ধ পাকিস্তান।’ ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ ওয়াশিংটন পোস্টে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘পাকিস্তানের মর্মান্তিক ঘটনা’। একই দিনে নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ট্যাঙ্ক দ্বারা শহর ধ্বংস।’ একই দিনে ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পূর্ব পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ আঘাত।’ ১৯৭১ সালের চাপর এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বল্টিমোর সানে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘পাকিস্তানীরা বাঙালীদের নিশ্চিহ্ন করছে।’

টাইম সাময়ীকিতে ১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে এক বিদেশী কূটনীতিক বলেন, ‘সন্দেহাতীতভাবেই এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গণহত্যা শব্দটা প্রযোজ্য।’ আরেকজন পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এটা যথার্থই রক্তস্নান, সৈন্যরা চরম নির্দয়।’

বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী এক সাক্ষাতকারে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিদেশী গণমাধ্যম রেখেছিল বলিষ্ঠ ভূমিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ছিল মানবিক ও ন্যায়ের পক্ষে। তাদের সেই অবস্থান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ ভিত্তি প্রদান করেছিল বিশ্ববাসীর সামনে। তবে একাত্তরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলো সংগ্রহে আজ পর্যন্ত নেয়া হয়নি কোন উদ্যোগ।

সাংবাদিক কামাল লোহানী বলেন, ‘সমস্ত ঢাকা বিদেশী সাংবাদিকে ভরে গিয়েছিল। গণমাধ্যম সেদিন বাংলার সাধারণ মানুষের মুক্তি সংগ্রামকে পৃথিবীর মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে কাজ করেছিল।’ একাত্তরে বিভিন্ন দেশের টেলিভিশনও রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শরণার্থী শিবিরে বাঙালীর দুঃখ বেদনার কথা, গণহত্যার কথা এমনকি বীরযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতার কথা তুলে ধরে টেলিভিশনগুলো।

মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক হারুন হাবিব বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে তাদের সরকারের অবস্থানের বাইরে দাঁড়িয়ে মার্কিন ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলো ব্যাপকভাবে বড় বড় ভূমিকা পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধকে বিশ্বপর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য পশ্চিমা গণমাধ্যম কাজ করেছে।’

নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড ॥ একাত্তরে মার্কিন সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ ২৮ মার্চ নিউইয়র্ক টাইমসে ‘In Dacca, Troops use Artillery to halt revolt’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, তাতে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে নিরীহ বাঙালীর ওপর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্বরতার বর্ণনা করেন। তিনি এই সামরিক অভিযানকে আখ্যায়িত করেন ‘পাইকারি হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে। ২৫ মার্চের গণহত্যা ও ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের মুহূর্ত- দুটিরই প্রত্যক্ষদর্শী তিনি। ভারতের গণমাধ্যমগুলো ২৭ মার্চ থেকেই পাকিস্তানীদের নৃশংসতা ও বাঙালীর প্রতিরোধযুদ্ধের খবর প্রকাশ ও প্রচার করছিল। এ ক্ষেত্রে কলকাতা ও আগরতলার বাংলা পত্রিকাগুলো অগ্রণী ভূমিকা নেয়।

২৫ মার্চ রাতের ঘটনা নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘৭৫ মিলিয়ন মানুষ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য নিরস্ত্র সাধারণ নাগরিকদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানী কামান ও ভারি মেশিনগান ব্যবহার করছে… কোন সতর্কীকরণ ছাড়াই বৃহস্পতিবার রাতে আক্রমণ শুরু হয়। …প্রথমদিকে গোলাগুলি চলছিল বিক্ষিপ্ত, তবে রাত একটার দিকে তা জোরদার ও বিরামহীন হয়ে ওঠে…। ….বিদেশী সাংবাদিকরা সবাই অবস্থান করছিল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। …. হোটেলের আশপাশে গোলাগুলি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং রাত একটার দিকে গোটা শহরেই গুলিবর্ষণের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।’

খবরে ওঠে এল এক রক্তাক্ত বাংলাদেশের কথা ॥ পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আনা আট সাংবাদিকের মধ্যে সাতজন তাদের চাহিদা অনুসারে প্রতিবেদন করলেও তাতে বাদ সাধেন মাসকারেনহাস। করাচী ফিরে তিনি ১৮ মে লন্ডনে হাজির হন সানডে টাইমসের দফতরে। সেখানে পূর্ব বাংলার পরিস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি। প্রতিবেদনে তিনি লেখেন, ‘পূর্ব বাংলার শ্যামল প্রান্তরজুড়ে আমি আমার প্রথম চাহনিতেই জমাট রক্তপুঞ্জের দাগ দেখতে পেয়েছিলাম। এই সংঘবদ্ধ নিপীড়নের শিকার কেবল হিন্দুরাই নয়, হাজার হাজার বাঙালী মুসলমানও এ নির্মমতার শিকার।’ একাত্তরের ১৩ জুন সানডে টাইমস দুই পৃষ্ঠাজুড়ে মাসকারেনহাসের প্রতিবেদনটি ছাপে। শিরোনাম ছিল এক শব্দের, ‘জেনোসাইড’। পরবর্তী সময়ে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সানডে টাইমসের সম্পাদক হ্যারল্ড ইভান্সকে বলেছিলেন, লেখাটি তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগে মাসকারেনহাস পাকিস্তানে গিয়ে তার স্ত্রী-সন্তানদের বের করে আনেন।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ লন্ডনের ‘দ্য অবজারভার’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়, ‘রাশিয়া বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে পারে। মস্কো উপলব্ধি করতে পেরেছে, পরাশক্তিগুলো যদি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়, তবে পাকিস্তানের গণহত্যা বন্ধ হতে পারে’।

২৫ মার্চে এক প্রতিরোধ যোদ্ধার গল্প ॥ ‘উই আর এ্যাটাকড বাই পাক আর্মি, ট্রাই টু সেভ ইওরসেলভস’- ২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদারদের আক্রমণে পড়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স থেকে সারাদেশে এই বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ওয়্যারলেস অপারেটর শাহজাহান মিয়া। এই শাহজাহানরাই সেই রাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে ট্যাংক, কামান আর হেভি মেশিন গানের প্রথম জবাবটা দিয়েছিলেন; প্রতিরোধযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন অন্তত দেড় শ’ পুলিশ।

বর্তমানে নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার এই বাসিন্দা জানান, সেদিন তিন ঘণ্টাব্যাপী সেই যুদ্ধের দৃশ্যপট এখনও চোখে ভাসে, যেন কিছুক্ষণ আগে ঘটা কোন ঘটনা। তিনি বলেন, প্রতিরোধ যুদ্ধ শেষে ধরা পড়ার পর তিনদিন তাদের কাটাতে হয় রাজারবাগে; নির্মম নির্যাতন আর অনাহারের দিনগুলো মনে এলে এখনও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ১৯৬৯ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে যোগ দেন তিনি।

২৫ মার্চের রাতের বর্ণনা দিয়ে শাহজাহান মিয়া বলেন, ওই রাত ছিল ভয়াবহ এক কালরাত। সারাদিন ছিল থমথমে। ঢাকা শহর ছিল উত্তপ্ত। বিভিন্ন সূত্রে রাজারবাগে বিভিন্ন ধরনের খবর আসছিল। বিশেষ করে রাত ৮টার দিকে সিদ্দিকনগরের আওয়ামী লীগ সভাপতি গাজী গোলাম মোস্তফার ছোট ছেলে আমাকে খবর দেন, তিনি তখন ছিলেন নিউ সার্কুলার রোডে। তিনি জানান ক্যান্টনমেন্টে সাজসাজ রব। তারা ঢাকা অভিমুখে আসছেন, আজকে রাতে।

এ খবর পেয়েই পোশাক পরা আমরা ২০/২৫ পুলিশ সদস্য রাজারবাগের দিকে দৌড়ে যাই। রাজারবাগে রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোটরসাইকেল শেখ কামাল এসে খবর দিল আমি শেখ কামাল। বঙ্গবন্ধুর সন্তান। উনি (বঙ্গবন্ধু) খবর পাঠিয়েছেন রাতে পাকিস্তানী সেনারা রাজারবাগ আক্রমণ করবে, আপনারা প্রতিরোধ করবেন। দুটি সূত্র থেকে পাওয়া খবর মিলে যাওয়ার পরই রাজারবাগে প্রতিরোধের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল।

তিনি জানান, আমরা অন্তত দেড় শ’ পুলিশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম প্রতিরোধ গড়ে তুলব। এজন্য অস্ত্রের দরকার। গেলাম আর এ মোরশেদ সাহেবের বাসায়। তিনি তখন অস্ত্রাগারের চাবি দিতে অস্বীকৃতি জানান। এক রকম জোর করেই তার থেকে অস্ত্রাগারের চাবি নিয়ে নেই ও নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেই। রাত সোয়া ১০টার দিকে তেজগাঁওয়ের একটি পেট্রল পার্টি থেকে খবর পাই প্রায় ৩৭ ট্রাকে করে ক্যান্টনমেন্ট থেকে পাক সেনারা ঢাকায় প্রবেশ করছে। খবর পেয়ে রাজারবাগে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। রাজারবাগে পাগলা ঘণ্টা বেজে উঠল। ব্যারাকে থাকা পুলিশ সদস্যরা অস্ত্র চাই অস্ত্র চাই বলে চিৎকার করছিল। অস্ত্রাগারের তালা শাবল দিয়ে ভেঙে অস্ত্র নিয়ে পুলিশ পজিশন নিল। শাহজাহান জানান, পাক সেনারা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে প্রথমে ডন হাই স্কুলের ছাদ থেকে গুলি ছোড়া হয়। একজন পাক সেনা সেখানে নিহত হন ও একজন আহত হন। রাত তখন ১২টা হবে। যুদ্ধ চলছিল। এরপর আমি বার্তা দেই।

শাহজাহান জানান, প্রতিরোধের মুখে রাত আড়াইটা পর্যন্ত পাক সেনারা রাজারবাগে ঢুকতে পারেনি। রাত ১১টার দিকে পাক সেনারা শান্তিনগর অতিক্রম করার পর থেকে প্রায় সারারাত যুদ্ধ চলে। চারটা ব্যারাক আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল, একটা টিনশেডের রেশন ঘর ছিল। রাজারবাগের দুইটা গেট ভেঙে ফেলেছিল। এলোপাথাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। অন্তত দেড় শ’ পুলিশ মারা যায়। তাদের লাশ নিজেদের ট্রাকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরবর্তীতে গায়েব করে ফেলে।

…পরে তাদের গুলি করে হত্যা করা হয় ॥ এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ বইতে ৮৭ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘২৬ মার্চ সন্ধ্যার দিকে পাকিস্তান রেডিওতে জাতির উদ্দেশে এক ভাষণে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তার আলোচনার ব্যর্থতার জন্য আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ দায়ী করে সারা পূর্ব পাকিস্তানে সম্পূর্ণ সামরিক শাসন জারি করেন। ওই ভাষণে শক্তি প্রয়োগের আদেশ প্রদান এবং একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ দলকে বেআইনী ঘোষণা করার কথাও উল্লেখ করা হয়। ২৭ মার্চ ভোর সকালে রেডিও ও মাইকে বারবার ঘোষণা করা হয় যে, ওইদিন সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত কার্ফু শিথিল করা হবে। সব সরকারী, আধা-সরকারী, ও স্বায়ত্তশাসিত দফতর ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থালে যেতে হবে।’ অর্থাৎ ২৫ মার্চ মুক্তিকামী মানুষের উপর বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালানোর পরদিন ইয়াহিয়া খান দম্ভের সঙ্গে এসব কথা বলেন।

বইতে আরও বলা হয়, ‘পরে জানতে পারি যে, পাকিস্তান সৈন্যরা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিসৌধ শহীদ মিনার বিধ্বস্ত করেছে। ইকবাল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক) হলে ৫০-৬০ জন ছাত্রসহ হলের নিম্নশ্রেণীর কর্মচারীদের গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে নৃশংসভাবে হত্যাকরা হয়েছিল। জগন্নাথ হলে শতাধিক ছাত্রকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। ২৬ তারিখ দিনের বেলায় ওই সব নিহত ছাত্রের দেহগুলো হলের সামনের মাঠে জ্বালানি কাঠের মতো স্তূপকৃত করে রাখা অবস্থায় দেখা গিয়েছিল। রাতে মৃতদেহগুলোকে কবর দেয়ার জন্য কয়েকজন ছাত্রকে দিয়ে বৃহৎ গর্ত খোঁড়ানো হয়। পরে তাদের গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন চত্বরে একটি ক্যান্টিন চালাতেন সর্বজন পরিচিত ‘মধু দা’। তার দু’কন্যা, এক পুত্র ও স্ত্রীসহ তাকেও গুলি করে হত্যা করেছিল পাকিস্তানী সৈন্যরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বাস ভবনগুলোয় ঢুকে অধ্যাপক ডঃ গোবিন্দচন্দ্র দেবসহ ১১ অধ্যাপক ও প্রভাষককে পাকিস্তানী সৈন্যরা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল ২৫ মার্চের মধ্যরাতের পর। দৈনিক ইত্তেফাকের অফিসসহ সবকিছু জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল।’

মুক্তিযুদ্ধের গবেষক অস্ট্রিক আর্যুর লেখা ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, ২৪ মার্চ বুধবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার বাস ভবনের সম্মুখে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে ভাষণদানকালে বলেন-‘ লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি এবং তাদের অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে। যে কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকিয়া আন্দোলন চালাইয়া যাওয়ার জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান’। শেখ মুজিব বলেন, ‘আরও প্রচণ্ড সংগ্রামের আদেশ দেয়ার জন্য আমি বাঁচিয়া থাকিব কি-না জানি না। কিন্তু আপনারা নিজেদের অধিকারসমূহ প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অবশ্যই সংগ্রাম অব্যাহত রাখিবেন’।

২৪ ও ২৫ মার্চ সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে শেখ মুজিব ২৭ মার্চ সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ২৫ মার্চের এই আহ্বান পাকিস্তান টাইমস লিখল ‘Sheikh Mujibur Rahman today gave a call for a genaral strike throught ‘Bangladesh’on March 27th as a mark of protest against heavy firing upon the civilian population in Saidpur, Rangpur-Joydevpur…।’

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT