ঢাকা, মঙ্গলবার ১১ মে ২০২১, ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

নারকোটিক্সের ঘুষের হাটে সাঁড়াশি অভিযান প্রাইজ পোস্টিংয়ে তদবির করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

প্রকাশিত : 12:55 PM, 6 September 2020 Sunday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (নারকোটিক্স) চিরাচরিত ঘুষের হাটে এবার বাদ সেধেছেন সদ্য যোগ দেয়া মহাপরিচালক। তিনি সরকারের এ গুরুত্বপূর্ণ দফতরে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে অভিনব শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন।

এতদিন প্রভাবশালী মহল দিয়ে তদবির করে প্রাইজ পোস্টিং বাগিয়ে নেয়া সহজ হলেও এখন উল্টো শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। একইভাবে বার লাইসেন্স পেতে নির্ধারিত নিয়মে আবেদনপত্র জমা দেয়ার পর কেউ তদবির করে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করলে সেটিকে বিশেষ তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।

কারণ নতুন ডিজির সাফ কথা, কোথাও কোনো তদবির লাগবে না। সব কিছু নিয়মমাফিক সময়মতো হবে। নারকোটিক্সের ডিজি আহসানুল জব্বার বৃহস্পতিবার নিজ দফতরে যুগান্তরের কাছে তার এমন সব সাহসী চিন্তা ও উদ্যোগের কথা সাবলীলভাবে তুলে ধরেন।

প্রায় এক মাসের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে যুগান্তরকে তিনি বলেন, মাদক নির্মূলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত জিরো টলারেন্স নীতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করাই হবে অন্যতম কাজ। তবে এ প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কিছু অলিখিত সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি।

তা না হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ পদে পদে বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি মনে করেন, নারকোটিক্সের প্রধান এবং একমাত্র কাজ হবে মাদক নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে সমাজের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনা। এ লক্ষ্য নিয়ে তিনি ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছেন।

তিনি বলেন, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগসূত্রতার পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নারকোটিক্সের কতিপয় অসাধু কমকর্তা-কর্মচারী ঘুষ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে অধিদফতরের আওতাধীন পণ্যাগারগুলোতে (ওয়্যারহাউস) অভিনব উপায়ে ঘুষ বাণিজ্য চলে আসছে।

প্রথমেই কঠোরহস্তে এসব বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছি। এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, শুদ্ধি অভিযান কিনা বলতে পারব না। তবে যা করণীয় তাই করছি। আকস্মিক পরিদর্শনসহ আরও কিছু অ্যাকশান প্ল্যান বাস্তবায়নের পথে।

সূত্র জানায়, নওগাঁর শান্তাহার পণ্যাগারে একজন ইন্সপেক্টরের পোস্টিংয়ের জন্য জনৈক অতিরিক্ত সচিব সম্প্রতি তদবির শুরু করেছেন। সেখানে পোস্টিং পেলে ওই ইন্সপেক্টর নাকি মাসে বেতন ছাড়াই ৮-৯ লাখ টাকা বাড়তি আয়ের সুযোগ পাবেন।

এছাড়া ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের ৪-৫ টি সার্কেলে পোস্টিং পেতেও তদবির শুরু হয়েছে। পছন্দের ইন্সপেক্টরকে প্রাইজ পোস্টিং পাইয়ে দিতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো প্রভাবশালীর ফোন আসছে।

পোস্টিং ছাড়াও বার লাইসেন্স পাইয়ে দিতে প্রভাবশালীদের ফোন রীতিমতো বিড়ম্বনার পর্যায়ে পৌঁছেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের আওতাধীন পণ্যাগারগুলোতে অভিনব উপায়ে ভেজাল মদ বিক্রির মাধ্যমে লাখ লাখ টাকা অবৈধ আয়ের রেওয়াজ চলছে বহুদিন ধরে।

রাতের অন্ধকারে মদের ড্রামে পানি মিশিয়ে বিক্রি করে আসছে অসাধু চক্র। কেরু অ্যান্ড কোং কোম্পানির দায়িত্বপ্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট এজেন্টের যোগসাজশে এ অপকর্ম চলে আসছে।

বিশেষ করে শান্তাহার, শ্রীমঙ্গল, ময়মনসিংহ, খুলনা, যশোর, ঢাকা, ফরিদপুর ও চট্টগ্রাম পণ্যগারে অবৈধ আয়ের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। এসব পণ্যগার থেকে সংশ্লিষ্ট নারকোটিক্স ইন্সপেক্টরের অবৈধ উপার্জন প্রতি মাসে ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত।

এজন্য পণ্যগারে মোটা অংকের ঘুষ দিয়ে পোস্টিং পেতে ইন্সপেক্টরদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়। অনেকে ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে এক পায়ে প্রস্তুত থাকেন।

এছাড়া নারকোটিক্সের আওতাধীন বার, ডিউটি ফ্রি শপ ও বাংলা মদের দোকান থেকেও নিয়মিত লাখ লাখ টাকা মাসহারা আদায়ের রেওয়াজ নতুন কোনো বিষয় নয়।

এটা অনেকটাই প্রতিষ্ঠিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এমনকি মদ পানের সরকারি পারমিট ইস্যুর নামে ঘুষ আদায় করেন সংশ্লিষ্ট সার্কেল ইন্সপেক্টররা।

যে সার্কেলে যত বেশি মদের বার সেই সার্কেলে তত বেশি ঘুষ খাওয়ার সুযোগ। প্রতি বছর জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩ মাসে লাইসেন্স নবায়ন ও পারমিট ইস্যুর মৌসুমে কয়েকটি সার্কেলে অর্ধকোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হয়।

এ টাকার ভাগ নারকোটিক্সের উপর মহলের অনেক বড় বড় কর্মকর্তার টেবিলেও পৌঁছে যায়। অতীতে বেশ কয়েকজন ডিজির নামে মাসহারা আদায়ের অকাট্য প্রমাণও রয়েছে। এছাড়া মাদক বেচাকেনার চিহ্নিত স্পট থেকেও নারকোটিক্স কর্মকর্তারা নিয়মিত মাসহারা আদায় করেন বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, ঘুষ বা উপরি আয়ের সুযোগ আছে এমন লাভজনক জায়গায় পোস্টিং পেতে প্রভাবশালীদের মনোরঞ্জনের কমতি রাখেন না নারকোটিক্সের অসাধু কর্মকর্তারা।

অনেকে গভীর রাতে বিদেশি ব্র্যান্ডের দামি মদের বোতল নিয়ে প্রভাবশালীদের বাসায় হাজির হন। এরপর মদসহ বিভিন্নভাবে ম্যানেজ করে নারকোটিক্স ডিজির কাছে ফোন করানো হয়।

সমাজের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় থেকে ফোন আসে যে ডিজির পক্ষে তা উপেক্ষার সুযোগ থাকে না। এভাবে একবার পোস্টিং বাগিয়ে নিতে পারলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় না।

কারণ প্রভাবশালী লিংকের কারণে ডিজি নিজেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সমীহ করে চলেন। ফলে দাফতরিক চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।

একপর্যায়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কোনো আদেশকে তারা আর পাত্তা দিতে চান না। প্রাপ্ত তথ্যগুলো অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হলেও এটিই চরম সত্য।

সূত্র জানায়, গোটা মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরে এ ধরনের বেপরোয়া কর্মকর্তার সংখ্যা হাতেগোনা ৭-৮ জনের বেশি নয়। তবে এদের দাপটে সারা বছর পুরো অধিদফতর অতিষ্ঠ থাকে।

যাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়ায় কারণে সাবেক কয়েকজন ডিজিকে হেনস্তা হতে হয়েছে। এমনকি দুদকে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েও হয়রানি করানোর নজির রয়েছে।

অথচ কথিত প্রভাবশালী এসব কর্মকর্তা বছরের পর বছর মাদকবিরোধী অভিযানে যান না। এমন বেশ কয়েকজন ইন্সপেক্টর আছেন যারা বছরে ১০টি মামলাও করেননি।

অথচ প্রাইজ পোস্টিং ঠিকই বাগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু ইন্সপেক্টর নয়, নারকোটিক্সের বেশ কয়েকজন সহকারী পরিচালক (এডি), উপ-পরিচালক ও অতিরিক্ত পরিচালকের বিরুদ্ধেও ঘুষ বাণিজ্যের বিস্তর প্রমাণিত অভিযোগ রয়েছে।

লাইসেন্সকৃত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তারা নিয়মিত মোটা অংকের মাসহারাও নেন। অথচ বিভিন্ন দাফতরিক মিটিংয়ে তারা নিজেদের ক্লিন ইমেজের কর্মকর্তা বলে জোর গলায় দাবি করেন।

যারা অফিসজুড়ে ঘুষখোর কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। অধীনস্ত ইন্সপেক্টরের মাধ্যমে তাদের মাসহারা আদায়ের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট।

সূত্রমতে, নবনিযুক্ত মহাপরিচালক আহসানুল জব্বার এসব ঘুষের হাটের অনেক কিছুই ইতোমধ্যে জেনেছেন। এছাড়া প্রভাবশালী মহলের নানামুখী তদবিরের মধ্য দিয়ে তিনি সব কিছু শক্ত হাতে সামাল দেয়ার চেষ্টা করছেন।

একইসঙ্গে দুর্নীতিবাজদের লাগাম টেনে ধরতে কিছু অ্যাকশন প্ল্যান হাতে নিয়েছেন। ঘুষখোর এবং তদবিরবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর শুদ্ধি অভিযানও শুরু করেছেন।

অপরদিকে যারা অপেক্ষাকৃত সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পদায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন।

কয়েকজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘এ রকম ডিজি তারা ইতিপূর্বে আর দেখেননি। প্রথমদিন একেবারে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বেতনের বাইরে বাড়তি কিছু পাওয়ার জন্য এখানে আসেননি। সারা জীবন যেভাবে ব্যাটিং করেছেন, এখানেও তার ব্যত্যয় হবে না। প্রকৃত অর্থে সাহসী না হলে শুধু সৎ কর্মকর্তা দিয়ে ভালো কিছু হয় না। তাই শেষদিন পর্যন্ত মাদক নিয়ন্ত্রণে সাহসের সঙ্গে সব কিছু মোকাবেলা করবেন।’

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT