ঢাকা, রবিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

এক বিদ্যালয়ের ৬৭ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে

প্রকাশিত : 08:35 AM, 8 September 2021 Wednesday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

করোনাকালে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় অপ্রাপ্ত বয়সী অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়ে গেছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষক, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ এমনকি পাড়া-প্রতিবেশীরাও এসব বিয়ের আগে খোঁজ পাননি। বিয়ে হওয়ার পরে তা জানাজানি হয়েছে। অপরদিকে বিয়ের আগে খবর পাওয়া গেলে প্রশাসনের উদ্যোগে তা বন্ধ করা হয়েছে।

২০১৪ সালের মার্চ মাসে সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলাকে বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষণা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৬ সালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলাকে বাল্যবিবাহ মুক্ত ঘোষণা করে ঢাকঢোল পেটানো হয়।

এ সময় শিক্ষার্থীদের হাতে লাল কার্ড পৌঁছে দেওয়া হয়। বাল্যবিবাহ বন্ধে তৎপরতা থাকলেও পরবর্তীতে তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। ফলে বাল্যবিবাহপ্রবণ সাতক্ষীরা জেলায় একের পর এক এ ঘটনা ঘটতে থাকে।

এদিকে করোনা মহামারীর কারণে প্রায় ১৮ মাস যাবত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা তাদের অনেক মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে তারা বলেন, এলাকায় বখাটেদের উৎপাত, উত্ত্যক্ত করা, অপরহরণচেষ্টা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যাসিড নিক্ষেপের আতঙ্কে তারা তাদের মেয়েকে বয়স পূর্ণ না হতেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সাতক্ষীরার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ কমিটির প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাকিবুর রহমান বিভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, সদর উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৬৭ জন ছাত্রী সাম্প্রতিক করোনাকালে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছে। তাদের কেউ ছিল এসএসসি পরীক্ষার্থী, অন্যরা ছিল ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাসের ছাত্রী। কেবলমাত্র অভিভাবকরাই সবাইকে গোপন করে এ বিয়ে দিয়েছেন। এর সঙ্গে জড়িত হয়ে গেছেন একশ্রেণির বিবাহ রেজিস্ট্রার ও নোটারি পাবলিক। যারা জাল কাগজপত্র তৈরি করে বিয়ে সম্পন্ন করেছেন। ওই বিদ্যালয়ের ছাত্রী সংখ্যা ৪৭০ জন বলে জানান তিনি।

সাকিবুর রহমান জানান, বাল্যবিবাহের শিকার শিক্ষার্থীদের বয়স সর্বোচ্চ ১৭ বছর। এর মধ্যে বেশিরভাগ ১৬ বছর অথবা তার নিচে। ষষ্ঠ শ্রেণির ৪ জন এবং সপ্তম শ্রেণির ৩ জনসহ ৭ জন এ বিবাহের শিকার হয়েছে।

আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দেবহাটার কুলিয়ার পুষ্পকাটী ও হিরারচক গ্রাম এবং আলীপুর ইউনিয়নের আলীপুর ও তালবাড়িয়ার ছাত্রীরা লেখাপড়া করে বেশি। এই ৪ গ্রামের মেয়েদের বাল্যবিয়ে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

বেসরকারি সংস্থা এনসিটিএফের জরিপের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ২০২০ সালে এই ইউনিয়নে ৮৭টি বাল্যবিবাহ হয়। অপরদিকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাল্যবিবাহ হয়েছে ৬৭ জনের।

তিনি আরও জানান, বাল্যবিবাহের এই গতি রোধে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সহায়তায় চলতি বছরে ৪৯টি বাল্যবিবাহ আমরা প্রতিরোধ করতে পেরেছি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ বলেন, স্কুল চলাকালে আমি নিজে এবং আমার একজন সহকারী শিক্ষককে নিয়ে আশপাশের গ্রামে ও পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে প্রতিদিনই বাল্যবিবাহের খোঁজখবর নিতাম। ফলে কোনো বাল্যবিবাহ হওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে করোনাকালে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় এ সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়েরা স্কুলে আসেনি, আমরাও স্কুলে যাইনি।

তিনি বলেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার সুযোগে গ্রামে গ্রামে এসব বিয়ে হয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত ৩৫টি বাল্যবিয়ের সুনির্দিষ্ট তথ্য আমি পেয়েছি। তাদের অনেকেই স্কুলে আসছে এবং অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিচ্ছে। স্কুল খুলে যাওয়ায় বাল্যবিবাহ রোধ করা সহজ হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, আমরা খবর পেলেই সাতক্ষীরার ইউএনও, জেলা শিক্ষা অফিসার এবং প্রয়োজনে জেলা প্রশাসককেও বাল্যবিবাহের আয়োজনের খবর দিয়েছি। প্রশাসনিক উদ্যোগে সেসব বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফাতেমা তুজ জোহরা জানান, চলতি বছর আমরা ৪৯টি বাল্যবিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। তবে অনেক মেয়ের বিয়ে হয়েছে নিজের বাড়ি ও গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও।

তিনি বলেন, করোনাকালে আমরা সবাইকে ঘরে থাকার কথা জানিয়েছি। এ সুযোগে সামাজিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা দেখা দেয়। ফলে অভিভাবকরা গোপনে তাদের মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। এখন সবকিছু খুলে দেওয়ায় বাল্যবিবাহ রোধ সহজ হবে।

বাল্যবিয়ের শিকার কয়েক শিক্ষার্থীর নাম পাওয়া গেছে। এরা হলো- আলীপুর ও কুলিয়া ইউনিয়নের স্কুলছাত্রী সোনামনি, মুক্তা, আজমিরা খাতুন, আজমিরা বেগম, আয়েশা খাতুন ও খাদিজা খাতুন। তারা সবাই এখন শ্বশুরবাড়িতে। বিদ্যালয়ে তারা আর ফিরবে কিনা তা নিশ্চিত নয়।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT