ঢাকা, মঙ্গলবার ২৬ অক্টোবর ২০২১, ১১ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে সাইবার ক্রাইম, শিকারের ৬৮ ভাগ নারী

প্রকাশিত : 11:15 AM, 2 November 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

সারাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে সাইবার ক্রাইম উদ্বেগজনকহারে বাড়ছে। এই ধরনের প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটছে সহিংস উগ্রবাদ, গুজব, রাজনৈতিক অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ, গ্যাং কালচার, আত্মহত্যা, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, পাইরেসি, আসক্তি ইত্যাদি ধরনের অপরাধ। বাস্তব জীবনে ঘটমান অপরাধগুলো এখন স্থানান্তরিত হয়ে রূপ নিচ্ছে ডিজিটালে। সাইবার অপরাধে আক্রান্তের জরিপে বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বেশিরভাগ ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের কম। পরিসংখ্যানে ভুক্তভোগীদের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিশু। ১৮ বছরের কম বয়সী এই ভুক্তভোগীদের হার ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। সাইবার ক্রাইমের শিকার হচ্ছে ৬৮ শতাংশ নারী। অপরাধের শিকার একটি বড় অংশই অভিযোগ করেন না। সাইবার ক্রাইম এ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) এর গবেষণা প্রতিবেদনে এই ধরনের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ সাইবার ক্রাইমের তদন্ত করছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে সাইবার অপরাধীরা। প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে জমা পড়ছে শতশত অভিযোগ। ছোটখাটো ঝামেলা, সম্পর্কে টানাপোড়েন হলেই প্রেমিকার আপত্তিকর ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে তরুণরা। এমনকি স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হলে তাকে অনলাইন মাধ্যমে হেনস্তা করছে স্বামী। শিক্ষিত লোকজনের মধ্যেই এ ধরনের অপরাধপ্রবণতা বেশি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার করে পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, যৌন হয়রানি হচ্ছে হরহামেশা। ভুয়া এ্যাকাউন্ট খুলে মানহানি, বিভ্রান্তিককর পোস্ট, গুজব ছড়ানোর ঘটনা তো আছেই। জঙ্গী কার্যক্রম, প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধের অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে জমা পড়ছে বলে জানা গেছে।

সাইবার ক্রাইম এ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) এর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে সমান্তরাল হারে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। সহিংস উগ্রবাদ, গুজব, রাজনৈতিক অপপ্রচার, মিথ্যা সংবাদ, গ্যাং কালচার, আত্মহত্যা, পর্নোগ্রাফি, সাইবার বুলিং, জালিয়াতি, চাঁদাবাজি, পাইরেসি, আসক্তি- এর সবই হচ্ছে প্রযুক্তির মাধ্যমে। বাস্তব জীবনে ঘটমান অপরাধগুলো এখন ডিজিটাল মাধ্যমে স্থানান্তরিত হচ্ছে। কৃষক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক পর্যন্ত সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছেন। অথচ এই ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ভার্চুয়াল জগতের বাসিন্দা হলেও বিশ্বনাগরিক হিসেবে ব্যবহারকারীদের সিংহভাগই সচেতন নন। অন্তর্জালে যুক্ত হতে গিয়ে ইচ্ছে-অনিচ্ছায় জড়িয়ে পড়ছেন ভ্রান্তির-জালে। এভাবেই অপরাধের ডিজিটাল রূপান্তর মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে বলে গবেষণা প্রতিবেদনের দাবি করা হয়েছে।

সাইবার ক্রাইম এ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন (সিসিএ ফাউন্ডেশন) এর গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের প্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১১ ধাপে অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এরমধ্যে চারটিই নতুন ধারার অপরাধ। এই অপরাধের শিকার হওয়াদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ব্যক্তি পর্যায়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে চালানো জরিপে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে দেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকি দেয়ার ঘটনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কপিরাইট আইন লঙ্ঘন, অনলাইনে পণ্য বিক্রি করতে গিয়ে প্রতারণা এবং অনলাইনে কাজ করিয়ে নেয়ার কথা বলে প্রতারণা। সাইবার অপরাধে আক্রান্তদের মধ্যে ফোনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির শিকার হচ্ছেন ৬ দশমিক ৫১ শতাংশ। কপিরাইট লঙ্ঘনের মাত্রা ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ দখল করেছে। অনলাইনে কাজ করিয়ে নিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে ১ দশমিক ৪০ শতাংশ। জরিপের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এগুলো দেশে নতুন ধরনের অপরাধ। আর এতদিন পণ্য কিনে প্রতারণার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটলেও এবার সামনে এসেছে এর ব্যতিক্রমী ঘটনা। অনলাইনে বিক্রীত পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২০১৮ সালের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েছে পর্নোগ্রাফি। এই অপরাধ ২ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। অনলাইনে বার্তা পাঠিয়ে হুমকির ঘটনা ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচারের ঘটনা কিছুটা কমলেও এখনও তা আশঙ্কাজনক। ভুক্তভোগীদের ২২ দশমিক ৩৩ শতাংশই এই ধরনের অপরাধের শিকার হচ্ছেন। ছবি বিকৃত করে অনলাইনে অপপ্রচারের ঘটনা রয়েছে আগের মতোই। এবার এই হার ১৫ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

দেশে ই-কমার্সের জনপ্রিয়তা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতারণাও। ভুক্তভোগীদের ৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ এই অপরাধের শিকার, যা আগের প্রতিবেদনে ছিল ৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। তবে সময়ের সঙ্গে অনলাইন ব্যাংকিং এ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা কমেছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বয়সভিত্তিক আক্রান্তের ঘটনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এদের মধ্যে বেশিরভাগ ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের কম। পরিসংখ্যানে ভুক্তভোগীদের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শিশু। ১৮ বছরের কম বয়সী এই ভুক্তভোগীদের হার ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। জরিপে অংশ নেয়াদের একটি বড় অংশ বলেছেন, অপরাধের শিকার হয়েও তারা আইনের আশ্রয় নেন না। এটা প্রায় ৮০ দশমিক ৬ শতাংশ। যারা আইনের আশ্রয় নেন তাদের মাত্র ১৯ দশমিক ২ শতাংশ আইনী সহায়তার চেয়ে আশানুরূপ ফল পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতে ১০ দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে, নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাইবার পাঠ অন্তর্ভুক্ত করা, অফিস-আদালত সৎ ও নৈতিক জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে দক্ষ প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানো, সাইবার নিরাপত্তায় দেশী প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দেয়া, প্রযুক্তি সেবায় দেশী প্রযুক্তিকে জনপ্রিয় করা।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, সাইবার অপরাধ দিনে দিনে বাড়ছে। পর্নোগ্রাফি থেকে শুরু করে অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রতারণার ঘটনায় প্রতিমাসেই ভুক্তভোগীরা আইনী সহায়তার জন্য আসেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে বিকাশে টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনায়।

পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (সিডিএমএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে দেশে প্রচলিত সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনে ১ হাজার ৫৫টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় ৩৩৩টি মামলা হয়, যা মোট মামলার ৩১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। একই সময়ে সাইবার অপরাধের শিকার হওয়ার এক হাজার ৭৬৫টি অভিযোগ জমা হয়েছে। তাছাড়া এই বিভাগের ফেসবুক পেজে মাসে সহস্রাধিক ব্যক্তি সাইবার অপরাধের শিকার হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের ঘটনায় ২০১৫ সালে ৭৩৪টি, ২০১৬ সালে ১ হাজার ৮৫টি, ২০১৭ সালে ১ হাজার ২৬৪টি ও ২০১৮ সালে এক হাজার ৩৮৮টি মামলা করেছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের বয়স বিশ্লেষণ করে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সী ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি সাইবার অপরাধের শিকার হন। মোট ভুক্তভোগীদের ৩৪ শতাংশই এই বয়সী। ৫৫ বা তদুর্ধ বয়সের ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে কম অপরাধের শিকার হয়েছেন। এদের হার দুই শতাংশ। শূন্য থেকে ১৮ বছর বয়সী ব্যবহারকারীরা ৬ শতাংশ, ২৬ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা ৩১ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৫৫ বছর বয়সীরা ২৭ শতাংশ সাইবার অপরাধের শিকার হন

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT