ঢাকা, সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

আলেয়া সিরাজ ও লুৎফারা ভাল নেই

প্রকাশিত : 09:59 AM, 27 December 2020 Sunday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

নিতান্ত শখে কিশোরী বয়সে যাত্রাপালায় অভিনয় শুরু করেছিলেন মনোয়ারা বেগম (ছদ্মনাম)। প্রচুর যশ-খ্যাতি অর্জনের পর একসময় অভিনয়কেই বেছে নিয়েছিলেন জীবিকা নির্বাহের পথ হিসেবে। আর তা করেই চালাচ্ছিলেন সংসার। কিন্তু হঠাৎ করে আসা করোনাভাইরাস পরিস্থিতি এই শিল্পীকে রীতিমতো পথে বসিয়ে দিয়েছে। যাত্রাপালা বন্ধ থাকায় ষাটোর্ধ এই নারীকে খুঁজে নিতে হয়েছে গৃহকর্মীর কাজ।

নেত্রকোনা শহরের সাতপাই রেলক্রসিং এলাকায় গড়ে ওঠা যাত্রাপল্লীতে এমন আরও অনেক মনোয়ারা আছেন- যাদের দিন কাটছে খেয়ে না খেয়ে। এদের কেউ ছাত্রাবাসে (মেসে) রান্নার কাজ করছেন। কেউ গার্মেন্টসে চলে গেছেন। আবার কেউ কেউ বেচতে বাধ্য হচ্ছেন সহায়-সম্বল। অথবা দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চালাচ্ছেন সংসার। একই অবস্থা পুরুষ শিল্পীদেরও। তারাও কেউ কেউ রিক্সা বা অটো চালাচ্ছেন। সেলুনে চুল কাটছেন অথবা করছেন রাজমিস্ত্রির কাজ। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি রীতিমতো দিশেহারা করে ফেলেছে এই শিল্পীদের অথচ দশমাস আগেও তারা নবাব সিরাজ, মীরজাফর, মোহনলাল, আলেয়া বা লুৎফার মতো নানা চরিত্রে সেজে মঞ্চে উঠতেন; সমাজের অসঙ্গতি, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ বা ইতিহাসের নানা কাহিনী ফুটিয়ে তুলে রাতভর মাতিয়ে রাখতেন হাজারও দর্শক। যুগযুগ ধরে যারা লোকসংস্কৃতির এই গৌরবময় ঐতিহ্যটিকে টিকিয়ে রেখেছেন তারা কেউই আজ ভাল নেই। নিদারুণ বাস্তবতায় সবাই এখন অভিনয় জগতের বাইরে।

লোকসংস্কৃতির জেলা নেত্রকোনা যাত্রাশিল্পের জন্যও প্রসিদ্ধ। সারাদেশে ছড়িয়ে আছে এখানকার শিল্পীদের সুনাম। তাই স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি একসময় খুলনা, বাগেরহাট ও গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলার যাত্রাশিল্পীরা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তাদের নিয়ে জেলা শহরের সাতপাই রেলক্রসিং এলাকায় গড়ে ওঠে একটি যাত্রাপল্লী। এর বাইরে জেলার মোহনগঞ্জ, কেন্দুয়া, বারহাট্টা, মদন ও আটপাড়াসহ ১০ উপজেলাতেই যাত্রার প্রচুর কলাকুশলী ছড়িয়ে আছেনÑ যারা এটিকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে তাদের সংখ্যা সাড়ে তিন শ’র বেশি। এদের মধ্যে নারীশিল্পীর সংখ্যা ১শ’ ২০। এদের বাইরে পাঁচ শতাধিক অপেশাদার শিল্পীও আছেন এ জেলার গ্রামগঞ্জে।

বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক দীন ইসলাম জানান, নেত্রকোনায় বন্ধন অপেরা, ঝলমল অপেরা, নেত্রকথন নাট্য গোষ্ঠী ও কৃষ্ণা অপেরা নামে চারটি নিবন্ধিত বাণিজ্যিক যাত্রাদল আছে। এসব দল সারাবছর বিভিন্ন জেলায় গিয়ে যাত্রাপালা মঞ্চস্থ করত। একেকটি দলে ৪০ থেকে ৫০ জন করে কলাকুশলী মাসিক বেতনে চাকরি করতেন। এদের মধ্যে অভিনেতা-অভিনেত্রী ছাড়াও রয়েছেন পরিচালক, নির্দেশক, বাদ্যযন্ত্রী, প্রম্পটার (স্মারক), বিবেক, মেকাপম্যান, শব্দ নিয়ন্ত্রক, বিদ্যুত মিস্ত্রি, বাবুর্চি, হেল্পার প্রভৃতি। গত মার্চ মাসে করোনা সংক্রমণ শুরুর পর সরকার সব ধরনের জনসমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ কারণে অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মতো যাত্রাপালাও বন্ধ হয়ে যায়। সাধারণত দুর্গোৎসবের সপ্তমী পূজার দিন থেকে যাত্রার মৌসুম শুরু হয়। কিন্তু কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে এবার কোন দলই কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।

এদিকে যাত্রাশিল্পকে কেন্দ্র করে জেলা সদরের সাতপাই এবং মোহনগঞ্জ ও কেন্দুয়া উপজেলায় ১২-১৩টি সাজঘরের (ড্রেস হাউজ) ব্যবসা ছিল। এসব সাজঘর থেকে ভাড়া দেয়া হতো বাদ্যযন্ত্র, বাদ্যযন্ত্রী, পোশাক, অভিনেতা-অভিনেত্রী, নৃত্যশিল্পী ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ যাত্রাপালায় প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সরঞ্জামাদি। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে বেশিরভাগ সাজঘরের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। আটকে গেছে অনেকের ঘরভাড়া। পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন এসব ব্যবসায়ী।

কাজ না থাকায় বেশিরভাগ যাত্রাশিল্পী এখন বেকার দিনযাপন করছেন। কেউ কেউ জড়িত হচ্ছেন বিকল্প পেশায়। যেমন সাতপাই এলাকার চন্দন সরকার আগে যাত্রাদলে নায়কের অভিনয় করতেন। পালা বন্ধ থাকায় তিনি এখন রেলক্রসিং বাজারে চালের ব্যবসা করছেন। বাদ্যযন্ত্রী পরিমল সরকার এবং নিধু দাস চালাচ্ছেন রিক্সা। কাজল চন্দ্র শীল চুল-দাড়ি কাটার কাজ নিয়েছেন একটি সেলুনে। হরিচরণ দাস শুরু করেছেন চায়ের দোকান। রাহুল চক্রবর্তী নামে একজন ড্রামবাদক বলেন, ‘অর্থসঙ্কটে পড়ে বাড়ির একটি অংশ বেচে দিতে বাধ্য হয়েছি।’

এদিকে পুরুষ কলাকুশলীরা বিকল্প কিছু কাজ পেলেও নারী শিল্পীরা কোন কাজই পাচ্ছেন না। তাদের বেশিরভাগই বেকার। জীবিকার তাগিদে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে গৃহকর্মীর কাজ করছেন। অথবা চলে যাচ্ছেন গার্মেন্টসে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পঞ্চান্ন বছর বয়সী এক নারী শিল্পী বলেন, ‘বেকার হওয়ার পর বেশকিছু টাকা ঋণ করে ফেলেছি। তাই এখন নিরুপায়ে একটি ছাত্রমেসে রান্না করে দিন পার করছি। একজন অভিনয়শিল্পী হয়ে আমাকে এমন কাজ করতে হবে- তা কোনদিন ভাবিনি।’

ঝরনা গোস্বামী, মমতা বেগম, বীণা রানী দাস, বলরাম সরকার, আব্দুর রাজ্জাকসহ কয়েকজনের নামোল্লেখ করে যাত্রাশিল্পীরা বলেন, এরা প্রত্যেকে অসুস্থ। অর্থাভাবে বাড়িতে প্রায় বিনা চিকিৎসায় ধুঁকছেন। কারও কারও ছেলেমেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারছেন না বলেও জানান তারা।

যাত্রাশিল্পীরা বলেন, শীত মৌসুম যাত্রাপালার জন্য একটি মোক্ষম সময়। প্রতি বছর এ সময়টিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় মাস বা পক্ষকালব্যাপী প্যান্ডেল করে যাত্রাপালার আয়োজন করা হতো। এ কারণে শীতকালে খুব ব্যস্ত সময় পার করতে হতো যাত্রার কলাকুশলীদের। কিন্তু এবার কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে কোথায়ও যাত্রাপালার আয়োজন সম্ভব হয়নি। ফলে আশা ভেঙ্গেছে প্রত্যেকের। এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা।

এদিকে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে চরম অর্থসঙ্কটে পড়লেও খুব একটা সহযোগিতা পাননি যাত্রাশিল্পীরা। এসব নিয়ে প্রচুর অভিযোগ তাদের। স্বনামধন্য যাত্রানায়িকা ও পালাকার প্রিন্সেস বিউটি বলেন, ‘ভাইরাস পরিস্থিতিতে সরকার শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য প্রচুর বরাদ্দ দিলেও তা মাঠ পর্যায়ে যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়নি। বিশেষ করে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে যারা এসব সরকারী সহায়তা বা প্রণোদনা বিতরণ করেছেন তারা পেশাদার বা প্রকৃত যাত্রাশিল্পীদের মোটেই গুরুত্ব দেননি। তারা যাদের সহযোগিতা করেছেন তাদের ৯৫ ভাগই অপেশাদার বা শৌখিন শিল্পী।’ বিউটি আরও বলেন, ‘লকডাউনের সময় যাত্রাশিল্পীদের নিদারুণ কষ্ট করতে হয়েছে। নিরুপায় হয়ে তখন অনেকের কাছে হাত পেতে কিছু ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহ করে দুস্থ শিল্পীদের মাঝে বিতরণ করেছি। তা খুবই সামান্য।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT