ঢাকা, সোমবার ০৮ মার্চ ২০২১, ২৪শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

শিরোনাম
◈ কুষ্টিয়ায় তামাক চাষীদের অনশন ◈ খিলক্ষেতে লেক থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার ◈ রাজধানীতে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগে গ্রেফতার ৪২ ◈ সঠিক রাজনীতিই নারীর অধিকার নিশ্চিত করতে পারে : শিক্ষামন্ত্রী ◈ বেসরকারি পাঠাগারে গ্রন্থাগারিক নিয়োগ, সরকারি অনুদান বাড়ানোর দাবি ◈ ঢাবিতে ভর্তি আবেদন শুরু, পরীক্ষায় ব্যাপক পরিবর্তন ◈ কাজের কোয়ালিটি নিয়ে নো কম্প্রোমাইজ, অনিয়ম করলে কঠোর শাস্তি : এলজিআরডি মন্ত্রী ◈ গুচ্ছভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি আবেদন শুরু ১ এপ্রিল, পরীক্ষা শুরু ১৯ জুন ◈ ঢাকা থেকে নীলফামারী গিয়ে যাত্রীবেশে ইজিবাইক চালক হত্যা, গ্রেফতার ৩ ◈ খালেদা জিয়া দেশের যেকোনো জায়গায় চিকিৎসা নিতে পারবেন ॥ আইনমন্ত্রী

কাঠগড়ায় সুদিনের ই-কমার্স

প্রকাশিত : 04:50 PM, 12 September 2020 Saturday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

করোনা মহামারিতে আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল দেশের ই-কমার্স। আলু-পটোল থেকে শুরু করে ওষুধ, ইলেকট্রনিকস পণ্য, পোশাক, গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনেছেন করোনায় ঘরবন্দী থাকা নগরবাসী। গত ঈদে অনলাইনে দেখেছেন কোরবানির গরু, কিনেছেনও ঘরে বসেই। তবে সুসময় দেখানো ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা এখন নানা সমালোচনায় মুখর। অনলাইনে পণ্য বিক্রিতে ব্যবসার পদ্ধতি, ধরন উঁকি দিচ্ছে এক সময়ের আলোচিত এমএলএম কেলেঙ্কারিকে। নানা অভিযোগে মাত্র দুই বছরে জনপ্রিয় ই-কমার্স ই-ভ্যালিকে নিয়ে এখন তদন্তে নেমেছে সরকারী সাত প্রতিষ্ঠান। অভিযোগও খুব স্পর্শকাতর। কিছু প্রমাণও পেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জনপ্রিয় চীনা ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার দারাজের বিরুদ্ধেও ক্রেতাদের নকল ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির বিস্তর অভিযোগ। এছাড়া ই-কমার্স ওয়েবসাইটের বাইরেও ফেসবুকে পণ্য কিনে হরহামেশা প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকান্ড প্রশ্নের মুখে পড়ায় ই-কমার্স ও এফ কমার্স ব্যবসা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। যদিও দেশে ই-কমার্স পরিচালনার জন্য নীতিমালা রয়েছে ‘ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা’ শিরোনামে। কিন্তু পণ্য কিনতে সমস্যা হলে ক্রেতারা কোথায় অভিযোগ করবেন, কোথায় যাবেন সে বিষয়ে কিছুই বলা নেই সেই নীতিমালায়। এসব দিক বিবেচনা নিয়ে ভোক্তার স্বার্থ নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট ‘ই-কমার্স পরিচালনা নীতিমালা’ প্রণয়ন করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ই-বাণিজ্যের প্রতারণা বন্ধে এ সংক্রান্ত দুটি আইন প্রণয়নে সম্প্রতি নির্দেশনা এসেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে।

বাংলাদেশে অন-লাইনে কেনাবেচার শুরু মূলত ২০১১ সাল থেকে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংক ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ (এনএসপিবি) চালু করলে ব্যাংকের মাধ্যমে অন-লাইনে মূল্য পরিশোধের পদ্ধতিটি চালু হয়। এরপর ২০১৩ সালে ক্রেডিট কার্ড দিয়ে আন্তর্জাতিক কেনাকাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই বছর দেশের মোবাইল অপারেটরগুলো দ্রুতগতির তৃতীয় প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা (থ্রিজি) চালু করে। এরপর চতুর্থ প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা (ফোরজি) চালু হয় দেশে। এই সময়ে মানুষের স্মার্টফোন ব্যবহারের যেমন প্রবণতা বেড়েছে, ঠিক তেমনই ই-কমার্স খাতে নতুন নতুন বিনিয়োগ এসেছে। সব মিলিয়ে খাতটি বড় হয়েছে। ক্রেতাও বেড়েছে। ই-কমার্স এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) হিসাবে তাদের সদস্য সংখ্যা ১ হাজার ২৭০। বছরে বিক্রির পরিমাণ আট হাজার কোটি টাকার মতো। অবশ্য এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছোট ছোট পণ্য বিক্রেতা রয়েছেন। আবার দোকান মালিকেরা অনেকেই অনলাইনে পণ্য বিক্রি করেন। তাদের অনেকেই আবার সুপরিচিত অনলাইন মার্কেট প্লেস বা কেনাবেচার মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত। বিদেশী কোম্পানিগুলো ই-কমার্স খাতে ৪৯ শতাংশ বিনিয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়া বাকি ৫১ শতাংশের মালিকানা সরকার কিংবা বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তারা। এ কারণে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও বাড়ছে ই-কমার্স খাতে।

গত জুলাই মাসে বৈশ্বিক ই-কমার্স ব্যবসা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জার্মান ওয়েব পোর্টাল স্ট্যাটিস্টা। স্ট্যাটিস্টার হিসাবে ২০২০ সালে বৈশ্বিক ই-কমার্স ব্যবসার বাজারের আকার দাঁড়াবে দুই লাখ কোটি ডলার। সবচেয়ে বড় বাজার চীন। এরপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি। স্ট্যাটিস্টার পূর্বাভাস বলছে, চলতি বছর বাংলাদেশে ই-কমার্সের আকার দাঁড়াবে ১৯৫ কোটি ডলারের বেশি। বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকা। তবে স্ট্যাটিস্টা করোনাকে মাথায় নিয়ে গত মে মাসের প্রক্ষেপণে বলেছিল, চলতি বছর বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতের বিক্রির পরিমাণ ২০৭ কোটি ডলারের বেশি হবে।

জানা যায়, দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি শুরু হয়। ওই সময় প্রচলিত পণ্যের বিপরীতে ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয় মুদি ও নিত্য ব্যবহার্য পণ্যের। ফরমায়েশের চার-পাঁচ গুণ বৃদ্ধি সামাল দিতে ব্যাপক সঙ্কটে পড়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো। পরে অবশ্য বেশির ভাগের ব্যবসা আবার বন্ধ হয়ে যায়। কেউ কেউ নিত্য পণ্য বিক্রি শুরু করে ব্যবসা চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। ই-কমার্সের প্রতি মানুষের এ নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কিছু অসৎ চক্র গ্রাহকদের সঙ্গে করছে প্রতারণা। অনলাইনে চটকদার বিজ্ঞাপন আর লোভনীয় অফার দেখে অনেক মানুষ পণ্য কিনে নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে দ্বিগুণ, তিনগুণ অফার কিংবা ক্যাশব্যাক দিচ্ছে অথচ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করছেন না। এছাড়া নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য সরবরাহ করে ক্রেতাদের ঠকাচ্ছেন। বর্তমানে ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ বা গ্রুপের মাধ্যমেও কেনাকাটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই ব্যক্তি উদ্যোগে পেজ খুলে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য সাইট কোনটি তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে ক্রেতাদের জন্য। এছাড়া অগ্রিম মূল্য পরিশোধ করেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ছে অধিকাংশ মানুষ। ক্যাশ অন ডেলিভারির ক্ষেত্রে ক্রেতাকে নির্দিষ্ট কুরিয়ার সার্ভিস প্রতিষ্ঠানে গিয়ে পণ্যের মূল্য পরিশোধ করে ডেলিভারি নেয়ার জন্য বলা হয়। পণ্য ডেলিভারি নেয়ার পর ক্রেতা দেখতে পান তাকে অন্য কোন পণ্য কিংবা নিম্নমানের পণ্য দেয়া হয়েছে। ক্রেতা পণ্য ফেরত দিতে চাইলে বলা হয়, ‘এ প্যাকেজের সঙ্গে রিটার্ন পলিসি না থাকায় রিটার্ন নেয়া সম্ভব নয়।’ কিংবা এ অবস্থায় বিক্রেতাকে ফেসবুকে নক করতে গিয়ে দেখা যায় তাকে আগেই ব্লক করে দেয়া হয়েছে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল জনকণ্ঠকে বলেন, ‘কোন গ্রাহক বা ক্রেতা সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে পণ্য বা সেবা কিনে প্রতারিত হয়ে আমাদের কাছে অভিযোগ করলে সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করি। ক্রেতা কোন সাইট থেকে পণ্য কিনে না পেলে, পেতে দেরি হলে, এক পণ্য অর্ডার করে ভিন্ন পণ্য পেলে কেউ যদি আমাদের কাছে অভিযোগ দেন, তাহলে সংগঠন থেকে দুই পক্ষকে ডেকে সমস্যার সমাধানের জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ফেসবুক নির্ভর ই-কমার্স (এফ-কমার্স) উদ্যোক্তার সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। এদের বেশিরভাগই আমাদের সদস্য নয়। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান বা আমাদের সদস্য নয় এমন কোন প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনে কেউ প্রতারিত হলে আমাদের কিছু করার থাকে না। পণ্য ক্রয়ের আগে ক্রেতারা যদি দেখে নেন ওই প্রতিষ্ঠান ই-ক্যাবের সদস্য কিনা, তাহলে প্রতারণার মতো ঘটনা ঘটলেও প্রতিকারের অন্তত একটা পথ খোলা থাকে। আমরা সালিশ বৈঠক করে অনেক সমস্যার সমাধান করেছি।’

ই-ভ্যালির অভিযোগে কাঠগড়ায় ই-কমার্স ॥ পণ্য কিনতে কখনও দ্বিগুণ, আবার কখনও তিনগুণ ক্যাশব্যাক অফার দিয়ে সম্প্রতি আলোচনায় আসে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ই-ভ্যালি। চমকপ্রদ এসব অফারে মাত্র দুই বছরের কম সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহক সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ৩৭ লাখ। মাসে লেনদেন গিয়ে ঠেকে ৩০০ কোটি টাকা। ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রির বিপরীতে ই-ভ্যালি কর দিয়েছে মাত্র দেড় কোটি টাকা। গড়ে প্রতি মাসে পণ্য বিক্রির অর্ডার এসেছে ১০ লাখ। পণ্য বিক্রিতে অস্বাভাবিক এমন উল্লম্ফন দেখে তদন্তে নেমেছে সরকারী সাতটি সংস্থা। সংস্থাগুলো হচ্ছে- দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। ‘ই-ভ্যালির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে গত ২৫ আগস্ট এফটিএ অনুবিভাগের যুগ্মসচিব মোঃ আবদুছ সামাদ আল আজাদকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এ কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন গত ৩ সেপ্টেম্বর বাণিজ্য সচিব ড. জাফর উদ্দীনের কাছে হস্তান্তর করেছে। তদন্ত কমিটি ই-ভ্যালির কার্যক্রমে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং সময় মতো পণ্য সরবরাহ না করাসহ নানা অভিযোগের সত্যতা পেয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অধিকতর তদন্তের জন্য গত রবিবার চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।’ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রাপ্ত অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ই-ভ্যালি ই-কমার্স প্লাটফর্মে অস্বাভাবিক হারে অফার দেয়, যা ই-ইন্ডাস্ট্রির জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া এসএমএস, ইমেল, কল সেন্টারে ই-ভ্যালির সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা এ বিষয়ে সাড়া দেয় না। এদিকে ই-ভ্যালির বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ ওঠায় প্রতিষ্ঠানটিসহ এর চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোঃ রাসেলের পরিচালিত সব ব্যাংক হিসাব স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে ই-ভ্যালির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোঃ রাসেল জনকণ্ঠকে বলেন, ‘ব্যবসার ধরনের দিক থেকে ই-ভ্যালি যথেষ্ট শক্তিশালী। আমাদের প্রথম লক্ষ্য ছিল অফার দিয়ে প্রচুর ক্রেতা-বিক্রেতা আনা। এ অফারগুলো নিয়েই এখন আমরা সমালোচনার মুখে পড়েছি কিছু ব্যক্তির কাছে। যারা হয়ত আমাদের অফারগুলোর ভুল ব্যাখ্যা করছেন। কারণ আমরা নির্দিষ্ট কিছুসংখ্যক পণ্যের ওপর অফার করি এবং সেটা খুবই সামান্য। যে ১৫০ শতাংশ ক্যাশব্যাক অফারের কথা বলা হচ্ছে, সেই দেড় শ’ শতাংশের মার্জিন আমরা কতটুকু পেয়েছিলাম বা সেই প্রোডাক্টটা (পণ্য) কোথা থেকে আসছে, এ বিষয়টি অনেকে স্কিপ করে যান।’

অভিযোগের শেষ নেই আলীবাবার দারাজেও ॥ এই মুহূর্তে ভোক্তা অধিকারে অভিযোগে শীর্ষে রয়েছে চীনা ই-কমার্স জায়ান্ট আলিবাবার দারাজ। শুধু ভোক্তা অধিকারে নয়, ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের সংগঠন ই-ক্যাবেও প্রতিদিন আসছে জালিয়াতি ও ক্রেতা ঠকানোর অনেক অভিযোগ। দারাজ সম্প্রতি দেশে পাঁচ বছর পূর্ণ করেছে। পরিমাণগত দিক থেকে বড় হলেও সেবার মান যে খুব বাড়েনি, তা ক্রেতাদের অভিযোগ দেখলেই বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ সময় মতো পণ্য না পৌঁছানো এবং এক পণ্যের ক্রয়াদেশ নিয়ে অন্য পণ্য দেয়া। সাম্প্রতিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সরকারের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ই-ক্যাবে আসা অভিযোগ পর্যালেচনা করে দেখা গেছে, কেউ পেমেন্ট করেছেন হেডফোনের দারাজ পাঠিয়েছে ওটিজি ক্যাবল। সম্প্রতি দারাজে স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৮ প্লাস ফোন অর্ডার করেছিলেন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের ভাকুড়া গ্রামের ব্যবসায়ী আমজাদ হোসেন লিটন। তিনি সুন্দরবন কুরিয়ারের মাধ্যমে পাঠানো প্যাকেট খোলার পর কাপড় কাঁচা সাবান দেখতে পান। এ ধরনের হাজার হাজার অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জনকণ্ঠকে জানান, ই-কমার্স, ফেসবুক কমার্সসহ (এফ কমার্স) বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। এগুলোর মধ্যে দারাজের বিরুদ্ধে অভিযোগই বেশি। ওই কর্মকর্তা জানান, সংস্থার অভিযোগ সেল ছাড়াও কয়েকটি মাধ্যম হয়ে অভিযোগ পান তারা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এটুআই প্রকল্প থেকেও অভিযোগ আসে। এসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে দারাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে অধিদফতর। বড় অঙ্কের জরিমানাসহ একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

‘ই-কমার্স পরিচালনা নীতিমালা’ প্রণয়ণের উদ্যোগ ॥ দেশে ই-কমার্স পরিচালনার জন্য নীতিমালা রয়েছে ‘ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা’ শিরোনামে। এই নীতিমালায় দেশে ই-কমার্স কিভাবে পরিচালিত হবে, বিদেশ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে এ দেশে ব্যবসায় করবে ইত্যাদি বিষয় তাতে উল্লেখ থাকলেও ই-কমার্স থেকে সেবা বা পণ্য কিনতে গিয়ে কোন সমস্যা হলে, পণ্য সময় মতো ডেলিভারি না পেলে, যে পণ্য অর্ডার করা হয়েছিল তা না পেলে ক্রেতারা কোথায় যাবেন, অভিযোগ করে কিভাবে প্রতিকার পাবেন তার কোন উল্লেখ নেই। এ লক্ষ্যে ‘ই-কমার্স পরিচালনা নীতিমালা’ প্রণয়ণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ভোক্তা তথা ক্রেতাদের স্বার্থের বিষয়টি নতুন নীতিমালায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। নতুন আইনে অপরাধ প্রমাণ হলে উদ্যোক্তাদের জেল জরিমানাসহ প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করার বিধান রাখা হচ্ছে। পরিচালনা নীতিমালা অনুযায়ী কোন ক্রেতা সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চুক্তি ও শর্ত অনুযায়ী পণ্য ডেলিভারি না পেলে প্রচলিত ভোক্তা আইনে মামলা করতে পারবেন। এছাড়া ভোক্তারা কখন কিভাবে অর্থ পরিশোধ করবেন সে লক্ষ্যে ডিজিটাল কমার্স পেমেন্ট সংক্রান্ত একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে চলতি বছরের মধ্যে ই-কমার্স পরিচালনা নীতিমালা আইনটির খসড়া করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এছাড়া আগামী বছরের শুরুতে ডিজিটাল কমার্স পেমেন্ট সংক্রান্ত আইনটির খসড়া করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের মহাপরিচালক মোঃ হাফিজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, ই-কমার্স ব্যবসা বিকশিত করার লক্ষ্যে জাতীয় ডিজিটাল বাণিজ্যিক নীতিমালা-২০১৮ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু এই ব্যবসার পরিধি যত বাড়ছে তত নতুন নতুন সম্ভাবনা ও কিছু সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এসব সমস্যা কিভাবে দ্রুত মোকাবেলা করে ই-কমার্স ব্যবসা বাড়ানো যায় সে লক্ষ্যে আরও দুটি নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে। এতে এই ব্যবসা কিভাবে পরিচালনা করা হবে সেজন্য পরিচালনা নীতিমালা এবং ভোক্তারা কখন কিভাবে অর্থ পরিশোধ করবেন সে লক্ষ্যে ডিজিটাল কমার্স পেমেন্ট সংক্রান্ত একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তবে চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে পরিচালনা নীতিমালা চূড়ান্ত করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। ভোক্তার স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মান ও ডেলিভারি দাম সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক একজন ক্রেতা জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতরে মামলা করতে পারবেন। এতে প্রতারিত ভোক্তা ক্ষতিপূরণ পাবেন। তিনি আরও জানান, ই-ভ্যালিসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলোর বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর ও প্রতিযোগিতা কমিশন তদন্ত চলছে। দোষ কিংবা অপরাধ প্রমাণ হলে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হতে পারে। পৃথিবীতে ই-কমার্স এগিয়ে গেলেও দেশে পণ্য ডেলিভারি, পেমেন্ট ব্যবস্থা, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও অর্থায়নসহ কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সরকার এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে কাজ করে যাচ্ছে। এদিকে ই-কমার্স খাতের নিয়ন্ত্রণে আইনের কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি বলেন, ‘ডিজিটাল সিকিউরিটি এ্যাক্টের মধ্যে একটি ধারা সংযোজন করে এ খাতের বিরাজমান বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। তা না-হলে ডিজিটাল কমার্স নামে একটি পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি করা যেতে পারে। আইন করা না হলে ই-কমার্স খাতে যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।’

প্রতারিত হলে আছে ভোক্তা অধিকার অধিদফতর ॥ ই-কমার্স থেকে সেবা নিতে গিয়ে প্রতারিত হলে অভিযোগ জানানো যাবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে। এই অধিদফতরে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। অধিদফতরের উপ-পরিচালক মাসুম আরেফিন জানান, সাধারণত তিন উপায়ে অভিযোগকারীদের সমাধান দেয়া হয়। প্রথমত, দুই পক্ষকে আপোস করতে বলা হয়। এই উদ্যোগে সমাধান হয় অনেক সময়। যদি অপরাধ প্রমাণ হয় তাহলে শাস্তির বিধান আছে। অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। জরিমানার ২৫ শতাংশ অর্থ অভিযোগকারীকে দেয়া হয়। আর যদি কোন অপরাধ প্রমাণিত না হয় তাহলে অভিযোগ খারিজ করে দেয়া হয়। কোন ই-কমার্স সাইট থেকে পণ্য বা সেবা কিনে নির্দিষ্ট সময়ের (টার্মস এ্যান্ড কন্ডিশন অনুযায়ী) মধ্যে না পাওয়া, প্রতিষ্ঠানকে বার বার তাগাদা দিয়েও তা না পেলে ৩০ দিনের মধ্যে অধিদফতরে অভিযোগ করা যাবে। ১৬১২১ নম্বরে ফোন করেও অভিযোগ করার সুযোগ রয়েছে। তবে ই-কমার্সে ভোক্তাদের স্বার্থ নিশ্চিত করতে আরও কঠোর হচ্ছে জাতীয় ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদফতর। এ কারণে অধিদফতর ভোক্তা অধিকার সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট পক্ষসমূহের মার্কেট প্লেস, উদ্যোক্তা, ডেলিভারি সিস্টেম, পেমেন্ট সিস্টেম ইত্যাদির মধ্যে চুক্তি সম্পাদন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, ডিজিটাল কমার্স সংশ্লিষ্ট পেমেন্ট ও পণ্য ডেলিভারির ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট অপারেশনাল গাইড লাইন প্রণয়ন করা হবে। এছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় গঠিত কেন্দ্রীয় সেল এ বিষয়ে সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় সাধন করার জন্য নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। ভোক্তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোড অব কন্ডাক্ট প্রণয়ন করা হবে। এতে ই-কমার্স পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অপরাধ প্রমাণিত হলে আইনী কাঠামোর মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে সরকার।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT