বুধবার ০১ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

দশটি গুলি খেয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন সেরনিয়াবাত কন্যা হামিদা

প্রকাশিত : 08:09 PM, 17 August 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

বিভীষিকার সেই কালো রাতের দূর্বিষহ স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় হামিদা সেরনিয়াবাতকে। একটি মূহুর্তের জন্যেও ভুলতে পারেন না সেই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ দুঃসহ দৃশ্য। চোখের সামনে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া জন্মদাতা পিতার শরীর। উঁকি দেয় ১৪ বছরের কিশোরী বোন বেবী, ১০ বছরের ছোটভাই আরিফ, বড়ভাইয়ের ৪ বছরের শিশু সুকান্ত বাবুর বিদেহী আত্মা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অনার্সের ছাত্রী সেদিনের হামিদা মরতে মরতে বেঁচে গেলেও শরীরে দশ দশটি বুলেটের দগদগে ক্ষত চিহ্ন নিয়ে পথ চলেন। কিন্তু এ কেমন বেঁচে থাকা? চোখের সম্মুখে পলকে পলকে নাচে ঘাতকের উদ্যত বন্দুকের নল, নিঃশ্বাসে বারুদের গন্ধ, মনের আয়নায় ভাসে পিতার রক্তাক্ত দেহ। রক্তের প্লাবনে ভাসমান মুখগুলো। হামিদা চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে থাকেন। স্বামী আকরাম আলী খান ব্যবসায়ী। তার ভাষায় বর্ণিত হয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতের ঘটনা।

মিন্টু রোডের ২৭ নম্বরের সরকারি বাড়ি। বঙ্গবন্ধু মন্ত্রিসভার সদস্য আব্দুর রব সেরনিয়াবাত এ বাড়িতেই থাকতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি। তবে আত্মীয়ের সুবাদে নয়, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত প্রখ্যাত কৃষক নেতা এবং একসময় শেরেবাংলা একে ফজলুল হকের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। ১৯৭৫ সালে ঘাতকরা বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ছাড়াও যে দু’টি বাড়িতে হত্যাকান্ড চালায় তার একটি এই মিন্টু রোডের বাড়ি।
হামিদা সেরনিয়াবাতের ভাষায়, ঘুমে বিভোর আমরা সবাই। রাতের নিস্তব্ধতা। হঠাৎ প্রচন্ড শব্দ, ঝন ঝন করে ভেঙে পড়ছে জানালার কাঁচ। ঘুম থেকে জেগে গেছি সবাই। বৃষ্টির মতো গুলি। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। আব্বা বড় মামার (বঙ্গবন্ধু) সঙ্গে কথা বললেন। মায়ের প্রশ্নের জবাবে আব্বা জানালেন, তারও অবস্থা আমাদের মতো। সেখানেও গুলি হচ্ছে।

এবার বেবী ফোন করলো, মামা আবারও ফোন ধরলেন। বেবী বললো, মামা আমাদের বাঁচান। আর আওয়াজ পাওয়া গেলো না।
মা ফোন করলেন মনি ভাইর (শেখ ফজুলল হক মনি) বাসায়। বাবা, মনি আমাদের বাড়িতে গুলি হচ্ছে – আমাদের বাঁচাও। জবাবে মনিভাই বলেছিলেন, আমি দেখছি। কথা শেষ করার আগেই গুলির শব্দ ভেসে আসলো। মনি ভাইর বুক বুঝি বিদীর্ণ করে দিয়েছে ঘাতকের বুলেট। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়লাম।

দু’টা লোক ঢুকতেই বড় ভাই (আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ) বলে উঠলেন, খবরদার কেউ উপরে ওঠার চেষ্টা করবেন না। এর মধ্যে আরও ১০/১২ জনের একটি ঘাতকদল অস্ত্র উঁচিয়ে ঢুকে পড়লো বাসার ভেতরে। ঘাতকরা ভয় নেই বলে সবাইকে নীচে নেমে আসতে বললো। ১৪ বছরের কিশোরী বোন বেবী বলে উঠলো, ভয় পাবো কেন? আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাইনা। ভীষণ একরোখা সাহসী ছিল এই বোনটি। আমরা নামলাম সিঁড়ি বেয়ে। আব্বা আঁকড়ে ধরেছিলেন আমার হাত। এর মধ্যে উপর থেকে নান্টুও (আমির হোসেন আমুর খালাতো ভাই) ছুটে এলো। ঘাতকরা ড্রয়িং রুমে যেতে বললো সবাইকে।

একজন সৈন্য জিজ্ঞেস করলো আব্বাকে, আপনার নাম? আব্বা বললেন, আব্দুর রব সেরনিয়াবাত। মা জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি আমাদের মারতে চান? উত্তর এলো – না আপনাকে মারবো কেনো? এরপরই শুরু হলো ব্রাশফায়ার। ঠা ঠা শব্দ। শব্দের মধ্যে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলাম আব্বাকে। আব্বা উপুড় হয়ে পড়লেন মেঝেতে। আমিও লুটিয়ে পড়লাম মূহুর্তে। আমার কানের কাছে গোঙানির শব্দ.. রক্তে ভেসে গেলো ড্রয়িং রুম। পানি পানি… এরপর আর জানিনা কিছুই।

জ্ঞান ফিরে দেখলাম আমিও হাসপাতালে। শুনলাম আব্বা, বেঁচে নেই। ১৪ বছর বয়সী ছোটবোন বেবী, ১০ বছরের ছোটভাই আরিফ, বড়ভাই ৪ বছরের শিশুপুত্র সুকান্ত বাবুও নেই। এরপর হাসপাতালে বসেই শুনলাম বড় মামা (বঙ্গবন্ধু), ছোট মামা (শেখ আবু নাসের), শেখ মনি ভাই তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আরজু আপা কেউ বেঁচে নেই। শেখ কামাল, শেখ জামাল এমনকি আদরের শেখ রাসেলও নেই। কেউ বেঁচে নেই। আমার শরীরে দশটি গুলির ক্ষত। এভাবে চেতন অচেতন অবস্থায় কাটে চৌদ্দ দিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে।

পুরোপুরি যখন জ্ঞান ফিরে আসার পর জানতে পারি, আমার মা, শাহানা ভাবী (আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর স্ত্রী) ও বোন রিনা বেঁচে আছে। তারাও পাশের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। পরে শুনেছি ঘাতকরা চলে যাবার পর আমাদের নিরাপত্তা রক্ষীরা রমনা থানায় গিয়ে হাজির হয়। তৎকালীন ওসি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুলিশভ্যানে করে আমাদেরকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চক্ষু বিভাগের একটি কক্ষে বেঁচে থাকা চারজনকে রাখা হলো ১২ পুলিশ পাহাড়া বসিয়ে। আমার মেঝবোন মঞ্জু আপা ২২ দিন পর দেখা করার সুযোগ পেলেন।

তিনি মাহুতটুলিস্থ শ্বশুর বাড়িতে থাকতেন। তার কাছে শুনতে পাই বড়ভাই হাসনাত আব্দুল্লাহ চোখ ফাঁকি দিয়ে একটি কক্ষে ঢুকে পড়েছিলেন। আমার ছোটভাই খোকন হাসনাত ভাইয়ের দুই শিশুসন্তান কান্তা আর সাদেককে (বরিশালের বর্তমান মেয়র) নিয়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মঞ্জু আপার বাসায় যায়। গুলিতে মায়ের ডান ঘাড়ের হাড় ভেঙে গেছে, চিবুক কেটে গেছে। ডান হাত অকেজো হয়ে গেছে। আমার ডান পা সম্পূর্ণ অচল।

অক্টোবর মাসে শাহানা ভাবীকে রেখে মাকে এবং আমাকে ও রিনাকে ছেড়ে দিতে বললো। দুলাভাই ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের সহায়তায় আমাদের সবাইকে হাসপাতাল থেকে মুক্ত করলেন। ৩১ অক্টোবর। ২০ হাজার টাকা দিতে হলো হাসপাতালে। ৭৬ সালে চলে গেলাম ভারতে। আমার নার্ভ অপারেশন হয়। হাসু আপা দিল্লি থেকে চিঠি লিখলেন। চলে আয় আমার কাছে। চলে গেলাম মা আমি আর রিনা। ৭৮ সালে ঢাকায় ফিরে এলাম। মা স্নায়ু বৈকল্যের শিকার ছিলেন। ঘুমের ভেতরেও চিৎকার করে উঠতেন। দুরারোগ্য পারকিনসনস রোগে ভুগেছেন দীর্ঘদিন।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT