ঢাকা, মঙ্গলবার ১৩ এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

‘ক্ষুধার্ত দানবের ভয়াবহ ছায়া’

প্রকাশিত : 08:21 AM, 22 December 2020 Tuesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

‘ঢাকার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে দুপুর বেলাটা কাবাব খাওয়ার সময়। ছোট ছোট ২০টি টিনের চালার দোকান। ময়দা আর ভেড়ার মাংসের কিমা মিশিয়ে কাবার তৈরির জন্য বিখ্যাত দোকানগুলো। এখানকার অসংখ্য বাসিন্দার কাছে এটা খুব উপাদেয় খাবার। কয়েক হাজার জেলে, সবজি বিক্রেতা, ভাগ্য গণনাকারী, আবর্জনা কুড়ানদার, ভবঘুরে, মাঝি, ভিক্ষুক, ভিটেমাটি হারা কৃষকের আনাগোনা চলে এবং আরেক শ্রেণীর অর্ধ-উলঙ্গ চর্মসার মানুষ যারা দুপুরবেলা কাবাবের দোকানগুলোর সামনে ভিড় জমায়।’

‘পুরো খাবারটার দাম পরে চার আনা (২৫ পয়সা)। কিন্তু তারপরও কাবাব তৈরির সময় দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের বেশিরভাগেরই এটি কিনে খাওয়ার ক্ষমতা নেই। প্রতি ১০ পথিকের মধ্যে একজন, কি দু’জন কাবাব কিনতে পারে। যারা কাবাব কেনে, এত পরিতৃপ্তির সঙ্গে সেগুলো খায় যেন এক টুকরো বেহেশত হাতে পেয়েছে তারা। ঈর্ষা আর বিস্ময়মিশ্রিত দৃষ্টি নিয়ে তাদের খাওয়া দেখে বাকিরা।’ ১৯৭১ সালের দুই আগস্ট কাইহান ইন্টারন্যাশনাল ‘ক্ষুধার্ত দানবের ভয়াবহ ছায়া’ শীর্ষক আমির তাহেরির প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যা ফজলুল কাদের কাদেরীর মূল সংগ্রহ ও সম্পাদিত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ জেনোসাইড এ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস’- এ এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলের মানুষের অস্ত্রের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় সঙ্কট ছিল অর্থ ও খাদ্য। খাদ্য সঙ্কটে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয় গোটা অঞ্চলজুড়ে। বারবার বিশ্ববাসীর কাছে মানবিক সহায়তার আহ্বান জানানো হয়েছে ঠিকই। কিন্তু কতটুকু পাওয়া গেছে এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। যা পাওয়া গেছে তা ছিল অপ্রতুল। খাদ্যের অভাব যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ছুঁয়ে গেছে তেমনি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম নিপীড়নের পাশাপাশি একই অভাবে মারা গেছে বহু মানুষ। তখন ভাত তো দূরের কথা একটি রুটি খাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল মানুষ। খাবার না পেয়ে অনেকে আত্মহত্যাও করেছেন। আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ছুটে চলা মানুষ খাবারের অভাবে মারা গেলেও সৎকারের ব্যবস্থা ছিল না। পাহাড়ের রাস্তা থেকে গুহায় লাশ ফেলে যাওয়ার ঘটনাও অনেকের কাছে জীবন্ত হয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধে খাদ্য সঙ্কট দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে সমানভাবে স্থান পায়।

‘ক্ষুধার্ত দানবের ভয়াবহ ছায়া’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের পানি ও বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের বাঙালী প্রধান একজন চমৎকার ব্যক্তি তার অঞ্চলের সমস্যার কথা বলতে গিয়ে বলেন, এখানকার লোকজন ‘সত্যিকার অর্থেই খুব বেশি গরিব’। অতিকষ্টে মুখে হাসি ফুটিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশ এবং মাথাপিছু আয়ের হার সবচেয়ে কম।’ এ অঞ্চলের ৫৫ হাজার বর্গমাইল এলাকায় প্রায় সাড়ে সাত কোটি লোকের বসবাস। সাম্প্রতিক দশক শেষ হওয়ার আগেই জনসংখ্যা ১ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

একটি পিরিচের মধ্যবর্তী অংশের মতো সমতল পূর্ব পাকিস্তান এ কথা উল্লেখ করে খবরে বলা হয়, ফলে ভারত ও নেপালের বন্যার পানি এসেও এলাকাটি প্লাবিত হয়। প্রতি বর্ষা মৌসুমে এই চিরসবুজ এবং দৃশ্যত চিরদরিদ্র অঞ্চলটি প্রচন্ড বৃষ্টিপাতের পানিতে বন্যা উপদ্রুত হয়। পানি ও বিদ্যুত বিভাগের প্রধান আমাদের জানান, পরবর্তী দুই দশকে জীবনধারণের এই মান (বিশ্বের সবচেয়ে নিম্নতম) বজায় রাখতে হলে প্রয়োজনীয় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প গড়ে তোলার জন্য পাঁচ কোটি ডলার দরকার। পরিমাণটি সমগ্র পাকিস্তানের বার্ষিক জিএনপির এক-তৃতীয়াংশের সমান। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার সামর্থ নেই জাতীয় সরকারের। এই অঞ্চলের বেশিরভাগ এলাকাতেই সব সময় দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা বিরাজ করে এ কথা উল্লেখ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বিশৃঙ্খলায় পুঁজি, খাদ্য ও শ্রমের ক্ষেত্রে প্রচুর ক্ষতিসাধন হওয়ায় তা পরিস্থতিকে করে তুলেছে আরও প্রকট। এই অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল এবং একমাত্র ক্ষেত্র পাট উৎপাদন আগামী বছর থেকে বন্ধ হয়ে যাওয়ার সব সম্ভাবনা রয়েছে। বহু ফসলের ক্ষেত্র পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পূর্ব পাকিস্তানের এ অনিশ্চিত অবস্থা বজায় থাকলে খুব কম লোকেই স্বাভাবিকভাবে কাজকর্ম শুরু করতে আগ্রহী হবে।

খবরে বলা হয়, আনারস রফতানির ক্ষেত্রেও এই সঙ্কটের ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে। ভারত তার ভূখন্ডের উপর দিয়ে পাকিস্তানী বিমান উড্ডয়ন নিষিদ্ধ করায় বিমানে করে আনারস রফতানি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তোলার জন্য মিলিটারি অপারেশনের কায়দায় গুপ্ত হামলা চালানো হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাগুলো ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। বগুড়া ও সিলেটের মতো প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে গেরিলারা এখনও সক্রিয়। জমি চাষ ও ফসল বোনা থেকে বিরত রাখার জন্য চাষীদের ভয় দেখাচ্ছেন তারা। লাখ লাখ চাষী বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের ব্যাপারে সরকারের পরিকল্পনা নিছক কাগুজে স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

এমনকি ব্রিটিশ শাসনামলেও সাম্রাজ্যের এই অংশটি দারিদ্র্যের কারণে প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন কলকাতার পশ্চাদভূমি ও শোষণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো এই অঞ্চলকে। ওই দিনগুলোতে জনসংখ্যা যাতে জমির অনুপাতে না বাড়ে অনেকটা ম্যালথাসীয় কায়দায় দুর্ভিক্ষ আর কলেরার মাধ্যমে প্রকৃতিই নিয়ন্ত্রণ করত তা। প্রায় ছয়-সাতটি দেশের সহযোগিতায় পাকিস্তান প্রায় ২০ বছর ধরে প্রচেষ্টা চালিয়ে এ অঞ্চলের লোকজনকে বাঁচাতে পারলেও, অনেকটা খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছে এখানকার মানুষ। বহু শতকের পশ্চাৎপদতা, দারিদ্র্য এবং আর্থিক সংস্থাগুলোর অন্যায্য পদ্ধতি অব্যাহতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিকূলে থাকায় কোন ধরনের অগ্রগতিই সম্ভব হচ্ছে না এখানে। স্বাধীন উদ্যোগের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতেও হয়ত এটাই স্বাভাবিক। এ ধরনের ব্যবস্থায় মুনাফার লোভে বিনিয়োগ করা হয় এবং বিনিয়োগকারীরা এখানকার চেয়ে ২০০ বছর এগিয়ে থাকা পশ্চিম পাকিস্তানে বিনিযোগ করতে আগ্রহী থাকে। নিশ্চিতভাবেই সেখানে মুনাফার পরিমাণ অনেক বেশি। এর ফলে সৃষ্টি হয় একটি দুষ্টচক্রের। পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের যত উন্নতি হতে থাকবে পরবর্তীতে ততই পূর্ব পাকিস্তানে বিনিয়োগের আগ্রহ আরও কমে যাবে।

প্রায় তিন বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের পাশাপাশি জনগণের একটি বড় অংশও দিন দিন এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠছে এমন তথ্য উপস্থাপন করে খবরে বলা হয়, কিন্তু বছরের পর বছরের অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলার ফলে সৃষ্টি হয়েছে এই অবস্থা। কোন ইতিবাচক পদক্ষেপই পূর্ব পাকিস্তানকে নিশ্চিহ্ন হওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে পারবে না।

পূর্ব পাকিস্তানের ভবিষ্যতের দুর্ভোগ দুর্দশা থেকে বাঁচানোর অভিযান শুরু করার আগে সেখানে পুরোপুরি শান্তি ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছে পশ্চিম পাকিস্তানীরা। তারা স্বীকার করছে আরও ২০ বছর আগে ব্যাপারটা ভেবে দেখা উচিত ছিল এবং বর্তমান করুণ পরিস্থিতির জন্য একের পর এক দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য সরকারকেই দায়ী করে তারা।

অদূর ভবিষ্যতে পূর্ব পাকিস্তানে আদো শান্তি ফিরে আসবে কিনা এ ব্যাপারে এখনও কেউ নিশ্চিত নয় এমন আশঙ্কার কথা তুলে ধরে খবরে বলা হয়েছে, ৩৫ হাজারের বেশি গেরিলাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে ভারত। গত কয়েক মাসে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে যাওয়া পূর্ব পাকিস্তানীদের বেশিরভাগেরই দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই, শুধুমাত্র গেরিলা আর হামলাকারী ছাড়া। শক্তিশালী বিধ্বংসী বাহিনীও সক্রিয় রয়েছে। মহাপ্রলয়ের চার অশ্বারোহীর হাত থেকে বাঁচা হারকিউলিসের মতো পূর্ব পাকিস্তানকে বাঁচানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানের শক্তি আর সম্পদও সীমিত।

সামরিক কর্তৃপক্ষ বলছে, ভারত ‘পাকিস্তানকে বিভক্ত করার প্রচারণা’ বন্ধ করলেই পূর্বাঞ্চলে প্রকৃত অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হবেন তারা। পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কোন নেতা বিশেষ করে পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো মনে করেন, বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেয়াটা একটা চক্রান্ত, চালাকি। ভুট্টো বলছেন, পূর্ব পাকিস্তানে পরিস্থিতি ঠিকঠাক করার জন্য মাত্র পাঁচ বছরের সময়ই যথেষ্ট যদি নাকি কেন্দ্রে বেসামরিক সরকারের কাছে অতিসত্বর ক্ষমতা ছেড়ে দেয় সামরিক বাহিনী।

তারা আরও মনে করেন যে, …পূর্বাঞ্চল দখলে রাখতে ব্যর্থ হবে সামরিক বাহিনী এবং এ প্রদেশটি হাতছাড়া হওয়ার পর পরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গ। তারা উল্লেখ করেন, গত দশক থেকেই উত্তপ্ত রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ এবং কার্যত সামরিক বাহিনীর দখলে রয়েছে সেটা। অখ-তা বিনষ্টকারী এ ধরনের ঘটনা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে। যার ফলে ‘ভেঙ্গে যেতে পারে বিভিন্ন জাতি নিয়ে গঠিত গোটা উপমহাদেশের মানচিত্রটাই।’

১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ভারত কিংবা পাকিস্তান এমন তথ্য তুলে ধরে খবরে বলা হয়, কিন্তু উভয়পক্ষেই এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে সশস্ত্র সংঘাতের পথ বেছে নেয়ার পক্ষপাতি। ভারতীয়দের আচরণে মনে হচ্ছে, তাদের বিশ্বাস পাকিস্তানকে টুকরো টুকরো করে পূর্ব পাকিস্তানকে স্প্রিং বোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে নিজেদের অখন্ডতা রক্ষা করবে তারা। পাকিস্তানীরাও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে ভারতকেও রসাতলে টেনে নামাবে তারা। এখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর নীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নিজের এলাকার মধ্যে প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে চীনের পাশাপাশি ভারতের অবস্থানে পশ্চিমা দেশগুলো উদ্বিগ্ন। অন্যদিকে ভারতের বিরুদ্ধে সংশোধনকারী শক্তি হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে জোট বাঁধায় রাখতে আগ্রহী পিকিং।

কিন্তু ওয়াশিংটন কিংবা পিকিং কেউই এই উপমহাদেশের জন্য নীতি নির্ধারণ করে উঠতে পারেনি। বাংলার দুটি বিভক্ত অংশই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। পূর্ব ও পশ্চিম উভয় বাংলাই অত্যন্ত দরিদ্র। আগুন জ্বলে ওঠার চরম মুহূর্তে পরস্পরের শৃঙ্খল ছাড়া আর যে কিছুই হারাবার নেই, এটুকু ভেবে দেখার মতো অবস্থা নেই তাদের। পূর্ব পাকিস্তানের নামমাত্র কয়েকজন মনে করেন, উপমহাদেশটি খন্ড-বিখন্ড হয়ে গেলে ‘মানবজাতির ইতিহাস অশ্রুতপূর্ব গণহত্যা’ শুরু হয়ে যাবে। দেশ বিভাগের সময় লাখ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে। আরেকটি নতুন বিভক্তি উপমহাদেশে হয়ত ২০টি পৃথক জাতিগত রাষ্ট্রের জন্ম দেবে এবং সেই থেকে শুরু হবে ব্যাপক নৃশংসতা আর গণহত্যা। গত কয়েক মাস ধরে পূর্ব পাকিস্তানের ট্র্যাজিক ঘটনাবলী ভারত ও পাকিস্তান উভয়ের সমবাদী প্রবণতাকে আরও জোরদার করে তুলেছে। সামরিক বাহিনীর প্রধানরা সব সময় মর্যাদার লালসা আর সৈনিকদের কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখার ব্যাপারে আগ্রহী। ইসলামাবাদ ও নয়াদিল্লী উভয়ের নীতিমালার ওপর দিন দিন কার্যকর প্রভাব খাটানো শুরু করেছেন সামরিক প্রধানরা। দুটি দেশের ভঙ্গুর কাঠামোর তুলনায় তাদের সামরিক প্রধানদের ভার বেশি হয়ে গেছে। উপমহাদেশের বর্তমান প্রায় ২০ লাখ সশস্ত্র সৈন্য রয়েছে এবং সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেলে হাতে অস্ত্র তুলে নেবে আরও কয়েক লাখ লোক।

খবরে বলা হয়, ভারতীয়রা কার্যত বলে বেড়াচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্য নির্ধারণ করবে নয়াদিল্লী। উপেক্ষার মাধ্যমে এর জবাব দিয়েছে পাকিস্তান। ইয়াহিয়া খানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত এবং পাকিস্তানে বিভক্ত করার ব্যাপারে ভারতীয় প্রচেষ্টার একটি আংশিক কারণ হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে দেশটির নিজস্ব ভীতি। তাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত কাজ হচ্ছে বাঙালীদের মাথাব্যথার কারণটি সারিয়ে তুলতে সহায়তা করা-বাংলার দুটি অংশই যা নিয়ে কম বেশি ভুক্তভোগী। কিন্তু এ ধরনের একটি পদক্ষেপ অন্তত এ মুহূর্তে একবার চিন্তা করা যায় না।

পশ্চিমবঙ্গে যখন নকশালবাদী আন্দোলন পুরোদমে ছড়িয়ে পড়েছে তখন ভারতকে দুর্বল করার লক্ষ্যে এ ব্যাপারে সব ধরনের ইন্ধন জুগিয়েছে পাকিস্তান এমন তথ্য তুলে ধরে খবরে আরও বলা হয়, নকশালবাদীরা পূর্ব পাকিস্তানে আশ্রয় নিয়েছে। চীনের পাঠানো অস্ত্র দিনাজপুর আর রাজশাহীর মধ্য দিয়ে তাদের হাতে এসে পৌঁছাত। ফলশ্রুতিতে পশ্চিমবঙ্গ আরেকবার শাসনের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানী গেরিলাদের আশ্রয়, তাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহ এবং পূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে সে সময়কার প্রতিশোধ নিচ্ছে ভারত। পরস্পরের সঙ্গে সংযুক্ত দুটি বোতলে বন্দী বাঙালী দানবকে মুক্ত করে দেয়ার ব্যাপারে তারা উভয়েই হয়ত নিজ নিজ সাফল্য প্রমাণ করেছে।

ইয়াহিয়া খানের সরকার সম্ভবত পাকিস্তানের শেষ সরকার যেটা ভারতের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। কিন্তু নির্ভুলভাবে বলতে গেলে এই সরকারকেই ক্ষমতাচ্যুত করতে চাইছে নয়াদিল্লী। বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে গান্ধীর সরকার প্রয়োজনে সামরিক প্রধানদের হাতের পুতুল হওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি আছে। পাকিস্তানের পিঠে ছুড়ি মারার সঙ্গে সঙ্গে একই হয়ত আত্মঘাতী হতে হবে ভারতকেও।

তবে এ সবই কৌশলগত প্রকৃতি বিচার বিবেচনার বিষয়। এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে এবং উদ্বাস্তুদের চাপের মুখে অর্থনৈতিক ধ্বংসের হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গকে রক্ষা করা। মার্কিনীরা প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানের বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও খাদ্য সাহায্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গ্রীষ্মকাল শেষ হওয়ার আগেই সাহায্যের প্রথম অংশটি এসে পৌঁছানোর কথা। কিন্তু দরকার আরও অনেক বেশি। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতিকে গোটা বিশে^রই গুরুত্ব দেয়া উচিত। দারিদ্র্য আর ক্ষুধার বিরুদ্ধে মানবিক সংগ্রামের এই কর্মক্ষেত্রে দানবীয় এক এশীয় ট্র্যাজেডির বীজ বপন করা হয়েছে।

দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম ॥ নিক্সন, কিসিঞ্জার এ্যান্ড দ্য ফরগটেন জেনোসাইড-গ্যারি জে বাস, নিউইয়র্ক টাইম বুক অব দ্য ইয়ার আলফ্রেড এ. নুফ, ২০১৩। আলোচিত বইটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্নাযুদ্ধকেন্দ্রিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে সম্পর্কের ধরন এবং অন্যান্য বৃহৎ শক্তির ওপর এর প্রভাব নিয়ে তথ্যবহুল একটি উপস্থাপনা। এর একটি অংশে বলা হয়েছে, ‘শরণার্থী সমস্যা ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা নিয়ে আসে। ভারত নিজেই যেখানে তার জনসংখ্যাকে খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি দিতে পারছিল না, সেখানে বাড়তি এই বিশাল জনসংখ্যা এক ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। পাকিস্তানের নীতিই ছিল হিন্দুদের এখান থেকে বিতাড়িত করা। তাদের ধারণা ছিল, হিন্দুরাই বঙ্গবন্ধুর পেছনে মূল ইন্ধনদাতা। ভারতে শরণার্থীদের মধ্যেও বেশির ভাগই ছিল হিন্দুধর্মাবলম্বী। ভারত বুঝতে পেরেছিল যে পাকিস্তান পদ্ধতিগতভাবে হিন্দুদের বিতাড়িত করেছে, কিন্তু ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বেধে যাওয়ার ভয়ে গান্ধী এই তথ্য প্রকাশ করতে চায়নি। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে হত্যাযজ্ঞকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে মানতে নারাজ ছিলেন। শরণার্থী সমস্যাকেই আসল কারণ হিসেবে দেখিয়ে ভারত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

গুলি না রুটি ॥ ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘গুলি না রুটি’। খবরের একটি অংশে বলা হয়েছে, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যখন খাবারের জন্য লড়াই করতে তাকে তখন আমেরিকা এ অঞ্চলে গম রফতানি বন্ধ করে দেয়। তারা চীনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে সেখানে অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় খাদ্য সঙ্কট ছিল এ অঞ্চলের মানুষের নিষ্ঠুরতম আঘাত। একই দিন নিউ ইয়র্ক টাইমসে ‘অর্থনৈতিক দুর্যোগ’ শিরোনামে আরেকটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

১৯৭১ সালে ২৪ সেপ্টেম্বর সাপ্তাহিক বাংলাদেশে বোম্বাই থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘খাদ্যের ব্যবস্থা হলে মুক্তাঞ্চলে উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেয়া হবে’। খবরে বলা হয়, ‘ভারত সরকার যদি মাত্র তিন-চার মাসের জন্য বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেন তাহলে ভারত থেকে উদ্বাস্তু ফিরিয়ে নেয়ার কাজ শুরু করা যেতে পারে এবং এখনই অন্তত ১৫ হাজার উদ্বাস্তুকে ফিরিয়ে নেয়া যায় বলে ভারত বাংলাদেশের প্রতিনিধিবৃন্দ ভারত সরকারকে যে প্রস্তাব দিয়েছেন আজ এখানে এক সাংবাদিক সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অনুজ শেখ আবু নাসের তা প্রকাশ করেন …।’ ১৯৭১ সালের ১৬ জুন নিউ ইয়র্ক টাইসম ‘ভয়ঙ্কর দুর্যোগ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে।

কোথায় গেলে রেশন পাব ॥ মুক্তিযুদ্ধের সময় ৮ জুন আনন্দবাজার পত্রিকায় ‘অনাহারে পথশ্রমে অবসন্ন মৃতপ্রায় শরণার্থীদল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘স্যার একবার বলে দিন, এই স্লিপ নিয়ে কোথায় গেলে রেশন পাব? কলকাতা থেকে টাকি, টাকি থেকে হাসনাবাদ, হাসনাবাদ থেকে বসিরহাট, বসিরহাট থেকে বারাসাত, বারাসাত থেকে দমদম, তারপর লবঙ্গ হ্রদ, তারপর? শত শত লোক বৃদ্ধ। যুবক, যুবতী কিশোর কিশোরী এবং শিশু এই একটি প্রশ্ন মুখে নিয়ে পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বিভিন্ন শিবিরে এরা যাচ্ছে, প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে, আবার হাঁটছে, হাঁটছে মাইলের পর মাইল, হাঁটছে দিন রাত। তারপর অনাহারে পথশ্রম, যারা অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবসন্ন তারা বসে পড়ছে পথের ধারে। মরছে …।’

মুক্তিযুদ্ধকালে দুই অক্টোবর দি ইয়র্কশায়ার পোস্ট (লিডস) সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘ভয়াবহ পূর্বাভাস’। এতে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট নিক্সন গতকাল পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী সমস্যার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন ‘নিয়ন্ত্রণহীন এই পরিস্থিতি দুর্ভিক্ষের অবস্থা অথবা এমনকি যুদ্ধের মতো দুর্যোগের দিকে মোড় নিতে পারে।

কিছু সময়ের জন্য এটিই মনে হচ্ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ১ কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডের ত্রাণ সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন তা কেবল আংশিক সমাধান হতে পারে। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো এবং বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই তাদের দুর্ভিক্ষের পূর্বাভাসের ব্যাপারে অত্যন্ত হতাশ। তারা সব সময় রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষও নন। মনে রাখতে হবে যে নাইজিরিয়ায় গৃহযুদ্ধকালে আপবাদের মাঝে প্রকৃতপক্ষে যারা জীবিত ছিল তাদের সম্পর্কে বারবার বলা হচ্ছিল যে, তারা মারা গেছে, অথবা মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ ও খাদ্য সঙ্কটের সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান শহীদ বলেন, আমি দুই নম্বর সেক্টরের অধীন যুদ্ধ করেছি। যুদ্ধের সময় অনেকের হাতে টাকা-পয়সা থাকলেও খাদ্য সরবরাহ কোন কোন সময় কঠিন ছিল। মানুষ ভয়ে ঘর থেকে বের হতো না। আমরাও খাদ্য সঙ্কটে ভুগেছি। তবে বাজারে গেলে দোকানদাররা যদি মুক্তিযোদ্ধা বলে চিনতে পারত তবে আমাদের অনেক কম দামে জিনিসপত্র দিন। বেশিরভাগ সময় আমরা নিজেরাই রান্না করে খেতাম। গ্রামের দিকে গেলে অনেক সময় এলাকার লোকজন আমাদের দাওয়াত করে খাওয়াত।

সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে নেত্রকোনার বাসিন্দা অমল চক্রবর্তী বলেন, যুদ্ধের সময় ছোট ছিলাম। তবে কিছু ঘটনা মনে আছে। আমরা বাঘমারা দিয়ে হেঁটে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলাম। তখন খাদ্যের অভাবে পথে পথে মানুষের মৃত্যু আর আর্তনাদ দেখেছি। পথে যাদের মৃত্যু হতো তাদের পাহাড় থেকে নিচে ফেলে দেয়া হতো।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT