ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৮ অক্টোবর ২০২১, ১৩ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

ঢাক আর শাঁখ বাজতেই নেচে ওঠে মন

প্রকাশিত : 11:18 AM, 26 October 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

পছন্দের নক্সা অনুযায়ী প্রতিমা গড়া হলো। বিপুল অর্থ খরচ করে সাজানো হলো মণ্ডপ। সন্ধ্যায় জ্বলল মরিচবাতিও। কিন্তু ঢাকে যদি কাঠির বাড়ি না পড়ে, বেজে না ওঠে সময় মতো? যদি শাঁখে কেউ ফু না দেয়? উৎসবটা অনেকাংশেই মাটি হয়ে যাবে। ঠিক জমবে না। বিশেষ করে দুর্গাপূজায় ঢাক ও শাঁখ চাই-ই চাই। এই যেমন এখন রাজধানীর প্রায় সব মণ্ডপে ঢাক বাজছে। মাঙ্গলিক ধ্বনি তুলছে শাঁখ। তাতেই ছড়িয়ে পড়ছে আনন্দ। পূর্ণতা পাচ্ছে উৎসব।

ঢাকা ও শাঁখ ছাড়াও দুর্গাপূজায় বাজানো হয় ঢোল, ট্রাম্পেড, ঝনঝনি, মন্দিরাসহ কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র। প্রায় প্রতিটি মণ্ডপে অন্তত একটি করে যন্ত্রী দল থাকে। সব দলে সবরকম বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয় না। তবে ঢাক থাকবেই। বলা চলে অত্যাবশ্যক। পূজার প্যান্ডেলে ড্রাম বিট বাজলে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শনার্থীটিও ছুটে আসেন। অনানুষ্ঠানিক নাচ শুরু করে দেন কেউ কেউ। এভাবে ঢাক পূজার আনন্দ বাড়িয়ে দেয়। ছড়িয়ে দেয়। অন্যান্য সময় ঢাকিদের তেমন দেখা যায় না। তবে দুর্গোৎসবের মৌসুম এলে কোথা থেকে যেন বের হয়ে আসেন তারা। মণ্ডপের পরিবেশকে যারপরনাই উৎসবমুখর করে তোলেন। নিজেদের প্রয়োজনেই ঢাকিদের খুঁজে বের করেন পূজা কমিটির কর্তা ব্যক্তিরা। উপেক্ষার শিকার এই শিল্পীদের সঙ্গে আগেভাগে বায়না করে রাখেন।

অনেকে জেনে অবাক হবেন, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে ঢাকিদের একটি হাট বসে। অনেক প্রাচীন হাট। দুর্গাপূজার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকিরা সেখানে সমবেত হন। ঢাক বাজিয়ে শুনান। যে দলের বাজানো পছন্দ হয়, সে দলের সঙ্গে বায়না করেন পূজার আয়োজকরা। স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, কটিয়াদীতে এই হাটের সূচনা করেছিলেন রাজা নবরঙ্গ রায়। তখন ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগ। রাজার উদ্যোগে প্রতি বছর রাজবাড়িতে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়। এ জন্য প্রয়োজন হয় ঢাকির। শ্রেষ্ঠ ঢাকি চাই রাজার। সে লক্ষ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন তিনি। ঢাকিদের জন্য বিখ্যাত বিক্রমপুর পরগনায় খবর পাঠানো হয়। কাল বিলম্ব না করে বহু ঢাকি নদীপথে কটিয়াদী আসেন। একে একে রাজাকে বাজিয়ে শোনান। পারফর্মেন্স বিচারে শ্রেষ্ঠ দলটিকে বেছে নেন তিনি। সেই থেকে শুরু। ক্রমে এটি ঢাকের হাট নামে পরিচিতি লাভ করে। জানা যাচ্ছে, এবারও হাট বসেছিল। বায়না শেষে ঢাকিরা ছড়িয়ে পড়েছেন দেশের নানা প্রান্তে।

রাজধানী ঢাকায় এখন কয়েক শ’ ঢাকি আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। উল্লেখযাগ্য অংশ এসেছে বিক্রমপুর থেকেই। সবচেয়ে প্রাচীন ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এখন ঢাক বাজাচ্ছেন শান্তিরঞ্জন দাস। বয়স প্রায় ৭০ বছর। শরীর মাঝে মধ্যে বেঁকে বসে। কিন্তু গত ৪০ বছর ধরে বাজাচ্ছেন তিনি। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কারণেই হয়ত যন্ত্রটাকে বশে আনতে তার সময় লাগে না। বলেন, প্রতিদিনই কয়েক ঘণ্টা বাজাই। অভ্যাস আছে। টানা বাজাতে পারি। ঢাকে আরতি তাল, দশমী তাল, বিসর্জন তাল বাজান বলে জানান তিনি। কিন্তু সারা বছর কিভাবে চলে? কোথায় থাকেন আপনারা? জানতে চাইলে অবাক করে দিয়ে ঢাকি বলেন, গেরস্তি কাজ করি। তা না হলে তো চলে না! করোনারকাল বিপদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবুও উৎসবে আনন্দ যোগ করে চলেছেন ঢাকিরা।

পূজায় অত্যাবশ্যক হয়ে দাঁড়ায় শাঁখও। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা শাঁখ বা শঙ্খ ধ্বনিকে মাঙ্গলিক জ্ঞান করেন। প্রায় প্রতি ঘরেই পূজার সামগ্রীর পাশাপাশি শঙ্খ রাখা হয়। নতুন কোন কাজ শুরু করার আগ মুহূর্তে শঙ্খ বাজানোর রীতি প্রচলিত আছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় দুর্গাপূজায়। এটি বাজাতে আলাদা করে যন্ত্রীর প্রয়োজন হয় না। পূজারীরাই বাজিয়ে থাকেন। বাজানো বলতে, ফুঁ দেয়া। তাতেই বিশেষ এক ধরনের ধ্বনি তৈরি হয়। এখন সব পূজামণ্ডপ থেকে শঙ্খ ধ্বনি ভেসে আসছে। শঙ্খ সামুদ্রিক শামুকের খোলস দিয়ে তৈরি। গায়ের রং দুধের মতো সাদা। মসৃণ। শঙ্খের মুখটি বক্রাকার ছিদ্র বিশিষ্ট। ভেতরের ছিদ্র পথটিও বক্রাকার। এর সামনের অংশে মুখ লাগিয়ে ফুঁ দিতে হয়। আকৃতি প্রকৃতি বিবেচনায় শঙ্খের আলাদা আলাদা নাম হয়। এই যেমন- গোমুখ শঙ্খ, ধবল শঙ্খ, পানি শঙ্খ ও পঞ্চমুখী শঙ্খ। শাঁখের গায়ে শাঁখারীরা নিপুণ হাতে ফুল লতা পাতা দেব দেবীর ছবি ইত্যাদি খোদাই করে নেন। অনেকে আবার সোনা ও রুপার পাত বসিয়ে অলঙ্কৃত করেন। যে শঙ্খের গায়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কাজ তার দাম বেশি।

শাঁখ দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের শ্রেণীভুক্ত। দেশীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেছেন ড. আবদুল ওয়াহাব। তার বর্ণনা অনুযায়ী, শঙ্খ বাংলা তথা ভারতের বহুপ্রাচীন শুষির শ্রেণীর বাদ্যযন্ত্র। প্রাচীন বাংলার সঙ্গীত আসরগুলোতে শঙ্খতরঙ্গ বাজানো হতো। সাত বা বারো স্বরের সাতটি বা বারোটি শাঁখে আলাদা আলাদা স্বরধ্বনিত করে রাগ বাজানোর কথাও জানা যায়।

শাঁখের উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারত, রামায়ণ ও অন্যান্য পুরাণে। সে সময় এর নামেও ছিল বৈচিত্র্য। মহাভারতে কৃষ্ণের শঙ্খের নাম ছিল পাঞ্চজন্য। যুধিষ্ঠিরের শঙ্খের নাম ছিল অনন্ত বিজয়, ভিমের পৌত্র, অর্জুনের দেবদত্ত, নকুলের সুঘোসা ও সহদেবের মণিপুষ্প। বিষ্ণুর হাতেও ছিল শঙ্খ। সমুদ্র মন্থনকালে শঙ্খে বিষ নিয়ে পান করেছিলেন শিব। ভগীরথ শঙ্খ নিনাদের মাধ্যমে গঙ্গাকে মর্তে আনেন।

এভাবে পূজার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে শাঁখ বা শঙ্খ। ঢাক আর শাঁখের আওয়াজে উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে দুর্গাপূজাও।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT