ঢাকা, রবিবার ০৯ মে ২০২১, ২৬শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

পেট্রোল পাম্পে চলছে ওজনে ডিজিটাল কারচুপি

প্রকাশিত : 01:27 PM, 10 October 2020 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

অভিনব কায়দায় রাজধানীর পেট্রোল পাম্পগুলোতে ওজন পরিমাপে চলছে ডিজিটাল কারচুপি। এই কারচুপির কারণে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত হচ্ছে ভোক্তা বা যানবাহন মালিকরা। বিএসটিআইয়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে গড়ে প্রতিটি পেট্রোল পাম্প থেকে প্রতি ১০ লিটারে প্রায় ৫শ’ মিলিলিটার তেল ওজন কাচুপির মাধ্যমে চুরি করা হচ্ছে। অথচ পরিমাণ অনুয়ায়ী ৫ মিলিলিটার বেশি অথবা কম যাওয়ার কথা। তেল পরিমাপের মেশিনে (গিলবার্কো ডিসপেন্সিং ইউনিট) পয়েন্ট বাড়িয়ে নিয়মিত এই কারচুপি হচ্ছে। কিন্তু ভোক্তা বা পরিবহন মালিক এই ডিজিটাল কারচুপির টিকিটিও কখনও ধরতে পারেন না। বুঝতেও পারেন না। আবার অনেক সময় ত্রুটিপূর্ণ ডিসপেন্সিং ইউনিটগুলোর মাধ্যমে তেল বিক্রি করছে। যার কারণে যানবাহন মালিক সঠিক ওজন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, এই ডিসপেন্সিং ইউনিটে বিএসটিআই, তেল কোম্পানি, পাম্প মালিকদের উপস্থিতিতে ওজন পরিমাণ নির্ধারণ করে বিএসটিআইয়ের সিল দেয়া হয়। সিল দেয়ার পর অনেক পাম্প মালিক এই মেশিনের পয়েন্ট বাড়িয়ে দেন। ফলে তেল বিক্রির সময় দ্রুত কাউন্ট হয়। কিন্তু ওজনে তেল কম যায়। এছাড়া বিএসটিআইয়ের সিল করা এই মেশিন ছাড়া অনেকে অবৈধভাবে সিলবিহীন মেশিন ব্যবহার করে থাকে। অথচ এ ধরনের কার্যক্রমে ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা জানায়, গড়ে প্রতিদিন একটি পাম্প ৩৬ হাজার লিটার তেল বিক্রি করে থাকে। এই কাচুপির মাধ্যমে প্রতিদিন তারা ২ হাজার লিটার ওজনে কম দিচ্ছে।

আধুনিক সভ্যতার অন্যতম ধারক-বাহক হলো জ্বালানি তেল। গৃহস্থালী কাজ থেকে শুরু করে সেচকাজ, বিদ্যুত উৎপাদনসহ সব কাজেই এই জ্বালানি তেল ছাড়া একদিনও চলে না। রাজধানীসহ সারাদেশে প্রতিদিন লাখ লাখ পরিবহন চলে এই তেলের ওপর। এক হিসাবে দেখা গেছে রাজধানীতেই প্রতিদিন ১৬ লাখ যানবাহন চলাচল করে। এর বাইরে সারাদেশে পরিবহনের সংখ্যা রয়েছে ৪৫ লাখ। প্রতিদিন তেল ছাড়া এসব পরিবহনের চাকাও ঘোরে না। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে স্থাপিত তেল পাম্প থেকে প্রতিদিন যানবাহনগুলোর তেল সংগ্রহ করেই চলতে হয়। এছাড়া প্রতিটি সড়ক মহাসড়কের পাশের যানবাহনের তেলের জন্য রয়েছে হাজার হাজার তেল পম্প।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা আবু সাঈদ জানান, তেল পাম্পগুলোর মালিক, তেল কোম্পানি এবং বিএসটিআইয়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ওজন বা পরিমাপ ঠিক করে দেয়া হয়। যানবাহনের তেল পরিমাপের জন্য তেল পাম্পগুলোতে এক ধরনের পিনিয়াম মেশিন বা তেল পরিমাপক মোটর ব্যবহার করা হয়। তিনপক্ষের উপস্থিতিতে চুক্তির মাধ্যমে পরিমাপক ঠিক করা হয় গিলবার্কো ডিসপেন্সিং ইউনিটে। একবার পরিমাপ করে দেয়ার পর মেশিনের বিএসটিআইয়ের সিল দেয়া থাকে। এমনভাবে এটা নির্ধারণ করা হয় যাতে ডিজিটাল পদ্ধতির তেল পরিমাপের সময় ১ লিটারে বড়জোর ৫ মিলিলিটার তেল বেশি যাবে। আথবা কখনও এই পরিমাণ তেল কম যাবে। এর কমবেশ কখনো হওয়ার কথা নয়। কিন্তু চুক্তির পরেই পাম্প মালিকরা ডিসপেন্সিং ইউনিট (তেল পরিমাপক) মেশিনের পয়েন্ট বাড়িয়ে ওজন পরিমাপে কারচুপি করে। তিনি জানান, সব পক্ষের উপস্থিতিতে সঠিক তেল পরিমাপের জন্য একটি পয়েন্ট নির্ধারণ করে দেয়া হয়। এই পয়েন্ট মূলত নির্ধারণ করা হয় একটি নির্ধারিত সময়ে কতটুকু তেল যাচ্ছে। পরে পাম্প মালিক কর্তৃপক্ষ এই পয়েন্টে একটু বাড়িয়ে দেয়। এতে সময় দ্রুত কাউন্ট হয়। বিপরীতে তেলের পরিমাণ কম যায়। ফলে দেখা যায় বেঁধে দেয়া নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে তেলের পরিমাণ অনেক কম যায়।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা জানান, এটা এমন এক ডিজিটাল কারচুপি যা অভিযান চালিয়েও প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। দেখা গেছে একটি পাম্পে অভিযান চালিয়ে ওজন কারচুপি পাওয়া গেল। কিন্তু এর আশপাশে আবার অভিযান চালানো হলে দেখা যায় ওজন ও পরিমাণ ঠিক রয়েছে। একটি অভিযানের সময় আশপাশের পাম্পগুলোতে বার্তা চলে যায়। খবর পেয়ে তারা মেশিনের কারচুপি আবার ঠিক করে। কিন্তু অভিযান থেমে গেলে আবারও শুরু হয় কারচুপি।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পেট্রোল পাম্পগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে ওজনে কম দেয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে হরহামেশায়। ঢাকাতে অবস্থিত এইসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাম্পগুলো প্রতি ১০ লিটারে সাড়ে ৫শ’ মিলিলিটার তেল কম দিচ্ছে। তারা জানায়, প্রতিদিন একটি পেট্রোল পাম্প ৩৬ হাজার লিটার পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল বিক্রি করে থাকে। এই হিসেবে ৩৬ হাজারের মধ্যে প্রায় ২ হাজার লিটার তেল চুরিই করছে তারা।

তারা জানান, অভিযানে তেল পাম্পগুলোতে এমন পুকুর চুরির ঘটনা প্রমাণ হলে ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন-২০১৮ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের সিলগালা করে দেয়ার বিধান রয়েছে। প্রতিবছর একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হলেও পরিস্থিতির কোন উন্নতি হচ্ছে না। এটা এমন এক কারচুপি যা ভোক্তা কখনও ধরতে পারে না। বুঝতে পারে না ওজনে তেল কম দেয়া হচ্ছে। তারা নিয়মিত কাচুপির করে যাচ্ছে এটা কেবল অভিযানের সময়ই ধরা পড়ে।

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা মইনুদ্দিন মিয়া জানান, সম্প্রতি রাজধানীর মহাখালী এলাকায় অভিযান চালিয়ে ওজন ও পরিমাপে কারচুপি অপরাধে ২টি পেট্রোল পাম্পকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিএসটিআইয়ের ভ্রাম্যমাণ আদালত গিয়ে দেখতে পায় মেসার্স তশোফা এন্টারপ্রাইজ জ্বালানি তেল পরিমাপে ২টি ডিসপেন্সিং ইউনিটে প্রতি ১০ লিটার অকটেনে ৯০ মিলি ও ডিজেল ৭০ মিলি লিটার করে কম প্রদান করছে। একই এলাকার মেসার্স রয়েল ফিলিং স্টেশন এর আন্ডার গ্রাউন্ড স্টোরেজ ট্যাঙ্কের হালনাগাদ ক্যালিব্রেশন চার্ট না থাকায় ‘ওজন ও পরিমাপ মানদন্ড আইন-২০১৮’ অনুযায়ী পেট্রোল পাম্প দুইটিকে ৫০ হাজার করে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এছাড়াও ত্রুটিপূর্ণ ডিসপেন্সিং ইউনিটগুলোর সাহায্যে জ্বালানি তেল সরবরাহ/বিক্রয় বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারির তেল পেট্রোবাংলার মাধ্যমে পদ্মা, মেঘনা যমুনা কোম্পানি সারাদেশে তেল সরবরাহ করে থাকে। তেল পাম্প মালিকরা প্রথমে জায়গা নির্ধারণ করে সরবরাহকারী এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে থাকে। এরপর পাম্প প্রতিষ্ঠার জন্য মালিকরা বিএসটিআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে থাকে। বিএসটিআইয়ের অনুমোদনের জন্য জ্বালানি, বিস্ফোরক অধিফতরে ছাড়পত্র দেখাতে হয়। এছাড়া সংশ্লিষ্ট তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে সঙ্গে করা চুক্তির কপিও দেখাতে হয়। এছাড়া আন্ডার গ্রাউন্ড স্টোরেজ বা তেল রাখার টাঙ্কিও বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে হালনাগাদ করে নিতে হয়। টাঙ্কির ওজর পরিমাণ বিএসটিআইয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করে হালনাগাদ করা বিধান রয়েছে।

এটি সম্পন্ন হলে তিন পক্ষে চুক্তি অনুযায়ী তাদের উপস্থিতি ডিসপেন্সিং ইউনিটে ওজন পরিমাপ নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। নির্ধারিত ওই মাপে তেল ওজন পরিমাপের কম বেশি হয় না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই চুক্তির লঙ্ঘন করা হয়। যা আইন অনুযায়ী অপরাধ। কিন্তু বেশিরভাগ তেল পাম্প অসাধু কাজের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ওজন পরিমাপে কম দিচ্ছে। কিন্তু ভোক্তা প্রতারিত হলেও কখনও তিনি বুঝতে সক্ষম হন না।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT