ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২১ অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ

পিআইডি এর নিয়ম অনুসারে আবেদিত

অলিতে গলিতে তুলোধোনা হচ্ছে

প্রকাশিত : 01:55 PM, 9 November 2020 Monday

গণঅধিকার নিউজ ডেস্কঃ

কিছুদিন আগের গরমাগরম অবস্থাটা আর নেই। পারদ ক্রমেই নামছে। আসি আসি করছে শীত। এই তো চাই। সময় বুঝে ঠিক মাঠে নেমে পড়েছে ধোনকার। রাজধানীর অলি-গলিতে সরব উপস্থিতি এখন তাদের। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তুলোধোনা করছে তারা। না, ভয়ের কিছু নেই। তুলোধোনা মানে, তুলোধোনাই। অন্য কিছু নয়। শীতে বাড়তি ওম নেয়ার জন্য নতুন লেপ তোশক বালিশ নিশ্চয়ই চাই। তুলোধোনা করা হচ্ছে এ কারণেই। তুলোধোনা মানে, তুলো পরিশোধন করা। দৃশ্যটি খুব চোখে পড়ছে এখন। কানে আসছে ‘লেপ সিলাই, তোশক বানাই’ আওয়াজ। এ আওয়াজ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে শীত আসন্ন। আবার হঠাৎ শীত শীত অনুভূত হওয়ায় মনে পড়ে যাচ্ছে, ধোনকারদের আসার সময় হয়েছে।

এই পেশাজীবীদের অতীত ইতিহাস আজকের দিনে তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে পেশাটি অনেক প্রাচীন। ধারণা করা হয়, এ অঞ্চলে মধ্যযুগ থেকে লেপ তোশক বালিশ তাকিয়া ফরাশ ইত্যাদি তৈরি ও ব্যবহার জনপ্রিয় হতে শুরু করে। তুর্কি, পাঠান ও মোগলরা এগুলো ব্যবহার করতেন বলে কোথাও কোথাও উল্লেখ পাওয়া যায়। ধোনকার ছাড়াও এই পেশার লোকদের ধুনারি, ধুনুরি, ধুনুরা বা ধুনক নামে ডাকা হয়।

ধুনটযন্ত্র এবং কাজের একটি বর্ণনা দিয়েছেন ইতিহাসবিদ ছন শরীফ উদ্দিন আহমেদ। বর্ণনাটি এ রকম : ধুনটের শেষ প্রান্ত গরুর শুষ্ক পেশিতন্তু দিয়ে নির্মিত দড়ি দিয়ে শক্তভাবে আটকিয়ে রাখা হয়। ধুনটে রক্ষিত শক্ত রশির ক্রমাগত দ্রুত স্পন্দনের মাধ্যমে তুলো পরিষ্কার ও শোধন করে নেয়া হয়। রশির স্পন্দনের ছন্দ কাঠের তৈরি মাচু বা হাতলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কার্যপ্রক্রিয়া শুরু করে। তুলো, লেপ, তোশক প্রস্তুতের উপযোগী করার পর নক্সা ও আকার অনুসারে লেপ, তোশক, বালিশ, কুশন ইত্যাদি তৈরি করা হয়।

এ পেশার আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ওয়াইজ জেমস। উনিশ শতকের ষাটের দশকে ঢাকার সিভিল সার্জন ছিলেন তিনি। একইসঙ্গে লেখক হিসেবে খ্যাতি ছিল। তার বর্ণনা থেকে জানা যায়, সে সময় ধুনারিরা প্রতিদিন আট সের করে খুব উত্তম ধরনের তুলো এবং দশ থেকে বারো সের সাধারণ তুলোধোনা করতে পারত। তবে শীত পুরোপুরি বিদায় নিলে বিকল্প কাজ খুঁজতে হতো ধুনারিদের। তারা তখন ভিস্তি বা পাখা টানার কাজ করতেন।

বর্তমানে এদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ লেপ, তোশক, জাজিম, বালিশ ইত্যাদি তৈরির দোকান দিয়েছেন। বাকিরা ছুটছেন বাড়ি বাড়ি। কাঁধে একটি বিশেষ যন্ত্র বয়ে বেড়ান তারা। বেহালার মতো দেখতে অতি সামান্য যন্ত্র তাদের আলাদা করতে, চিনে নিতে বিশেষ সহায়তা করে। একই যন্ত্র দেখতে কিছুটা বীণার মতো। ধনুকের সঙ্গেও মিল আছে। এ কারণে যন্ত্রটির প্রকৃত নাম ধুনট। কাঠ, বেত বা বাঁশের তৈরি ধুনট কাঁধে নিয়ে ধোনকাররা পাড়া-মহল্লা ঘুরে বেড়ান। কাঁধ থেকে সামনের দিকে নেমে আসা লম্বা দন্ডটি ছাড়াও, বড় পুঁটলি বহন করেন তারা। পুঁটলির ভেতরে থাকে তুলো। লেপ তোশক বানানোর কাজে প্রয়োজন হয় এমন কাপড়ের স্যাম্পল সঙ্গে রাখেন। কি তুলো বা কোন কাপড় ব্যবহার করা হবে ঠিক হয়ে গেলে, যার চাই তার চোখের সামনেই কাজ শুরু করে দেন ধোনকাররা। বর্তমানে ঢাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ির সামনের খোলা জায়গায় বা ছাদে টিংটিং শব্দে চলছে তুলো ধোনার কাজ। নতুন লেপ তোশক বালিশ বানানোর কাজ হচ্ছে। আবার বহু ব্যবহারে পুরনো চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া লেপ, তোশককে গড়ে নেয়া হচ্ছে নতুন করে।

রবিবার তেজগাঁও এলাকায় দেখা মিলল এক ধোনকারের। সেখানকার একটি বাসায় তোশক ও বালিশ বানাতে এসেছিলেন তিনি। নাম মোঃ আমিনুল। প্রথমে পুঁটলি খুলে তিন চার জাতের তুলো বের করে গৃহকর্তাকে দেখালেন তিনি। বালিশের জন্য শিমুল তুলো ভাল বলে জানালেন। তোশকের জন্য বের করলেন পরিষ্কার সাদা আরেক জাতের তুলো। তার পর দেখালেন কাপড়। ১০ থেকে ১২ টুকরো কাপড় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। গৃহকর্তা পছন্দ করে দেয়ার পর দোকান থেকে সেই তুলো এবং কাপড় সংগ্রহ করতে বের হয়ে যান তিনি। ফেরেন আধা ঘণ্টা পর। এবার ঝোলাটা আরও বড়। জানা গেল, তাতে ১২ কেজি তুলো। পুরোটাই তোশক তৈরিতে ব্যবহার করা হবে। তুলো ভরার জন্য কিছুটা জায়গা ফাঁকা রেখে তোশক এবং বালিশের কাপড় সেলাই করে নিয়ে এসেছেন তিনি। তারপর চলে গেলেন ছাদে। সেখানে নাক মুখ রুমাল দিয়ে বেঁধে তুলোধোনার কাজ শুরু করে দিলেন। বেতের মতো দেখতে সরু শক্ত লাঠি দিয়ে তুলোর গায়ে বেদম পেটালেন। তাতেই ফুলেফেঁপে উঠল তুলো। বেশ ঝরঝরে দেখাল। তার পর তোশকের ভেতরে চালান করে দিয়ে সেলাই শুরু করলেন তিনি। লম্বা সুই। অভ্যস্থ আঙুল। দেখতে দেখতে প্রস্তুত হয়ে গেল তোশক। আরও সহজে তৈরি হলো বালিশ।

কাজ শেষ করে মোঃ আমিনুল বললেন, এটা আমাদের বাপ-দাদার পেশা। আমি অনেক ছোটবেলায় শিখেছিলাম। এখন তো বয়স ৪৫ হয়ে গেছে। একই কাজ করছি। দোকানপাট দিয়ে ব্যবসা করার সামর্থ্য নাই। তাই পাড়ায় ঘুরে ঘুরে যা কাজ পাই, তাই করি। এক সময় নানা ধরনের কাজ করলেও এখন তোশক ও বালিশের কাজই বেশি করেন বলে জানান তিনি।

আমিনুলের মতোই শহর ঘুরে লেপ তোশক তৈরির কাজ করছেন ধোনকার আব্দুল হালিম। বিজয় সরণি এলাকায় দেখা হয় তার সঙ্গে। আজকের দিনে এই কাজ করে জীবন চলে? জানতে চাইলে তিনি বলেন, চলা কঠিন হয়ে গেছে। কাস্টমার কম। আগে প্রচুর লেপের কাজ করতাম। এখন চায়না কম্বলে বাজার ভর্তি। ফুটপাথে অনেক কম দামে কিনতে পাওয়া যায়।

সস্তায় কাজ চললে বেশি দাম দিয়ে লেপ তোশক কেন বানাবে মানুষ? জানতে চাইলে প্রথমে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যান তিনি। পরোক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন। পেশা নিয়ে গর্ব আছে তার। সে কথা জানিয়ে বলেন, আমাদের জিনিস তো খাঁটি। অরিজিনাল। নিজের দেশের তুলার আরাম অন্য কিছু দিতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঁথার উদাহরণ টানেন তিনি। বলেন, মায়ের ছেঁড়া কাঁথায় যে শান্তি, আপনে সেইটা চায়না কম্বলে পাইবেন?

আসলেই পাওয়া যাবে না, সহাস্যে মেনে নিতেই হয় ধোনকারের কথা।

শেয়ার করে সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়। আপনার চারপাশে ঘটে যাওয়া নানা খবর, খবরের পিছনের খবর সরাসরি দৈনিক গণঅধিকার'কে জানাতে ই-মেইল করুন- dailyganoadhikar@gmail.com আপনার পাঠানো তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা যাচাই করে আমরা তা প্রকাশ করব।

দৈনিক গণঅধিকার'র প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

© ২০২১ সর্বস্বত্ব ® সংরক্ষিত। দৈনিক গণঅধিকার | এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বে-আইনি, ডেভোলপ ও ডিজাইন: DONET IT