সোমবার ১৭ জানুয়ারি ২০২২, ৪ঠা মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

একান্ত সাক্ষাৎকারে আইভী ও তৈমুর নাসিকে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে নানা শঙ্কা

প্রকাশিত : 06:50 AM, 14 January 2022 Friday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

আগামী ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচন। এ ভোটকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ। দেশবাসীর নজরও সেদিকে।

ভোটের নানা সমীকরণে অনেকটা উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নির্বাচন। তবে মূল ফোকাস সরকারদলীয় প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে ঘিরেই। জয়ের ব্যাপারে দুজনই আশাবাদী। তবে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে তাদের মধ্যে রয়েছে শঙ্কাও।

আইভী বলেছেন, সুষ্ঠু ভোট হলে আমি জয়যুক্ত হব ইনশাল্লাহ। তবে আমার জয় রোধে একটি মহল চেষ্টা করবে। অপরদিকে তৈমুর বলেছেন, সরকারদলীয় প্রার্থীকে জয়ী করতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। সুষ্ঠু ভোট হলে হাতির পাড়ায় এবার নৌকা ডুববে।

মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জে নিজ নিজ বাসায় সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে দুই হেভিওয়েট মেয়র প্রার্থী এসব কথা বলেন। তাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র রিপোর্টার-হাবিবুর রহমান খান ও কাজী জেবেল।

আমার জয় রোধে একটি মহল চেষ্টা করবে: ডা. আইভী

প্রশ্ন : প্রচার কেমন চলছে?

উত্তর : সারা দিন প্রচারণা করি। সকাল ও বিকাল মিলিয়ে প্রতিদিন দুটি করে ওয়ার্ডে প্রচারণা করি। জোরেশোরেই প্রচার করছি।

প্রশ্ন : প্রচার চালাতে কি কি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে?

উত্তর : আসলে প্রচারণা চালাতে তেমন কোনো চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছে না। কারণ এই শহরের প্রত্যেকটি মানুষের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে নারী ভোটার ও বাচ্চাদের সঙ্গে। খুব সহজেই তাদের কাছে যেতে পারছি। তার মানে এই নয় যে, পুরুষ ভোটারদের সঙ্গে আমার দূরত্ব রয়েছে। সবার সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। যার ফলে সাড়া পাচ্ছি ভীষণভাবে। আবার অনেক দিন পর সবার সঙ্গে দেখা পাচ্ছি-সেটাও ভালো লাগছে। মেয়র দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন কাজে যেতাম। ওই কাজটি থাকত মূল লক্ষ্য। আর নির্বাচনের সময়ে সবার সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশে যাচ্ছি। সবার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। ভালো লাগছে।

প্রশ্ন : নির্বাচনের পরিবেশ এখন পর্যন্ত কেমন?

উত্তর : আমি বলব, এখন পর্যন্ত ভালো। কিন্তু এই ভালো কতক্ষণ থাকবে তা আমি জানি না। মাঝেমধ্যে কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি খুব বেশি দেখতে পাচ্ছি। হোন্ডা বাহিনীর মহড়া দেখছি। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত পরিবেশ ভালো আছে। ১৬ জানুয়ারি ভোটের দিন বা তার পরেও পরিবেশ ভালো থাকে সেই ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করছি। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ঐতিহ্য হচ্ছে নির্বাচনে টানটান উত্তেজনা থাকে, কিন্তু ভালোভাবে ভোটগ্রহণ হয়। সেই ভালোটাকে প্রাধান্য দিয়ে ভোটগ্রহণ যেন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও ভীতিহীন পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয় এবং নারায়ণগঞ্জবাসী যেন ভালো থাকেন-সেজন্য প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করেছি।

প্রশ্ন : কিশোর গ্যাং বা হোন্ডা বাহিনীর নেপথ্যে কারা আছে বলে মনে করেন?

উত্তর : নেপথ্যে কারা এটা সবাই জানে। নির্বাচনের এ মুহূর্তে এ বিষয়ে বলে কোনো কিছুকে বিতর্কিত করতে চাই না। তবে নেপথ্যে কারা তা শহরবাসী জানেন, প্রশাসন জানে, সাংবাদিকরাও জানেন। যাই হোক, এটা চলছে, হয়তো চলবে। নির্বাচনের সময় এটা বন্ধ করতে হবে। কোনো অপশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে নির্বাচন যেন বানচাল করতে না পারে, ভোটকেন্দ্র বন্ধ করতে না পারে। সুষ্ঠুভাবে ভোট হলে আমি ইনশাআল্লাহ জয়যুক্ত হব। আমার এই জয়কে রোধ করার জন্য একটি মহল চেষ্টা করবে।

প্রশ্ন : জয় রোধের বাধা কী তৈমুর আলম খন্দকার নাকি অন্য কেউ?

উত্তর : এটা পরিষ্কার। তৈমুর কাকা কাদের প্রার্থী তা নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে স্পষ্ট-এটা আমি বলছি না। জনগণই বলছেন, মানুষ বলছেন, ভোটাররা বলছেন। ভোটকেন্দ্রে যেন সবাই নির্বিঘ্নে যেতে পারেন সেটা নিয়েই আমি শঙ্কিত। ভোট ঠিকমতো দিতে পারলে আমি জয়ী হব। এটা শতভাগ গ্যারান্টি দিতে পারি।

প্রশ্ন : ভোটের দিন সহিংসতার আশঙ্কা কেন?

উত্তর : আমি আশঙ্কা করছি এটা হতে পারে। হবে যে এমন কোনো কথা না। ২০১১ ও ২০১৬ সালের নির্বাচনে অনেক কিছুই হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমন স্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করেছিল যে মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছিল, কোনো অরাজকতা তৈরি হয়নি। এখনও অরাজকতা তৈরি হয়নি। যেহেতু আমি প্রার্থী, যে দলেরই হোক না কেন, প্রার্থী হিসাবে আমি চাইব পরিবেশ যেন সুন্দর-স্বাভাবিক থাকে। তিনি বলেন, আমার এ শঙ্কার নেপথ্য হচ্ছে, তৈমুর আলম যদি শুধু বিএনপির প্রার্থী হতেন তাহলে এমন আশঙ্কা করতাম না। যেহেতু উনার পেছনে আরেকজন যুক্ত হয়েছেন, যিনি ২০১১ সালে আমার সঙ্গে নির্বাচন করে হেরেছিলেন তাই সবকিছু মিলিয়ে আমার কাছে সন্দেহ মনে হচ্ছে।

প্রশ্ন : ২০১১ সালে প্রতিপক্ষ ছিলেন একেএম শামীম ওসমান। আপনি তাকে সন্দেহ করছেন কিনা?

উত্তর : আমি কোনো আশঙ্কা করতে চাচ্ছি না। তবে জনগণ মনে করছে।

প্রশ্ন : শামীম ওসমান তো নৌকার পক্ষে মাঠে নামার ঘোষণা দিয়েছেন।

উত্তর : উনারতো মাঠে নামার সুযোগ নেই। নির্বাচনের আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী উনি মাঠে নামতে পারবেন না। আমি ঠিক জানি না উনি কেন কী বলেছেন। নিয়ম অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য মাঠে নামতে পারেন না। উনি কি বলেছেন আমি সঠিকভাবে জানি না।

প্রশ্ন : ট্যাক্স বেড়েছে, সেবা বাড়েনি- তৈমুর আলম খন্দকারের এ অভিযোগের বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

উত্তর : এ অভিযোগ সত্য নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে সাখাওয়াত সাহেব (বিএনপি প্রার্থী) একই অভিযোগ করেছিলেন। এখন একই বক্তব্য দিচ্ছেন তৈমুর কাকা। আসলে পাঁচ বছর পরপর ট্যাক্স অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। যদি ট্যাক্স বাড়াতাম তাহলে জনগণই অভিযোগ করতেন। উলটো করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত দেড় বছর ট্যাক্সই আদায় করিনি। তাহলে কোথায় ট্যাক্স বাড়ালাম। তবে পানির তিন শতাংশ ফি যুক্ত হয়েছে। আগে ঢাকা ওয়াসা এই টাকা নিত। এখন সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ওয়াসা যুক্ত হয়েছে। আপনি পানি নিচ্ছেন, সেই ফি দিবেন না? তবে প্রশ্ন উঠেছে, যেসব জায়গায় পানির লাইন নেই তারা কেন এ ফি দিবেন। আমি মনে করি, এটা যুক্তিযুক্ত। আমি নির্বাচিত হলে যেসব ওয়ার্ডে পানির লাইন নেই, সেই তিন শতাংশ ট্যাক্স বাদ দিয়ে দেব।

প্রশ্ন : বারবার জয়ে ভূমিকা কার বেশি?

উত্তর : ভূমিকা সবসময় জনগণের। তারা আমাকে বারবার ভোট দেন। কারণ আমি ব্যাপকভাবে উন্নয়ন করেছি। উন্নয়ন কার্যক্রম এখন দৃশ্যমান। আমি কখনও চাঁদাবাজি করিনি, সন্ত্রাস করিনি। আমি যতটুকু পেরেছি চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, খুন-খারাবির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছি। জনগণ আমাকে আস্থার সঙ্গে নিয়েছে। আমার কাজের জন্য আমাকে মূল্যায়ন করেছে। তাদের জন্য, এ নারায়ণগঞ্জ শহরের জন্য আমি ক্ষতিকারক কেউ না-সেটা জনগণ মনে করে। আমি পারলে উপকার করি, না পারলে চুপ থাকি।

প্রশ্ন : গত নির্বাচনের প্রতিশ্রুতির কতভাগ বাস্তবায়ন করেছেন?

উত্তর : আমি যা বলেছি তার ৮০ ভাগ বাস্তবায়ন করেছি। আমার কাজ বাকি আছে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর ব্রিজ নির্মাণ কাজ। এ ব্রিজের কাজ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। অনেক কাজ এগিয়ে গেছে। এখন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় আছে। ড্রয়িং-ডিজাইন হয়ে গেছে। আশা করছি, দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সেতুর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করতে পারবেন। এছাড়াও অনেক কাজ করেছি, অনেক কাজ চলমান। নারায়ণগঞ্জে ১৮ একর জমির ওপর শেখ রাসেল পার্ক করেছি। যতগুলো খাল আছে সেগুলো অগ্রাধিকার দিয়ে খনন করছি। ৫.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সিদ্ধিরগঞ্জ লেক খনন করেছি। সৌন্দর্যবর্ধন কাজ চলছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত পরিমাণ রাস্তাঘাট নির্মাণ হয়েছে। আমি বলব, ১০ শতাংশের মতো ড্রেনেজ সিস্টেমের কাজ বাকি আছে; যেগুলো অলিগলিতে রয়েছে। চারটি স্কুল করেছি। চারটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। আরও তিনটি মসজিদ নির্মাণের টেন্ডার করেছি। মন্দির, শশ্মান, কবরস্থানের কাজ করেছি। ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করেছি। পুকুর খনন করে বাঁধাই করেছি। জলাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করেছি। ভারি বর্ষণ হলে আধ ঘণ্টার মধ্যে পানি চলে যায়। শীতলক্ষ্যা নদীর পানি দূষিত যাতে না হয়, সেজন্য ইটিপিতে শোধন করে ড্রেনের পানি নদীতে দিতে চাচ্ছি।

প্রশ্ন : নগরীতে আবর্জনা ও যানজটের মতো বড় সমস্যা রয়ে গেছে।

উত্তর : আবর্জনার সমস্যা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে। কারণ সিদ্ধিরগঞ্জে ২৩ একর জমি অধিগ্রহণ করেছি। সেখানে একটি বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন করার জন্য চুক্তি হয়েছে। ওই প্ল্যান্টে আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। সেখানেই আবর্জনা চলে যাবে। এছাড়া কদমরসুল এলাকায় ৭২ একর জমি অধিগ্রহণ করেছি। দাতা সংস্থার মাধ্যমে সেখানেও প্রকল্প নেওয়ার চেষ্টা করছি। এসব প্রকল্প হয়ে গেলে আবর্জনার সমস্যা থাকবে না। আর যানজট সিটি করপোরেশনের ব্যাপার নয়। এটার জন্য আলাদা রেগুলেটরি বডি আছে। তবুও অনেক সময় আমাদের দেখতে হয়। সাধারণ মানুষ মনে করেন এটাও আমাদের দেখভাল করার ব্যাপার। এটার কথা চিন্তা করে ট্রান্সপোর্ট মাস্টার প্ল্যান করছি। এমআরটি-২ ও ৪ এই দুটি মেট্রোরেল নারায়ণগঞ্জ আসবে। ঢাকা ও গাজীপুরের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হলে নারায়ণগঞ্জে শুরু হবে। এগুলো সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়া শহরে অনেক রিকশা-অটো আছে সত্য। বাস ও ট্রাক স্ট্যান্ড শহরের বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করছি। এর আগেও শহরের বাইরে একটি ট্রাক স্ট্যান্ড করেছি। কিন্তু সেখানে ট্রাক না রেখে শহরে রাস্তার ওপর রেখে দেয়। প্রশাসন একটু সহযোগিতা করলে কাজটা সহজ হয়। অনেক সময় প্রশাসনও পেরে উঠে না। আমাদের সচেতনতার একটু অভাব আছে।

প্রশ্ন : এবার নির্বাচনে মেয়র পদে জয়ী হলে কোনো কাজ প্রাধান্য দেবেন?

উত্তর : প্রথমে শীতলক্ষ্যা নদীর উপর কদমরসুল ব্রিজ নির্মাণ কাজে প্রাধান্য দেব। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ওয়াসার পানি সরবরাহ কাজে অগ্রাধিকার দেব। ওয়াসাই এখন আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। এডিবি ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প দিয়েছে। ওয়াসা পানিতে একটু ময়লা পাওয়া যাচ্ছে। এ নিয়ে অভিযোগ আসছে। এ কাজে সময় দেব।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

এই বিভাগের জনপ্রিয়

© ২০২২ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT