বুধবার ০৮ ডিসেম্বর ২০২১, ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড হচ্ছে

প্রকাশিত : 10:59 AM, 12 October 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন আইন’ সংশোধন করা হচ্ছে। আজ সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে আইনটি সংশোধনের জন্য উপস্থাপন করা হচ্ছে। সংশোধনীতে যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদন্ডের বিধান সংযোজন করা হয়েছে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, প্রস্তাবিত সংশোধনী আজ সোমবার অনুষ্ঠেয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নারী ও শিশু ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ ও প্রতিকার এবং নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ প্রণয়ন করা হয়। ইতোমধ্যে ২০০৩ সালে আইনটির কতিপয় ধারা সংশোধন করা হয়। আইনটির ধারা ৯ এর উপধারা (১) এ বলা আছে, যদি কোন পুরুষ কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তা হলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত দন্ডেও দন্ডনীয় হবেন।

সমাজে নারী ও শিশু নির্যাতন কঠোরভাবে দমন এবং প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদারকরণের লক্ষ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ৯ এর উপধারা (১) এর অধীন ধর্ষণের অপরাধের জন্য ‘যাবজ্জীবন সশ্রম করাদ-’ শাস্তির পরিবর্তে ‘মৃত্যুদন্ড’ বা ‘যাবজ্জীবন করাদন্ড’ প্রতিস্থাপন করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। এ লক্ষ্যে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০’-এর খসড়া প্রস্তুত করে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে তা মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, এটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভা বৈঠকে এক নম্বর এজেন্ডাভুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে ২/১ দিনের মধ্যে এটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নোয়াখালী বেগমগঞ্জে ঘরের ভেতরে ঢুকে বিবস্ত্র করে এক নারীকে নির্যাতন ও ধর্ষণ চেষ্টার ৩২ দিন পর এই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এবং এর আগে সিলেটের এমসি কলেজে এক গৃহবধূকে তার স্বামীর সামনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করার পর সারাদেশে এ নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। শুরু হয় আন্দোলন। পুলিশ আসামিদের কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে এবং ওই নারীকে নিরাপদ হেফাজতে নিয়েছে। বেগমগঞ্জের ঘটনার পর ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের জেলা-উপজেলায় তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংগঠন। এই আন্দোলন চলার মধ্যে বেগমগঞ্জের ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার খবর প্রায় প্রতিদিন সংবাদপত্রে উঠে আসছে। এর মধ্যেই সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিল।

এই অবস্থায় সরকারের তরফ থেকে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার রাতে আইনটি সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছেন। সে মোতাবেক আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে সংশোধিত প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়েছে। আজ সোমবারে সংশোধিত আইনের প্রস্তাবনা মন্ত্রিসভায় তোলা হবে। এদিকে আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুদ-ের বিধান রাখতে আইনে যে পরিবর্তন আনা সেটা মূলত মৌলিক দুটি আইন। এর একটি হচ্ছে দন্ডবিধি আইন ১৮৬০ সালের ধারা ৩৭৫ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইন ২০০০-এর ধারা ৯। এই দুটি আইনের দুটি ধারায় সংশোধন এনে সর্বোচ্চ সাজার বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ-। আর ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে দোষী ব্যক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি হবে মৃত্যুদন্ড। এর পাশাপাশি দুই ক্ষেত্রেই অর্থ দ-ের বিধান রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ট্রাইব্যুনালে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সাতদিন থেকে এক মাস এবং মামলা নিষ্পত্তির জন্য ১৮০ দিন (ছয় মাস) সময় বেঁধে দেয়া থাকলেও বাস্তবে ওই সময়ের মধ্যে রায় দেয়া সম্ভব হয় না। এ ছাড়া ধর্ষণ এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির নজির কম। ধর্ষণের বেশিরভাগ মামলা বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় ধামাচাপা পড়ে যায়। তাছাড়া ঠিকমতো ডাক্তারি পরীক্ষা না হওয়া, সামাজিক জড়তা, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টম্বর পর্যন্ত ৯৭৫ ধর্ষণ এবং ২০৪ নারী ধর্ষণের অপচেষ্টার শিকার হন। ধর্ষণের পর মৃত্যু হয় আরও ৪৩ জনের। এছাড়াও ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেন ১২ নারী। সূত্র জানায়, ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে ৮৬২ একক, ২০৮ সঙ্ঘবদ্ধ এবং পাঁচজন কিভাবে কী কারণে ধর্ষিত হয়েছেন তার সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। ধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে আট বছরের কম বয়সী ৬৭, সাত থেকে ১২ বছর বয়সী ১৪০, ১৩-১৮ বছর বয়সে ১৪০, ১৮-২৪ বছর বয়সী ১৬ ধর্ষিত হন। অবশিষ্ট ৩৬৫ জনের বয়স জানা যায়নি।

গণধর্ষণের শিকার নারীদের মধ্যে সাত থেকে ১২ বছর বয়সী ছয়, ১৩-১৮ বছর বয়সী ৫২, ৯ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২২, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী ছয়, ১৩-১৮ বছর বয়সী ৫২, ৯ থেকে ২৪ বছর বয়সী ২২, ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী সাত এবং ৩০ বছরের বেশি বয়সী সাতজন গণধর্ষণের শিকার হন। গণধর্ষণের শিকার ১১৪ জনের সঠিক বয়সের হিসাব পাওয়া যায়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

থানা পর্যন্ত না পৌঁছানোয় প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে অধিকারকর্মীদের ধারণা। সরকারী তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে ধর্ষণের ঘটনায় ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার থেকে মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪১টি। এর মধ্যে আসামির শাস্তি হয়েছে মাত্র ৬০টি ঘটনায়। এসব কারণে ধর্ষণের অপরাধে শাস্তির মাত্রা বাড়িয়ে মৃত্যুদ-ের বিধান করার পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে বিচার ও রায় কার্যকর করার জন্য আইন সংশোধনের দাবি রয়েছে বিভিন্ন সংগঠনের। চলতি বছর জানুয়ারিতে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় এক রিট মামলায় রুল জারি করেছিল হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। ষোলো বছর বা তার কম বয়সী শিশু ধর্ষণের শিকার হলে ধর্ষকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড রেখে আইন করতে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয়েছিল সেই রুলে। বিষয়টি এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এদিকে সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নের ঘটনায় সরকারের বিভিন্ন দফতরে উকিল নোটিস পাঠিয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন সম্পাদক মোহাম্মদ ফুয়াদ হোসেন। সেখানে ধর্ষণের দ্রুত বিচারে বিশেষ আদালত গঠন এবং ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড চাওয়া হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করার দাবিকে সমর্থন জানিয়ে গত ৭ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, এদের ছোটখাটো লঘুদন্ড দিয়ে লাভ নেই। সর্বোচ্চ বিচারের যে দাবি উঠেছে, আমার মনে হয় এটা অযৌক্তিক নয়। এসব অপরাধীদের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক সামাজিক সংগঠনকে আপোসহীন মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT