ঢাকা, শনিবার ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১০ই মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

গুরুতর অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কি দেখার কেউ নেই!

প্রকাশিত : 08:55 AM, 7 November 2020 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামান দিন দিন অসুস্থতার কাছে হেরে যাচ্ছেন। তার অসুস্থতার কোন পরিবর্তন ঘটেনি। ডাক্তার তার উন্নত চিকিৎসার জন্য ভাল হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছেন। কিন্ত টাকার অভাবে পরিবারের পক্ষ তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সম্প্রতি জনকণ্ঠে তার গুরুতর অসুস্থতার বিষয় উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। ওই প্রতিবেদনের পর সরকারী বেসরকারী কোন সংস্থাই তার সাহায্যে এগিয়ে আসেনি। ব্যক্তিগতভাবেও কেউ বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামানের খবর নেয়নি। অথচ ১৯৭১ সালের রণক্ষেত্রে বীরদর্পে পাকিদের একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত করেছেন তিনি। সংসার যুদ্ধে বার বার হেরে গেছেন। এখন তিনি অসুস্থার কাছে পরাজিত সৈনিক।

রোগ-শোকে বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামান ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। কথা মুখে জড়িয়ে যায়। তাঁর স্ত্রী গুলশান আরা খানম জনকণ্ঠকে বলেন, বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস ছাড়া তার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। নিস্ব অসহায় এই বীর মুক্তিযোদ্ধা নানা রোগ-শোকে বিছানায় পড়ে আছেন। তার চিকিৎসা নেয়ার মতো কোন অবস্থা নেই। যা কিছু সম্পদ ছিল তা বিক্রি করে চিকিৎসা নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে তার সহযোগিতার জন্য ৫ শ’ টাকা ভাতার ব্যবস্থা করেছিলেন। এরপর থেকে তিনি প্রতিমাসে শতকরা ২০ ভাগ টাকা ভাতা পেয়ে আসছিলেন। কিন্ত সেই ভাতা ২০০২ সালে বিএনপি-জায়ামাত জোট সরকার ভাতা কমিয়ে শতকরা ৫ ভাগ করে দেয়। বঙ্গবন্ধু ’৭৩ সালের ২১ সেপ্টম্বর যুদ্ধে তার বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে এই ভাতা দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সই করা ভাতার ওই চিঠি ও চেক বই বুকে আগলে ধরে রেখেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামান।

রাজধানীর খিলগাঁও গোড়ানে ৪৫৫/এ বাসায় তারা ভাড়া থাকেন। দুই মেয়ে আর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে তাদের। ১১ হাজার টাকা বাসা ভাড়া যোগাড় করা তাদের জন্য খুবই কঠিন। উচ্চ শিক্ষিত বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামানের কিডনি, লিভার, হার্ট, উচ্চ ডায়াবেটিস, স্কিন, শ্বাসকষ্টসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত। এতদিন নিজ বাড়ি কুষ্টিয়ার মীরপুর থানার আমলা সদরপুরে যতটুকু জমি ছিল তা বিক্রি করে তাঁর চিকিৎসা করেছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা নূরুজ্জামানের অবদানের কথা বঙ্গবন্ধু জানার পর তাকে একটি চিঠি লেখেন। বঙ্গবন্ধুর ওই চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো। ‘প্রিয় বোন/ভাই, আপনি দেশপ্রেমের সুমহান আদর্শ ও প্রেরণায় উদবুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে পাক হানাদার দস্যুবাহিনীর হাতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। এই দুঃসাহসিক ঝুঁকি নেয়ার জন্য আপনাকে জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনার মতো নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিক বীর সন্তানরাই উত্তরকালে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের এক অত্যুজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে প্রেরণা যোগাবে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার ও আপনার পরিবারের উপকারার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ৫০০ টাকা প্রেরিত হলো। চেক নম্বর জনতা ব্যাংক মোহাম্মদপুর, ঢাকা, ১১৩৯৩১ থেকে ১১৩৯৪০। এ্যাকাউন্ট নম্বর ৮০২৫। আমার প্রাণভরা ভালবাসা ও সংগ্রামী অভিনন্দন নিন। শেখ মুজিব।’ এই চিঠি নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন চাকরির জন্য। কিন্ত চাকরি দেয়নি কেউ।

নূরুজ্জামানের স্ত্রী গুলশান আরা খানম জনকণ্ঠকে বলেন, আমার স্বামীর ৬ ভাই ৪ বোন। বাবা মরহুম আবু হুমায়েত খান। তিনি পিতাকে না জানিয়েই মহান মুক্তিযুদ্ধে চলে যান। ৮ নম্বর সেক্টর থেকেই তিনি যুদ্ধ শুরু করেন। যুদ্ধে পাকিদের বোমার স্পিøন্টারে সারা শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়। এ অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধের ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েই আবার যুদ্ধে চলে গেছেন। তিনি দেশের জন্য তার জীবন বাজি রেখেছেন। অথচ সেই মানুষটি আজ বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন। কেউ ফিরেও তাকায় না। কত বড় বড় নেতার দ্বারে দ্বারে আমি নিজে ঘুরেছি মানুষটার চিকিৎসার জন্য। কেউ সাড়া দেয়নি। তিনি দেশকে ভালবেসে যুদ্ধ করেছেন। কিছু পাওয়ার জন্য যুদ্ধে যাননি। তিনি ’৭১ সালে যা করেছেন তা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। আমার স্বামী হয়ত বিনা চিকিসায় মারা যাবেন। তাতে কোন দুঃখ নেই। তিনি যে দেশটাকে পাকি হানাদার মুক্ত করতে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন এটাই আমাদের কাছে বড় পাওয়া হয়ে থাকবে। তিনি তার গর্ভধারী মায়ের জন্য যেমন সেবা দিয়েছেন তেমনি দেশমাতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি যে বেঁচে ফিরেছেন এটাই ছিল তখন আমাদের কাছে বড় বিষয়। কিন্ত আমাদের অবস্থা দিন দিন দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর অবস্থায় পৌঁছে গেছে। আমাদের দেখার কেউ কি নেই স্বাধীন দেশে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করার অনেক চেষ্টা করেছি। অনেক নেতাকে ধরেছি। কিন্তু দেখা পাইনি। নেতারা শুধু মিথ্যা আশ্বাস দিয়েছেন।

গুলশান আরা খানম বলেন, আমার স্বামীর মুখের কথা বোঝা যায় না। একটু ভাল চিকিৎসা হলে এ সমস্যা থাকত না। ’৭১ সালে তিনি যখন যুদ্ধে যান তখন তাদের করিমপুর রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ২১ দিন ট্রেনিং নিয়ে ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট পাঠায়। এর কয়েক দিন পরেই তাকে বাংলাদেশে যুদ্ধের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর আবুড়ি,কাকিলাদহ, মাগুরা, হালসা, পুঁটিমারি, কালিদাশপুর, আলমডাঙ্গাসহ বড় বড় যুদ্ধে তিনি বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে পাকিদের পরাজিত করেছেন। যুদ্ধ শেষ- দেশ স্বাধীন হয়েছে। শত্রুমুক্ত দেশে যখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভর্তি করা হলো তখন তাকে চুল, দাড়িতে চেনা যাচ্ছিল না। একদিন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে এসেছিলেন। আবু সাঈদ চৌধুরী তখন তোফায়েল আহমেদকে ডেকে বললেন এই ছেলেটার চুল-দাড়ি কাটার ব্যবস্থা করো, এরাই দেশের রত্ন। বঙ্গবন্ধু ’৭৩ সালে ঢাকা মেডিক্যালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে গিয়েছিলেন। তখন আমার স্বামী হুইল চেয়ারে বসা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার ঘোষণা দেন। তিনি তখন বলেন, দেশের জন্য তাদের ত্যাগ জাতি সারাজীবন মনে রাখবে। এই রত্মরাই দেশকে স্বাধীন করেছে।

আমার স্বামীর ভাতা বন্ধ করে দিয়েছে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের পরেই। ভাতার টাকায় সংসারটা কোন রকমে চলত। কিন্ত এখন সংসার আর স্বামীর চিকিৎসা কোনটাই চলছে না। সেদিনের রত্ন অল্পদিনেই যে ছাই হয়ে যাবে, এটা আমরা ভাবতে পারিনি। নানা জটিল রোগ নিয়ে বিছানায় পড়া স্বামী আর দুই মেয়েকে নিয়ে আমি আজ অথৈ সাগরে ভাসছি। আমাকে তীরে তোলার জন্য কাউকে কাছে পাচ্ছি না। তাই পত্রিকা অফিসে এসে জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের কথাগুলো বলে গেলাম। জানিনা, এতে আমাদের লাভ-ক্ষতি কি হবে। তবে আমার বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এমন একজন মুক্তিযোদ্ধার কথা জানলে একটা ব্যবস্থা নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ খবরটুকু গেলেই আমরা খুশি। আমরা কিছু পাই বা না পাই, তাতে কোন দুঃখ নেই। কিছু হোক আর নাই হোক, প্রধানমন্ত্রী তো বিষয়টি জানলেন। এটাই বড় কথা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT