ঢাকা, বুধবার ১৪ এপ্রিল ২০২১, ১লা বৈশাখ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

কোভিড-১৯ টিকার পূর্বাপর

প্রকাশিত : 08:16 AM, 3 April 2021 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

পৃথিবীতে যেসব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে থাকে সেসবেরও একটা সীমারেখা আছে। করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কার, প্রাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের যে ধারণা ছিল এর চেয়েও দ্রুত সময়ে এটি মানুষের শরীরে অনেক সফলভাবে কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে। এরই মধ্যে টিকা প্রদান শুরু না হলে অন্তত ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ নিশ্চিতভাবে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। তবে দেশে দেশে টিকাদান কর্মসূচী শুরু হওয়ার পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, টিকা কোভিড-১৯কে চিরতরে বিদায় করতে পারবে না। বছরের পর বছর এই সংক্রামক ব্যাধি পৃথিবীতে বিস্তার ঘটাবে এবং এক সময় এটি হয়ে পড়বে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই রোগটি যখন প্রথম ভয়াবহ সংক্রমণ শুরু করে তখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিল; কিন্তু এখন তাদের অদূর ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে কর্মপরিকল্পনা করতে হবে।

এখনকার যে টিকাদান কর্মসূচী তাকে বিস্ময়কর বললে খুব বেশি বলা হবে না। ভাইরাসটি নির্ণীত হওয়ার এক বছরেরও বেশি সময় পর প্রায় ১৫ কোটি ডোজ টিকা টিকাদান কেন্দ্রগুলোর জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর টিকাদানকারী দেশগুলোর মধ্যে এগিয়ে আছে ইসরাইল। ইসরাইলে যাদের বয়স ৬০-এর নিচে এবং যারা এখনও একডোজ টিকাও পায়নি হাসপাতালে তাদের ভর্তির সংখ্যা এযাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ৬০ বছরের বেশি বয়সী যারা এরই মধ্যে টিকা গ্রহণ করেছে তাদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা মধ্য জানুয়ারিতে উর্ধমুখী সূচকের সময় যা ছিল তার চেয়ে ৪০% কম এবং এটি আরও কমবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও টিকা হালকা ও লক্ষণহীন কোভিড রোগীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ, কিন্তু টিকা গ্রহণের কারণে মৃত্যু ও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি নিঃসন্দেহে কমাতে পারবে- এটাই বড় একটি সাফল্যের দিক। প্রাথমিক পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, কোন কোন টিকা সংক্রমণ ছড়ানো বন্ধ করতেও সক্ষম। এটি অতিমারীর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে বলে আশা করা যায়। এর ফলে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে রোগীর ভিড় না বাড়িয়ে লকডাউন উঠিয়ে দেয়া সম্ভব হবে। গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও গবেষণাধীন অনেক তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনগুলোতে চিকিৎসা বিজ্ঞান আরও শক্তিশালী হবে এ ধারণা একেবারে অমূলক নয়।

এতো এতো ভাল খবরের পরও এটা মনে রাখতে হবে যে, করোনাভাইরাস অতিমারী এখনও মনুষ্য সমাজ থেকে বিলীন হয়ে যায়নি। কোভিড-১৯ এখনও বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী। একটি ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী ভিত তৈরি করছে, তা হচ্ছে কোভিড-১৯ মানুষের জীবনে একটি স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলবে কিনা এ সম্ভাবনাকে খতিয়ে দেখা।

এই সংক্রামক ব্যাধি লম্বা সময় ধরে পৃথিবীতে অবস্থান করার কারণ হচ্ছে ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষকে টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় আনার জন্য যে পরিমাণ টিকা উৎপাদন ও সুষ্ঠু বিতরণ ব্যবস্থার প্রয়োজন সে কাজটির আকার ও আয়তন অনেক বড়। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে ব্রিটেন সবচেয়ে দ্রুতগতিতে সাধারণ জনগণকে টিকা প্রদান করছে। তারপরও তারা মে পর্যন্ত ৫০ বছরের অধিক বয়সীদের টিকাদান শেষ করতে সক্ষম হবে না। প্রথম ডোজের পর নির্দিষ্ট সময়ে দ্বিতীয় ডোজ দেয়া না হলে প্রথম ডোজের কার্যকারিতা হ্রাস পেতে পারে। উন্নত দেশগুলোর বাইরে অন্য দেশগুলোর মধ্যে ৮৫% দেশ এখনও টিকাদান কর্মসূচী শুরু করেনি। ঐসব দেশে যে শত শত কোটি মানুষের বাস তারা ২০২৩ সালের আগে এক ডোজ টিকাও পাবে না এবং ভাইরাসটি শক্তিশালী হয়ে তাদের মাধ্যমেই দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে।

যদিও টিকা গ্রহণের পর সার্স-কভ-২ দ্বারা আক্রান্ত হলে মারাত্মক অসুস্থতা ও মৃত্যু পরিহার করা সম্ভব; কিন্তু নতুন ধরনের কোভিড-১৯ ভাইরাস টিকার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে এই সম্ভাবনা থেকে বলা যায় যে, এই সংক্রামক ব্যাধি আরও বহুদিন আমাদের গ্রহে তার দাপট চালিয়ে যাবে। একটা বিষয় ভালভাবে মনে রাখতে হবে, তা হলো সংক্রমণের নতুন ধরনগুলো সাধারণ কোভিড-১৯ থেকে ২৫-৪০% বেশি সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম। যদি নতুন ধরনগুলো তেমন মারাত্মক নাও হয়ে থাকে তারপরও সংক্রমণ অংকের সূচক বৃদ্ধির তত্ত্বকে ধাঁধায় ফেলে দিচ্ছে। যার ফলে অসুস্থ ও মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। এই রোগের বিস্তারকে একটি নির্দিষ্ট বৃত্তে আবদ্ধ করতে চাইলে সামাজিক দূরত্বকে আরও কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে।

এসবের বাইরেও যা চিন্তিত করে তুলছে তা হলো কোভিড-১৯-এর নতুন ধরনগুলো বর্তমানে প্রচলিত টিকাগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট করে দিতে পারে। ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার ধরনগুলোও টিকা থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। যেহেতু টিকা গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কোভিড-১৯কে চিনতে পারার কৌশলটি রপ্ত করেছে, তাই এই সম্ভাবনা খুবই কম হবে বলে ধারণা করা যায়। এর ফলে যে এই ভাইরাসটি নতুন নতুন রূপ গ্রহণ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সেক্ষেত্রে ভাইরাসটিকে অকার্যকর করার জন্য মানবসমাজ যে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করেছে সে ব্যবস্থা কাজ না করার আশঙ্কা থেকেই যায়।

বিপুলসংখ্যক মানুষের টিকা নিতে অনাগ্রহের কারণেই তারা সার্স-কভ-২ ভাইরাসটির আক্রমণের শিকার হবে ও এটি মানবসমাজে তার দাপট চালিয়ে যেতে পারবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বয়সজনিত ও বিভিন্ন রোগব্যাধিতে ভোগার কারণে ব্রিটেনের প্রায় এক কোটি লোক এই প্রাণঘাতী ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। যদি এদের মধ্যে ১০% মানুষ টিকা নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার ব্যাপারে উদাসীন হয় তবে এই ভাইরাসটি দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়বে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার গ্রাফ ক্রমশ উর্ধমুখী হবে।

টিকা দিতে অনাগ্রহী লোকের সংখ্যা যা হিসাব করা হচ্ছে বাস্তবে এর সংখ্যা অনেক বেশি। শিশুদের এখনও টিকা নেবার অনুমতি দেয়া হয়নি। অনেক দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, যাদের মাধ্যমে রোগটি ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক বেশি, তাদের সরকারী ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা একেবারেই কম। অনেক পরিচর্যাকারী, প্রায় অর্ধেকের মতো, টিকা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যদিও তারা চোখের সামনে কোভিড রোগীদের মরণাপন্ন অবস্থায় দেখছে। কোভিডের নতুন ধরন যেভাবে বিস্তার লাভ করছে তাতে ৮০% লোকের শারীরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী থাকতে হবে, যাতে তাদের মাধ্যমেই অন্য অনেকের শরীরে এই রোগ বাসা বাঁধতে না পারে। এভাবেই এই সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার রোধ করা সম্ভব।

উপরোক্ত কারণগুলো বিবেচনায় রেখে সরকারের উচিত হবে কভিড-১৯কেএকটি প্রাত্যহিক রোগ হিসেবে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা। এখন তারা যা করছে তা হলো জরুরী ব্যবস্থাপনা এক সময় যার আর দরকার হবে না। যদি আমরা নিউজিল্যান্ডের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব যে, তারা পৃথিবীর সব দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেশকে কোভিডমুক্ত করেছিল। এর ফলে ঐ দেশে সরকারী হিসাবে শুধু ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের কঠোর ব্যবস্থা কোনভাবেই স্থায়ী হতে পারে না। নিউজিল্যান্ড তো আর উত্তর কোরিয়া নয়। নিউজিল্যান্ডে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের টিকা দেয়ার কাজ এগিয়ে চলেছে। এজন্য সরকারকে সীমান্ত খুলে দেয়ার চাপ সহ্য করতে হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে এই যে, কোভিড-১৯কে প্রাত্যহিক জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে মেনে নিয়ে এর ফলে যে সংক্রমণ ও মৃত্যু হচ্ছে তাকে সহজভাবে গ্রহণ করা।

বিশ্বের সরকারগুলোকে যা নিয়ে কাজ করতে হবে তা হচ্ছে জরুরী পদক্ষেপ নেয়ার ধাপগুলো থেকে বেরিয়ে এসে যা অনির্দিষ্টকালের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে টেকসই সেসব নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। কোন কোন জায়গায় পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়া রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন হবে, যারা কোভিডমুক্ত হবার লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই অনেকখানি বিনিয়োগ করে ফেলেছে তাদের ক্ষেত্রে তো বটেই।

চিকিৎসাশাস্ত্রকে সঙ্গে নিয়েই কোভিড-১৯-এর সঙ্গে বসবাস করাটা মানিয়ে নিতে হবে। বিভিন্ন ধরনের করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা দেবার জন্য টিকা তৈরির কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। যেভাবে ভাইরাসটির মিউটেশন হচ্ছে তার দিকেও কড়া নজর রাখতে হবে। আর বুস্টার শটের জন্য অনুমোদন ত্বরান্বিত করতে হবে। যারা এই ভাইরাসটি দ্বারা আক্রান্ত ও মৃতদের সংস্পর্শে আসছে দ্রুতগতিতে তাদের চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। স্বাস্থ্যগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নিয়মিত বুস্টার জেবস ও বিভিন্ন ধরনের থেরাপিকে একসঙ্গে প্রয়োগ করে মৃত্যু ঝুঁকি কমিয়ে আনতে হবে, যদিও এ ব্যাপারে নিশ্চয়তা দেয়া খুবই কঠিন।

শুধু ওষুধ প্রয়োগ করে এই মহামারীর গতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন মানুষের সঠিক আচার-আচরণ, যা অন্য সব মহামারীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। জাতীয়ভাবে লকডাউন দেয়া কিংবা মাসের পর মাস স্কুল ছুটি দেয়ার চেয়ে (যার জন্য অনেক মূল্য দিতে হবে) ব্যক্তিমানুষের সচেতন হওয়ার দায়িত্ব অনেক বেশি। মাস্ক পরার অভ্যাসটা আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের অংশ হয়ে যেতে পারে। ভ্যাকসিন পাসপোর্ট সঙ্গে থাকা ও জনসমাগমের স্থানগুলোতে বিধিনিষেধ নিয়ে বাধ্যবাধকতা হয়ত থেকেই যাবে। ঝুঁকিতে থাকা লোকজনকে আরও সচেতন হতে হবে। যারা টিকা নিতে অনাগ্রহী তাদের স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা ও উৎসাহ দিতে হবে। ভ্রমণ শিল্প নিয়ে যে রিপোর্ট পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় যে, মানুষ যে ধরনের জীবনযাপন করতে চায় তা থেকে তাকে থামিয়ে রাখা খুবই কঠিন, এমনকি চীনের মতো স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোও এক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স প্রয়োগ করার ব্যাপারে নির্বিকার।

কোভিড-১৯ যদি আরও মারাত্মক সংক্রমণ নিয়ে চলতে থাকে তবে লম্বা সময় ধরে কোভিডের থাকাটা হবে আরও প্রাণঘাতী ও ভয়ানক। এই সংক্রামক ব্যাধিকে যদি পুরোপুরি দমন করা সম্ভব নাও হয় তবে সার্বিক অবস্থাকে আরেকটু ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব শুধু চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তা নিয়ে।
ইসমত আরা জুলী
সূত্র : দি ইকোনমিস্ট

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT