ঢাকা, বুধবার ২০ জানুয়ারি ২০২১, ৭ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

প্রতিমার সাজ-পোশাক, জরি চুমকিসহ মাঙ্গলিক সামগ্রীর পসরা

প্রকাশিত : 11:15 AM, 21 October 2020 Wednesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

পূজা ঢাকাজুড়েই হয়। তা যতই হোক, দর্শনার্থীদের বিশেষ টানে শাঁখারী বাজার। পুরান ঢাকার সরু গলিতে কাঁঠালের কোষের মতো ঘনবদ্ধ হয়ে আছে দোকানপাট। প্রায় সব দোকানেই বাহারি পণ্যের পসরা। প্রতিমার সাজ-পোশাক মাথার মুকুট জরি মতি চুমকি সব আছে। আছে ম-প ও তোরণ সাজানোর নানা উপকরণ। মৃৎশিল্প ও শোলা শিল্পের নিদর্শন চোখে পড়ে। মাঙ্গলিক সামগ্রীর বড় বাজার থেকে এখন পছন্দ মতো কেনাকাটা করছেন পূজারীরা। আর সাধারণ দর্শনার্থীরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন মনের আনন্দে। সব মিলিয়ে জমজমাট শাঁখারী বাজার।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাচীন গলিতে শাঁখারীরাই বসবাস করেন শুধু। শাঁখারী মানে, যারা শাঁখা তৈরি করেন। এ সম্প্রদায়ের নামেই শাঁখারী বাজার নামকরণ করা হয়েছে। যতদূর তথ্য, সতেরো শতকে মোঘলদের সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন এ সম্প্রদায়ের লোকেরা। সেই থেকে এখনও একই জায়গায় আছেন। শাঁখা বা শঙ্খ শিল্পের কাজই মূলত করতেন। করতেন বলার কারণ, এখন বিচিত্র পণ্য সামগ্রী বেচাকেনা হয় এখানে। দুর্গা পূজার সময়টা ধরা দেয় সবচেয়ে বেশি রঙিন হয়ে। এখন ঠিক সে সময়টাই চলছে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে উৎসব। চলবে মঙ্গলবার পর্যন্ত। তার আগে বলা চলে, প্রাক উৎসব শুরু হয়েছে শাঁখারী বাজারে। এবার, হ্যাঁ, করোনার কাল। সব কিছুই এলোমেলো হয়ে গেছে। বিক্রি কমেছে শাঁখারী বাজারেও। তবে উৎসবের আমেজটা ঠিক টের পাওয়া যায়। কেনাকাটার মধ্য দিয়েই দৃশ্যমান হচ্ছে উৎসব।

সাজ ঘর নামের একটি দোকানের সামনে মাথার মুকুট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রথম দেখায় যাত্রাপালার রাজা বাদশাহদের কথাই মনে পড়ে। কিন্তু দোকানি কৌশিক জানালেন, এটি গণেশের মাথায় পরানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। দেবী দুর্গাসহ অন্য দেব দেবীর মুকুটও এখানে পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

মা বাসন্তী ভা-ার নামের আরেক দোকানে সবার চোখের সামনেই তৈরি হচ্ছে মুকুট। চার-পাঁচ জনের মতো কারিগর। সবাই ব্যস্ত। চোখের সামনে কাগজ কাটছেন তারা। শক্ত কাগজের ওপর আঠা দিয়ে পুঁথি পাথর জরি বসানোর কাজ করছেন। দেখতে দেখতেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে মুকুট। দোকানের মালিক শঙ্কর বললেন, এসব মুকুট কাছাকাছি দেখতে হলেও ডিজাইন ও নামের দিক থেকে ভিন্নতা আছে। কোনটির নাম বাংলা চূড়া বা ওরিয়েন্টাল। কোনটির নাম লক্ষ্মীবাংলা।

শাঁখারী রাজারে পাওয়া যাচ্ছে শাড়ি চুরি চুলের রঙিন ফিতাও। এসবের ক্রেতা কিন্তু নারী নয়, পুরুষ! পুরুষেরা পছন্দ করে কিনছেন। কারণ তারাই সাজাবেন দেবীদের। পোশাক ঘর নামের একটি দোকান তেমন শাড়িতে ভর্তি। চুমকি, কারচুপি, সুতার সুন্দর কাজ করা হয়েছে। দোকানের মালিক স্বপন জানালেন, শাড়িগুলো বিভিন্ন মাপের। প্রতিমার মাপ অনুযায়ী কেটে বিক্রি করা হয়।

আশীষ কুমার নামের এক পূজারী এসেছিলেন ফরিদপুর থেকে। বললেন, আগে তো সুতি শাড়ি পরিয়ে দিলেই হতো। এখন সবাই একটু সুন্দর করতে চায়। দেবী দুর্গা সরস্বতী ও লক্ষ্মীকে একটু গর্জিয়াস করতে তিনি নিজেও দুটি করে শাড়ি কিনেছেন বলে জানান।

ম-প তোরণ ইত্যাদি সাজানোর জন্য দোকানে দোকানে রাখা হয়েছে শোলা দিয়ে তৈরি নানা জাতের ফুল, মালা। তাজা পদ্ম বিক্রি হচ্ছে ফুটপাথে। পাওয়া যাচ্ছে গৃহসজ্জা সামগ্রীও।

আর পূজার উপকরণের কথা তো সবার জানা। সেন ব্রাদার্স নামের একটি দেকানে কাঁসার ঘটি বাটি প্রদীপ ইত্যাদি। দোকানি বরুণ সেনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারা বছরই এগুলো কম বেশি বিক্রি হয়। তবে পূজার সময় বিক্রি যথারীতি বেড়ে গেছে।

তবে দিন শেষে শাঁখারী বাজার বিখ্যাত শাঁখা ও শঙ্খ শিল্পের নিদর্শনের জন্যই। অধিকাংশ দোকানেই শাঁখা ও শঙ্খ পাওয়া যায়। মা মনসা শঙ্খ শিল্পালয় নামের একটি দোকানে ঢুকে দেখা গেল, নানা ডিজাইনের শাঁখা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। ছোট পরিসর দোকান। তাই অতো চোখে পড়ে না। তবে ক্রেতা চাইলে চোখের সামনে সব নামিয়ে দেখানো হয়।

দোকানি সদানন্দ নাগ ৬০ বছর ধরে এই পেশায় আছেন। পেছনের স্মৃতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকের দিনে অনেক কিছুই আর আগের মতো নেই। একসময় বিবাহিত নারীরা পবিত্র জ্ঞান করে হাতে শাঁখা পরতেন। এখন শাঁখা চুড়ি কিছুই তেমন পরে না। এর পরও যারা পরেন তাদের জন্য শাঁখা তৈরি করছি আমরা। এভাবে মূলত ঐতিহ্যটা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন বলে জানান তিনি।

শাঁখা হাতে পরা হলেও, শঙ্খ পূজার জরুরী অনুসঙ্গ। পূজায় আর কিছু বাজুক বা না বাজুক, শঙ্খ বাজা চাই। শঙ্খের গা খুঁড়ে শিল্পকর্ম করা হয়। কোন কোন শঙ্খের সৌন্দর্যের কাছে নামকরা শিল্পীদের রিলিফ ওয়ার্কও যেন হার মানে। পৌরাণিক উপাখ্যানে শঙ্খের যে উল্লেখ পাওয়া যায় তাও যারপরনাই কৌতূহলোদ্দীপক। শাঁখারী বাজারের অধিকাংশ দোকানে পাওয়া যাচ্ছে শঙ্খ।

প্রবীণ কারিগর অনুপ নাগের সংগ্রহে রয়েছে বিচিত্র আকার প্রকারের শঙ্খ। কোনটির শরীর কেটে মহাভারত বা রামায়নের চরিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, কোনটিতে দেবী দুর্গার প্রতিমা। কিন্তু বিক্রি কেমন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, করোনার কারণে একটু মন্দা। তবে মায়ের আশীর্বাদ থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে।

সব ঠিক হয়ে যাক। প্রতিবারের মতোই উৎসবে মাতুক শাঁখারী বাজার।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT